স্বজন হারানোর বেদনাপীড়িত দুঃখের কথা

বঙ্গীস ভিক্ষুঃ

১৩ জুন ২০১৭, মঙ্গলবার। এর আগের রাত নির্ঘুম কাটানোর পর ভোর ৫টার দিকে ঘুমিয়ে পড়লাম সকালের ভোজন না খেয়ে। এক-দুই দিন আগে থেকে খুব ভারি বৃষ্টি হচ্ছিল দিন-রাত। তাই বৃষ্টির মধ্যে সকাল বেলার ভোজন না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকাল ৮টার পর ঘুম থেকে উঠলাম। ঝুম ঝুম বৃষ্টির মধ্যে সকাল সাড়ে ১০টায় ভোজনশালায় গিয়ে দুপুর বেলার ভোজন খেয়ে আসলাম। সকাল থেকে যে আমি কিছুই মুখে দিইনি, তাই ভারিবৃষ্টির মধ্যেও দুপুরের ভোজন খেতে যেতে বাধ্য ছিলাম। খেয়ে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর আবার ছোখ দুটো ভারি হয়ে আসছিল। কারণ সকাল বেলার তিন ঘন্টার ঘুম পর্যাপ্ত হয়নি। তাই আবার দুপুর দুইটার দিকে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমানোর সময় বিকাল ৪টা কী সাড়ে ৪টার দিকে রাজবন বিহারের পাশের গ্রাম ভালেদি আদাম (বিজয় নগর) থেকে আমার মাসিতো বোনের নাম্বার থেকে ছোট মাসির কল আসল আমার ফোনে। ঘুম ঘুম অবস্থায় কল রিসিভ করতেই মাসি বললেন, ‘বাড়ির খবর পেয়েছেন?’ আমি বললাম, ‘না’। তখন মাসি বললেন, ‘আপনার জেঠার ঘরে নাকি পাহার ধসে পড়েছে। পূর্ণচন্দ্রের (আমার জেঠাতো ভাই, বড় ভাই) স্ত্রীকে নাকি পাওয়া গেছে, কিন্তু তুষাকে (পুরো নাম তুষা মনি চাকমা, সংক্ষেপে সবাই ‘তুষা’ বলে ডাকে) পাওয়া যাচ্ছে না। পূর্ণচন্দ্র নাকি এখন তার কর্মস্থল বরকল উপজেলা থেকে ফিরছেন। আমি শুধু এটুকুই জানলাম, তাই আপনাকেও জানালাম।’ নেটওয়ার্কে সমস্যা থাকায় অবশ্য কথাগুলো স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছিল না। তবুও কোনো মতে বুঝে নিলাম।

