সেদিন ঘোরে ছিলাম ঘুম ভেঙেছে আজ

উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসুঃ ২৯ সেপ্টেম্বর আমার জন্মদিন। আমার জন্ম হয়েছিল এক মধু পূর্ণিমা তিথিতে। ২৯ সেপ্টেম্বর জন্মদিন পালন করলেও মধু পূর্ণিমা আর ২৯ তারিখ একসাথে মিলেনা। পুর্নিমা আসে হয় আগে নয় পরে। কিন্তু চার বছর আগে একটি দিন পেয়েছিলাম যেদিন পূর্ণিমা আর তারিখ এক সাথে মিলে গিয়েছিল। যদিও সেই দিনটা কলঙ্কিত অধ্যায়ের সৃষ্টি করে আমার জন্মদিনটাকে এক অন্ধকার দিন বানিয়ে দিয়েছে।
 
রামু ট্রাজেডির কথা হয়তো কেউ ভুলেন নাই এখনো। হ্যাঁ সেই দিনটির কথাই বলছি। জন্মদিনের আনন্দ করে যখন ঘুমাতে যাচ্ছিলাম তখনই সেই খবর পেয়ে অতীব বেদনাহত হয়েছিলাম। তারপরের কাহিনী তো ইতিহাস। নতুন করে বিহার নির্মাণ হলো সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়। দোষারোপের রাজনীতিও চললো। প্রধানমন্ত্রীর ছুটে যাওয়া আশার বাণী দেওয়া সব মিলিয়ে কষ্টগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাওয়া শুরু করে। যদিও আজো হয় নি সেই সব হায়েনাদের বিচার।
 
আওয়ামীলীগ দলটাকে বেশ ভালবাসতাম বলে তাদের কোনো দোষ চোখে পড়তো না। ভাবতাম সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য রাতের আধাঁরে এই আক্রমণ করেছিল তারা। একটা বিষয় বেশ ভাবাতো আমায় যে আগের দিনে জ্বালাময়ী, উসকানী বক্তব্য যারা দিয়েছিল তাদের নেতৃত্ব দিয়েছিল স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতারাই তাহলে আসলেই কি এটা সরকার বিরোধী ষড়যন্ত্র ছিল নাকি অন্য কিছু। আওয়ামীলীগের উপর বিশ্বাস কিছুটা হালকা হয় সাঁওতাল পল্লীর আগুনে ঘটনার পর। যখন তদন্তে দেখা যায় স্বয়ং পুলিশ পর্য্ন্ত আগুন দেয় সেখানে। পরবর্তীতে নাসির নগরে সেই রামুর কায়দায় ফটোশপে এডিট করে ইস্যু বানিয়ে হামলা আর হোতা হিসেবে প্রকাশ পেয়ে যাওয়া আওয়ামী নেতাদের নাম দেখে আওয়ামীলীগের উপর আমার যে বিশ্বাস তাতে যেন ফাঁটল ধরা শুরু হয়। সর্বশেষ লংগদুর ঘটনা তো পুরো বিশ্বাসটাই নষ্ট করে দিল। আগের দিন লাশ পাওয়া যাওয়ার পর থেকেই পরিবেশ গুমোট ভাব নিতে শুরু করে। পরের দিন লাশ নিয়ে মিছিল, পরিবেশ আরো ভারী হতে থাকে। মিছিলের সময় সেনাবাহিনী, পুলিশ উপস্থিত ছিল। সেখানে যে গোয়েন্দা বাহিনী ছিল তারা তো অবশ্যই জানতো কি হতে যাচ্ছে কারণ ঘটনা তো রামুর মতো হঠাৎ করে নয়। এতগুলো বাড়ি পুড়ে গেল প্রশাসনের সামনেই। প্রশাসন সেই দিন কিছুই করেনি।
অথচ আজ ঘরবাড়ি হারানো পাহাড়িরা মনের ক্ষোভ মিটাতে যখন একটু মিছিল করতে চাইছে, মনকে হালকা করতে চাইছে সেখানে তাদের উপর বুট জুতার লাথি, গণ গ্রেপ্তার কত কি না ঘটছে।
রামুর ঘটনা রাতের আঁধারে হয়েছিল বলে বুঝতে পারিনি বাস্তবতা কি ছিল, তাই বলা চলে ঘুমের ঘোরে ছিলাম। কিন্তু লংগদুর ঘটনা ঘুম ভাঙিয়ে দিল আমার, চোখে আঙ্গুল দিয়ে বাস্তবতা দেখিয়ে দিল। অবশ্য এ ধরণের ঘটনা ঘটবে আরো আগে টের পেয়েছিলাম বুদ্ধকে সন্ত্রাসী বানিয়ে মান্নার নোংরা বানোয়াট প্রতিবেদন যখন আওয়ামীলীগের পত্রিকা হিসেবে খ্যাত জনকন্ঠের প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয়েছিল তখন থেকেই। মান্নার বিরুদ্ধে এতো মিছিল, মানববন্ধনের পরও যখন সরকার কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না, তখনই বুঝে নিয়েছিলাম কোন ষড়যন্ত্র আসছে নিশ্চয়ই। সত্যি বলতে কি আওয়ামীলীগের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছি।
ইতিহাস বলছে সংখ্যালঘুদের উপর যত নির্যাতন হয়েছে তার সিংহভাগই তাদের সময়েই। আস্থার স্থানটা কিছুটা এখনও আছে শেখের বেটির উপর। আমার কেনো জানি মনে হয়, তাকে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ভুল তথ্য দেয়, ভুল বুঝায়। নইলে বাস্তবতাটা এমন হওয়ার কথা না। জানিনা এই আস্থাটা আর কতদিন ধরে রাখতে পারি। নাকি সেই আস্থার স্থানটিও একদিন তাসের ঘরের ন্যায় ভেঙ্গে যায়।
 