অপ্রস্তুত অবস্থায় হঠাৎ কথাগুলো শোনায় আমার বুকটা ‘দুক’ করে ভেজে উঠল। আমি তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম এবং একটার পর একটা আমার গৃহীর বাবা, মা, ছোট-বড় ভাই-বোন, জ্ঞাতি, পাড়াপ্রতিবেশি, আমার কাছে যতজনের নাম্বার ছিলো সবগুলো নাম্বারে কল দিলাম। কিন্তু কাউকে পেলাম না, আমাকে বলা হচ্ছে ‘আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটিতে এই মুহুর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।’ এরপর আমার দীক্ষাগুরু, বোধিপুর বনবিহারের অধ্যক্ষ শ্রদ্ধেয় জিনবোধি ভান্তের শরণাপন্ন হলাম, তাঁর সবগুলো নাম্বারে কল দিলাম, তাঁকেও পেলাম না। ভান্তের সহবিহারী আবুসো ধর্মরত্ন ভিক্ষুকেও কল দিয়ে পাওয়া গেল না। ফোনে কাউকে না পেয়ে মনটা খুবই ভারী হল। কী আর করা, অসহায়ের মতো ভীষণ ভারী মন নিয়ে বসে থাকতে লাগলাম। এরপর বিকাল ৫টা কী সাড়ে ৫টার দিকে আমার গৃহী বাবার ফোন কল চলে এল। তিনিও বললেন, ‘বাড়ির খবর কিছু শুনেছেন?’ আমি বললাম, ‘কিছু শুনেছি।’ আমার দিকে নেটওয়ার্কে কী সমস্যা, তাদের দিকে সেই ডাবল সমস্যা! তাই বারবার বলে কথাগুলো জানতে হচ্ছিল। বাবা বললেন, ‘এদিকে নেটে খুবই সমস্যা হচ্ছে, তাই বেশি বলতে পারছি না। উপরের পাহার ধসে দাদার বাড়িটি মাটিতে চাপা পড়ে বিলীন হয়ে গেছে, পুকুরে পড়ে গেছে। পূর্ণচন্দ্রের বউ (হ্যাপি চাকমা) আর যশকে (আমার চাচাতো বোনের একমাত্র ছেলে) পাওয়া গেছে। তুষাকে পাওয়া যাচ্ছে না।’ এই কথাগুলো বলতেই লাইনটা কেটে গেল। অনেক চেষ্টা করেও আর সংযোগ দিতে পারলাম না। বাবার কথাগুলো শুনে মনটা ভারী থেকে আরও ভারী হল।

বাবার সাথে কথা শেষ হওয়ার তিন-চার মিনিট পর ঢাকা থেকে আমার মেঝো ভাইয়ের কল আসল। তিনিও বললেন প্রায়ই একই কথা। সেই সাথে কয়েকটি কথা যোগ করে দিলেন, ‘জেঠা আর চাচা দুই পরিবারের সদস্যরা সবাই আহত হয়েছেন। বৃদ্ধা দাদীর নাকি পা ভেঙেছে, মেরুদণ্ডেও আঘাত পেয়েছেন। বিভিন্ন জায়গায় পাহার ধসে পড়ায় রাস্তা ব্লক হয়েছে তাই যাতায়াতেও সমস্যা হচ্ছে। আহতদের হাসপাতালে নিতে পারছেন না। দাদাও (আপন বড় ভাই) চকরিয়া থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন।’ আরও বললেন, ‘ফোনে এখন কাউকে পাচ্ছি না, যদি আপনি খবর পান, তাহলে আমাকে জানাবেন।’ কারণ এসব কথা তিনিও সরাসরি পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে শুনেননি। শুনেছেন অন্যজনের কাছ থেকে শত চেষ্টার পর।

আমি সহবিহারী ভান্তেদের সাথে কথাগুলো শেয়ার করলাম। শুনে তাঁরাও অনেক ব্যথিত হলেন। ভারী মন নিয়ে রাত ১০টায় আমি বিছানায় শুয়ে পড়লাম। সকাল আর দুপুরে ঘুমানোর কারণে এবং এই জ্ঞাতি বিয়োগে শোকাক্রান্ত হওয়ায় কিছুতেই ঘুম আসছিল না। তবুও ঘুমানোর চেষ্টা করি। কিছুক্ষণ ঘুম হয় তারপর জেগে উঠি। এভাবে সারারাত কাঠিয়ে দিলাম। সকাল হলে প্রাতঃরাশ খেয়ে আসলাম। তারপর ফোনে খবর নেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু ব্যর্থ হলাম। দুই-তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় অনেকের ফোন বন্ধ হয়ে গিয়েছে, আর যাদের ফোনে চার্জ ছিল তাদেরকেও পাওয়া যাচ্ছে না নেটওয়ার্কের গোলোযোগের কারণে। নিরুপায় হয়ে বিছানায় শুয়ে রইলাম। তারপর ধর্মরত্ন ভিক্ষুর কল পেলাম। সে বলল, ‘ভান্তে, আজ তুষাকে পুকুরের (এই পুকুরে সারা বছর পানি থাকে না, কিন্তু কয়েক দিনের বৃষ্টিতে পুকুর জলে পরিপূর্ণ হয়েছে) তলায় পাওয়া গেছে। আপনার দাদীমারও মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে নেয়ার সময়। যশকে গতকাল রাত্রে তার গ্রামে (খারিক্ষ্যং ক্যাম্প এলাকা) নিয়ে গেছে। আপনার দাদীমা, আপনার বৌদি (জেঠাতো ভাইয়ের বৌ) ও আপনার চাচাতো বোন তিন জনকে এক সাথে দাহ করা হবে আজ। আপনি কি আসতে পারবেন?’ আমি বললাম, ‘আসতো মন চাইছে। কিন্তু শুনেছি গাড়ি চলাচল করতে পারছে না, তাহলে আমি কিভাবে আসব? এতদূর পথ তো হেটে আসাও প্রায় অসম্ভব।’ সে বলল, ‘ভান্তে, এখন গাড়ি চলাচলের ব্যাপারে আমিও কিছুই জানি না।’ ‘আমি যদি আসতে না পারি তাহলে তোমরাই সম্পন্ন করে দিও’ এই কথা বলে তাকে বিদায় করে দিলাম।

এর কিছুক্ষণ পর আমার বাবার কল আসল জেনারেল হাসপাতাল থেকে। ১৩ তারিখের রাত্রে চার-পাঁচ কিলোমিটার পথ পর্যন্ত হেটে হেটে পিঠে করে আহত ব্যক্তিদের নিয়ে আসার পর বাকি রাস্তার জন্য গাড়ি পেয়েছিলেন। তারপর গাড়িতে করে হাসপাতালে আহতদের ভর্তি করানো হয়েছে। সেখান থেকে তিনি বললেন, ‘ভান্তে, আজ দাহক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। গাড়ি মানিকছড়ি পর্যন্ত যেতে পারে, তারপর হেটে যেতে হবে। আপনি গেলে একটা গাড়ি পাঠিয়ে দিতাম।’ আমি বললাম, ‘তাহলে পাঠান, দুপুর ১২টায় পাঠান। এরপর আমি যে সেখানে যাচ্ছি সেই খবরটা দেয়ার জন্য একটার পর একটা ফোন দিলাম কিন্তু কাউকে পেলাম না, এমনকি ভান্তেদেরও। সিদ্ধান্ত নিলাম, তবুও আমি যাবো, কল করেও যেহেতু কাউকে পেলাম না, সেহেতু তারা জানবে না।