মাঝে মাঝে একদম হতাশ হয়ে যাই। তবে হ্যাঁ বিখ্যাত ব্যক্তিদের কিছু কবিতা, গান এখনো মনে সাহস দেয়। কবি নজরুলের সেই গানটাই এই মুহুর্তে প্রেরণা দিচ্ছে- চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়/আজকে যে রাজাধিরাজ কাল সে ভিক্ষা চায়… মহারাজ হরিশচন্দ্র, রাজ্য দান করে শেষ/ শ্মশানরক্ষী হয়ে লভিল চণ্ডাল বেশ। সময় মতো সচেতন না হলে ইতিহাস কিন্তু ঠিকই প্রতিশোধ নেয়, নেবে। মনে কি পড়ে নবাব সিরাজদৌল্লাকে যারা ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, হত্যা করেছিল তাদের কি দশা হয়েছিল? মীরজাফর প্রথমে পুতল রাজা হয়েছিল পরে সেই মসনদও হারিয়ে কুষ্ঠরোগী হয়ে মরেছিল, ক্লাইভ মরেছিল ক্ষুর দিয়ে আত্মহত্যা করে, অ্যাডমিরাল ওয়াটসন যে কিনা ষড়যন্ত্রের নায়ক ছিল সে যুদ্ধের অল্প কিছুদিন পরই অসুখ ভোগ করে মারা যায়। শুধু তারা নন, রায় দূর্লভ থেকে শুরু করে যারাই নানাভাবে ষড়যন্ত্র করেছিল তারা নিজ নিজ বংশ সহ ধ্বংস হয়েছে।
 
বর্তমানেও দেশ এক গভীর ষড়যন্ত্রে নিমজ্জিত। আমি জানিনা, যার উপর এখনো কিছুটা আস্থা রাখি সে দেশটাকে তুলে আনতে পারবে কি না। নতুবা সেই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে এদেশ থেকে সংখ্যালঘুরা বিলুপ্ত হবে। তবে এটাও বলে রাখি, ইতিহাস কিন্তু ছাড়বে না এই সব ষড়যন্ত্রকারীদের। একটুখানি সময়ের অপেক্ষা মাত্র। অনেক কিছুই লিখলাম মনে হতে পারে ঘুমের ঘোরে আবোল তাবোল বকতেছি। না, না, আগে ঘুমের ঘোরে ছিলাম; এখন ঘুম থেকে জেগেই বলছি এসব।
সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!