যাক, ১২টার আগে আমার বাবা গাড়ি নিয়ে নিজেই আসলেন আমাকে নিতে। আমি শ্রদ্ধেয় মুক্তপ্রিয় ভান্তে ও শ্রদ্ধেয় অর্থদর্শী ভান্তেকে সাথে নিয়ে গাড়িতে উঠলাম। গাড়ি চলল। ড্রাইভার সাহেব দেখে শুনে সাবধানে মানিকছড়ির আর্মি ক্যাম্পের সামনে পৌঁছে দিল। সেখান থেকে আর গাড়ি যেতে পারছে না, এবংকি মোটর বাইকও। এবার তিন কিলোমিটারেরও বেশি রাস্তা হেটে চললাম। সেদিকেও কিছু দূর যেতেই রাস্তা ব্লক হওয়ার দৃশ্য বেশ কয়েকটি জায়গায় দেখলাম। অবশ্য কোনো মতে মোটর সাইকেল চলতে চোখে পড়ল । ঘন্টা খানেক হাটার পর আমরা বোধিপুর গ্রামের ফটকে পৌঁছলাম। ফটক থেকে দুই-তিন মিনিট হেটে গেলে আমার গৃহীর বাড়িতে পৌঁছা যায়। আমরা সেখানে পৌঁছলাম। জেঠার বাড়িটি মাটিতে মিশে যাওয়ায় এবং চাচার বাড়িটি জলমগ্ন হওয়ায় (যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে) তাদের ঘরে লাশগুলো রাখার জায়গা ছিলো না। তাই আমাদের গৃহীর বাড়িতেই রাখা হয়েছে দুই পরিবারের লাশ। বাড়ির কাছাকাছি যেতেই সূত্রপাঠের শব্দ কানে ভেসে এল। তখন শ্রদ্ধেয় জিনবোধি ভান্তে সূত্রাদি পাঠ শেষে দান অনুমোদন করে জল ঢালার সূত্রপাঠ করছেন। ঘরের ভেতর ও উঠানে অনেক মানুষের সমাগম দেখতে পেলাম। আসার সময়ও বহু লোককে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে মশাল হাতে নিয়ে শ্মশানের দিকে যেতে দেখেছিলাম। উল্লেখ্য, পুরো শ্মশান জলমগ্ন হওয়ায় লাশ পোড়ানোর উপযোগী ছিল না। তাই মূল রাস্তা থেকে রাজবন ভাবনাকেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তার পাশে জেঠার আম-লিচু বাগানেই দাহকার্য সম্পন্ন করা হবে। লোকেরা সেখানেই যাচ্ছিল। আমরা বাইরে অপেক্ষা করলাম সূত্রপাঠ শেষ হওয়া পর্যন্ত। আমাদের জন্য চেয়ার আনা হলো। আমরা বসলাম কিছুক্ষণ। সূত্রপাঠ শেষে ভেতরে প্রবেশ করলাম। তখন ভান্তেসহ অনেকেই বললেন, ‘ভান্তে, আপনারা যে আসবেন আমরা তো জানতাম না। আমরাও যোগাযোগ করতে পারিনি…।’

ঘরের ভেতর পা রাখতেই চোখে পড়ল লাশগুলো। সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে। একদিনে চার চার জন জ্ঞাতির প্রাণহানি আমিসহ জ্ঞাতিরা কখনোই দেখেননি। এরূপ মহামারি আকারে পারিবারিক বিপর্যয় কোনো কালে আসেনি। দাদা (জেঠাতো ভাই) আমাকে উদ্দেশ্য করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘ভান্তে, দেখুন আমাদের অবস্থা, আমরা শেষ হয়ে গেছি।’ চোখের সামনে ‘মা’সহ তিন তিনটি (যশের লাশ তার নিজ গ্রামে নেয়া হয়েছে, তাই এখানে তিনটি) নিঠর দেহ ও আমার দাদার আহাজারি দেখে বাবাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না। তিনিও চোখের জল ফেলতে ফেলতে দু-একটি কথা বললেন। শুধু এই দুজনের কথায়ই বললাম। অন্যদের বেলায় কী হচ্ছে তা আর বললাম না। তখন আমিও এই প্রথম একসঙ্গে এতজন জ্ঞাতির মৃত্যুর তিক্ত স্বাদ পেলাম। এসব দৃশ্য দেখে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম বটে, কিন্তু অন্তরের রক্তক্ষরণ রোধ করতে পারলাম না। কারণ এর আগে বাবা আর দাদাকে এভাবে ভেঙে পড়তে কখনোই দেখিনি। তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেদের শক্ত করে ধরে রাখতে পারতেন। সেই শক্ত মানুষেরাই আজ নিজেদেরকে ধরে রাখতে পারলেন না এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাই তাদেরকে দেখে আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, তারা বর্ণনাতীত শোকগ্রস্থ হয়েছেন। সাদা কাপড়ে ঢেকে রাখা সারিবদ্ধ লাশ, বাবার চোখে জল, দাদার আহাজারি ও অন্য স্বজনদের বেদনাভরা মুখগুলো দেখে আমিও খুব বেশি-ই মর্মাহত হয়েছিলাম সেই মুহুর্তে।

এরপর চিন্তা করলাম, না, আমার এভাবে ভেঙে পড়া উচিত হবে না। তখন নিজের মনকে নিজেই শক্ত করতে চেষ্টা করলাম। পারলামও কিছুটা। মনে কিছুটা শক্তি ফিরে এলে আমরা সূত্রপাঠ শুরু করলাম। আমার জীবনে অর্জিত সমস্ত পুণ্যরাশি মৃত লোকদের উদ্দেশ্য দান করলাম। আমি তাদের শেষ দেখা দেখলাম। আমরা আর বেশিক্ষণ থাকলাম না। বাড়ি থেকে বের হয়ে আমরা এখন ঘটনাস্থলে যাব যেখানে পাহাড় ধসে পড়েছে। বাড়ি থেকে যেই না বের হলাম, শুরু হলো মেয়েদের আহাজারি, কান্না। তাদের কান্না থেমে ছিল শুধু আমরা যতক্ষণ ছিলাম।

আমরা ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হলাম। তারা লাশগুলো নিয়ে শ্মশানের দিকে চললেন। আমাদের সাথে চলল বোধিপুর গ্রামেরই যুবক অনুময় চাকমা ও অচেনা অন্য একজন। অনুময় চাকমা তুলনামূলক ভালো রাস্তা দেখে আমাদের নিয়ে চলল। মেইন রাস্তা দিয়ে যেতে পারলাম না। যেই দিক দিয়ে যাচ্ছি সেই দিকেও কাঁদামাটিতে পা অর্ধেক ডুবে যাচ্ছে, এক ফুটেরও বেশি। অনেক কষ্ট করে ঘটনাস্থলে পৌঁছলাম। গিয়ে দেখি সব বিধ্বস্ত! সবই বিলিন হয়ে গেছে! বাড়ির সামনে উর্ভর ক্ষেত্র (এই ক্ষেত্রে ফলিত আঙ্গুর নিয়েও কিছুদিন আগে এনটিভিতে একটি প্রতিবেদন প্রচার করা হয়েছিল), বাড়ি যাবার রাস্তার দুইপাশে সারিবদ্ধ সুপারি গাছ, ছায়াময় উঠান, কোনো কিছুর অস্থিত্ব নেই। সেখানে এক মহিলা (সম্পর্কে আমার পিসি) আমাদের সাবধান করে দিলেন, ‘ভান্তে, এদিকে বেশি আসবেন না, নলকূপের ঢাকনিটাও সরে গেছে। তাই সাবধান।’ আমি কয়েকটি ছবি নিলাম আর ভিডিও করলাম এক মিনিটের মতো। দৃশ্যগুলো দেখলাম আর ভাবলাম, প্রকৃতি কতো নিষ্ঠুর আচরণ করেছে। অনুময় বাবু দেখিয়ে দিচ্ছে, হ্যাপি মামিকে (সম্পর্কে তার মামি) এখান থেকে তুলেছি, মাটির স্রোতে পড়ে এই পুকুর পাড়ে এসে পড়েছে। মাথা হতে বুক পর্যন্ত মাটিতে ডুবে ছিল। উল্টা করে পড়ে গিয়ে ছিলেন। আর গাছ একটা পড়েছিল তার উপরে। যশকে পুকুরে ভাসা অবস্থায় পাওয়া যায়। অনেক জায়গায় আঘাত পেয়েছে, আঘাতের চিহ্ন ছিল। আর তুষাকে আজকেই (অর্থাৎ একদিন পর) এখান থেকে পুকুরের পানি সেচে ফেলে মাটির তলা থেকে তুলেছি। তার ঘাড় ভেঙেছে, হাত-পা ভেঙেছে ইত্যাদি ইত্যাদি… শেষে বুক ভরা বেদনা নিয়ে ফিরে আসলাম।

বাড়িটি কি আসলেই ঝুকিতে ছিল?
খুব যে ঝুকিতে ছিল তা কিন্তু নয়। আর একেবারে যে ঝুকি ছিল না তাও নয়। কারণ ঝুকি যদি না-ই থাকত তাহলে এত বড় ঘটনা ঘটতো না। যে পাহারটি ধসে পড়েছে সেটির উচ্চতা আনুমানিক একশ ফিটের কাছাকাছি বা তার থেকে কিছুটা বেশি হতে পারে। পাহারটি খুব উচু। পাহারের গোড়া ঘেসে একটি কাচা রাস্তা ছিল যেটি বোধিপুর বনবিহারে চলে গেছে। সেই রাস্তা থেকেও বাড়িটির দূরত্ব ছিল আনুমানিক ৫০ বা ৬০ ফিটের কাছাকাছি। তার থেকে বেশিও হতে পারে কম হবে না। তারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, এভাবে যুগ যুগ ধরে বাস করে আসছিল সেখানে। তাই বাড়িটি যে অনিরাপদ সেটা তাদের কল্পনার বাইরে ছিল। অনেকের ঘর জলমগ্ন হওয়ায় অন্যরাও এই বাড়িটিকে নিরাপদ মনে করেছিল। তাই অনেকেই তাদের ঘরে অতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রাদি রেখে এসেছিল। কেউই ভাবতে পারেনি যে তাদের ঘর থেকে এই বাড়িটিই বেশি অনিরাপদ। কিন্তু তা-ই হলো। ১৩ তারিখে ঝুম বৃষ্টিতে দুপুর ১১টার দিকে পাহাড়টি ধসে পড়ে পাহাড়ের সব মাটি বুলেটের গতিতে এসে বাড়িটির উপর ঝাপিয়ে পড়ল। যার কারণে বাড়ি থেকে বের হবার সময়টুকুও পেলেন না অনেকেই। মুহুর্তের মধ্যেই তছনছ হয়ে গেলো বাড়িটি, চলে গেলো চার চার জনের তাজা প্রাণ, নষ্ট হয়ে গেলো খুব গুরুত্বপূর্ণ দলিল, কাগজপত্রাদি, হারিয়ে গেলো পরিবারের গোছানো সংসার, শেষ হলো স্বপ্ন ও সবকিছুই।

দোষ, ভুল বা অসচেতনতা যা-ই বলি, সেটা আসলে পরিবারের সদস্যদের কারোর ছিল না, ছিল না অন্য কারোর। দোষটা ছিল মূলত প্রকৃতির। প্রকৃতি যে এমন বিরূপ আচরণ করবে তা কেউ-ই ভাবেননি। গ্রামের সর্বোচ্চ বয়ষ্ক ব্যক্তিরা বলেছেন, তারাও নাকি তাদের জীবনে এরূপ মহামারি বন্যা কখনও দেখেননি। তারাও অভাক! সবাই অভাক!

এদের পরিবার থেকে তো অনেকেই বেচে গেছে। এমন এমনও পরিবার রয়েছে যাদের কেউ বাচতে পারেনি। প্রকৃতির শত্রুতায় সবাই ঐ পারে চলে গেছে, না ফেরার দেশে। তাদের শোক দেখবে কে? প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে যারা যারা স্বর্গীয় হলেন, তাদের উদ্দেশ্যেও আমি আমার অর্জিত সমস্ত পুণ্যরাশি দান করছি। এই পুণ্যরাশি পেয়ে তারা সকলে সুখী হোক।

বি : দ্র : লেখাটা ছোট করে লিখব ঠিক করেছিলাম, কিন্তু লিখতে লিখতে অনেক বড় হয়ে গেল। তারপরও আরও অনেক কিছু লেখার বাকি ছিল। আজ বুঝলাম, সুখের কাহিনির চেয়ে দুঃখের কাহিনি অনেক বড় করে লেখা যায়।

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!