সমকামিতা ব্যক্তিগত ইস্যু, কোন ধর্মই ইহাকে পশ্রয় দেয় নাই

সুনয়ন বড়ুয়া ঃ সমকামীতা বলতে আমরা সকলেই বুঝি একই সেক্স বা লিঙ্গের মানুষের প্রতি যৌন আকর্ষন বোধ করা। লেসবিয়ান, গে দিয়ে আমরা মেয়ে ও ছেলেদের মাঝে সমকামীতা বুঝিয়ে থাকি।
সমকামিতা একটি যৌন প্রবৃত্তি, যার দ্বারা সমলিঙ্গের দুই ব্যক্তির মধ্যে প্রেম কিংবা যৌন আচরণ বোঝায়। প্রবৃত্তি হিসেবে, সমকামিতা বলতে বোঝায় মূলত সমলিঙ্গের কোনো ব্যক্তির প্রতি জেগে ওঠা “এক যৌন, স্নেহ বা প্রণয়ঘটিত এক ধরনের স্থায়ী স্বাভাবিক প্রবণতা”; “এছাড়া এর দ্বারা এই ধরনের সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ব্যক্তিগত বা সামাজিক পরিচিতি, এই ধরনের আচরণ এবং সমজাতীয় ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত এক সম্প্রদায়ের সদস্যতাও নির্দেশিত হয়। সহজ ভাষায় কোন ছেলের প্রতি ছেলের আকর্ষন অথবা কোন মেয়ের প্রতি মেয়ের আকর্ষনকে সমকামীতা বলে।
সমকামিতার ইংরেজী প্রতি শব্দ হোমোসেক্সুয়ালিটি, যা ১৮৬৯সালে প্রথম ব্যবহার করেন Karl Maria Cutberry তার লেখা ছোট একটি আইনি পুস্তিকায়। Homosexual শব্দটি গ্রীক হোমো এবং ল্যাটিন সেক্সাস শব্দের সমন্বয়ে গঠিত।
সমকামীদের কয়েকভাগে ভাগে বিভক্ত করা যায়।
১। Gay বা পুরুষ সমকামী
২। Lesbian বা নারী সমকামী
৩। Shemale বা হিজড়া
৪। Bisexual বা দ্বৈত যৌন জীবন
হিজড়া আর বাইসেক্সুয়াল’রা মূলত উভকামী তবে তাদের মধ্যে সমকামী বৈশিষ্ট্য বেশী প্রকট থাকে। যৌন তাড়না বা প্রবৃত্তির ভিত্তিতে মানুষ কে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
ক)সমকামীঃ সমলিঙ্গের মানুষের প্রতি যারা যৌন তাড়না অনুভব করে।
খ)উভকামীঃ যারা নারী-পুরুষ উভয়ের প্রতি যৌন বাসনা অনুভব করে।
গ)বিসমকামী বা অসমকামীঃ যারা বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি যৌন তাড়না অনুভব করে।

বাংলাদেশে গে লাইফস্টাইল দেখা যায় না। তাই আমার ধারণা ৯৮ ভাগ সমকামীরা বাইসেক্সুয়াল জীবন যাপন করে। যেখানে তারা প্রকাশ্যে সাধারন মানুষের মত স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সংসার করে। অন্য দিকে গোপনে সমকামিতা চালিয়ে যায়। এই ধরনের মানুষ দের দ্বারা আমাদের তরুন সমাজ সমকামি দুনিয়ায় ঢুকছে । সেটা বুঝে হউক অথবা না বুঝে।যা বাংলাদেশের জন্য মোটেও ভালো কিছু নয়।
বিভিন্ন ধর্ম সমকামীতার ব্যাপারে কি বলেছে তা একটু আলোচনা করি।
ধর্মে সমকামীতার ব্যাপারে আলোচনা আছে এবং ওই
ধর্মে সমকামীতা পাপ ।

ইসলাম ধর্ম:

ইসলাম ধর্মে সমকামীতা সম্পূর্ণ হারাম।এবং এই ব্যাপারে কোরআনের অনেক আয়াতে বর্ণনা দেয়া আছে।যদিও কোরআনে এই কাজের শাস্তির ব্যাপারে সাজা কি হবে তার স্পষ্ট কিছু বলা নাই তবে অনেক হাদীসে শাস্তির বিভিন্ন বর্ণনা আছে।আমি কিছুটা লিখতেছি আপনাদের কাছে তথ্য থাকলেও আমায় জানাবেন।কোরআনে বর্ণিত ::::
“আর আমি লূতকে রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেছিলাম। যখন সে স্বীয় সম্প্রদায়কে বললঃ তোমরা এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে সারা বিশ্বের কেউ করেনি ? তোমরা তো কামবশতঃ পুরুষদের কাছে গমন কর নারীদেরকে ছেড়ে। তোমরা নিশ্চিতই সীমালঙ্ঘনকারী।” (সূরা আরাফ ৭ : ৮০-৮১)পরবর্তী আয়াতে তাদের উপর শাস্তির ব্যাপারে বর্ণিত হয়
“এরপর ওদের উপর(সমকামীদের) মুষলধারে (কঙ্কর)বর্ষন করেছিলাম।অতএব অপরাধীদের পরিণতি কী হয়েছিল বুঝতেই পারছ”(সুরা আরাফ ৭ : ৮৪)
* “সারা জাহানের মানুষের মধ্যে তোমরাই কি পুরূষদের সাথে কুকর্ম কর?
এবং তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের জন্য সঙ্গিনী হিসেবে যাদের সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে বর্জন কর? বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।” (সূরা শু`আরা ২৬ : ১৬৫-১৬৬)
* “স্মরণ কর লূতের কথা, তিনি তাঁর কওমকে বলেছিলেন, তোমরা স্বজ্ঞানেই অশ্লীল কাজ করছ? তোমরা কি কামতৃপ্তির জন্য নারীদেরকে ছেড়ে পুরুষে উপগত হবে? তোমরা তো এক বর্বর সম্প্রদায়। উত্তরে তাঁর কওম শুধু এ কথাটিই বললো, লূত পরিবারকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো এমন লোক যারা শুধু পাকপবিত্র সাজতে চায়। অতঃপর তাঁকে ও তাঁর পরিবারবর্গকে উদ্ধার করলাম তাঁর স্ত্রী ছাড়া। কেননা, তার জন্যে ধ্বংসপ্রাপ্তদের ভাগ্যই নির্ধারিত করেছিলাম।আমি ওদের উপর (শাস্তি স্বরূপ কঙ্কর )বর্ষন করেছিলাম” ( সূরা নামল ২৭ : ৫৪-৫৮)
“আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ সুসংবাদ নিয়ে ইব্রাহীমের কাছে আগমন করল, তখন তারা বলল, আমরা লুতের জনপদের অধিবাসীদেরকে ধ্বংস করব। নিশ্চয় এর অধিবাসীরা অপরাধী।” (সূরা আনকাবুত ২৯: ৩১)
“যখন আমার ফায়সালা কার্যকর করার সময় এলো,তখন ঐ জনপদকে উল্ঠে দিলাম এবং অবিরাম বর্ষিত হলো প্রস্তর কঙ্কর ,যা সবই চিহৃিত ছিলো আগে থেকেই।
হাদিসে সমকামীতার কি বর্ণনা আছে তাঁর আংশিক দিতেছি।
# “ইবনে আব্বাস বলেন (রাঃ), রাসুল (স) বলেছেন, তোমরা যদি কাউকে পাও যে লুতের সম্প্রদায় যা করত তা করছে, তবে হত্যা কর যে করছে তাঁকে আর যাকে করা হচ্ছে তাকেও।” (আবু দাউদ ৩৮:৪৪৪৭)
# “আবু সাইদ আল খুদরী(রাঃ) বলেন, রাসুল (স) বলেছেন, একজন পুরুষ আরেক পুরুষের যৌনাঙ্গ দেখবে না। এক নারী আরেক নারীর যৌনাঙ্গ দেখবে না। এক পুরুষ আরেক পুরুষের সাথে অন্তত undergarment না পরে একই চাদরের নিচে ঘুমাবে না। এক নারী আরেক নারীর সাথে কখনও অন্তত undergarment না পরে একই চাদরের নিচে ঘুমাবে না।” (আবু দাউদ, ৩১: ৪০০৭)
# “আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স) বলেন, এক পুরুষ আরেক পুরুষের সাথে বা এক নারী আরেক নারীর সাথে ঘুমাতে পারবে না লজ্জাস্থান ঢাকা ব্যতীত। তবে ব্যতিক্রম করা যাবে, শিশু আর পিতার ক্ষেত্রে… রাসুল (স) ৩য় আরেকজনের কথা বলেছিলেন কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছি।” (আবু দাউদ, ৩১: ৪০০৮)
# “জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স) বলেছেন, আমি আমার কওমের জন্য সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা আশঙ্কা করি সেটা হল লুতের কওম যা করত সেটা যদি কেউ করে… ” (তিরমিজি, ১৪৫৭)
# “ইবনে আব্বাস বলেন, অবিবাহিত কাউকে যদি সমকামিতায় পাওয়া যায় তাহলে তাঁকে পাথর মেরে হত্যা করতে হবে।” (আবু দাউদ, ৩৮:৪৪৪৮ )
# “যে কাউকে লুতের কওমের মতো করতে দেখলে যে দিচ্ছে আর যে পাচ্ছে দুজনকেই হত্যা কর।” (তিরমিজি ১:১৫২)
# মুয়াত্তা শরীফের হাদিসে এর শাস্তি বলা আছে পাথর মেরে হত্যা।
# “ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স) বলেছেন, অভিশপ্ত সে যে কিনা কোন পশুর সাথে সেক্স করে, আর অভিশপ্ত সে যে কিনা সেটা করে যা লুতের সম্প্রদায় করত।” (আহমদ:১৮৭৮)
# “ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, আলী (রা) তাঁর সময়ে ২ জন সমকামীকে পুড়িয়ে দেন। আর আবু বকর(রা) তাদের উপর দেয়াল ধ্বসিয়ে দেন।” (মিশকাত, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৭৬৫, প্রস্তাবিত শাস্তি)।

কোরআানের প্রায় চৌদ্দ জায়গায় সমকামীতার কথা উল্লেখ থাকলেও এর শাস্তির বিধান কেবল আল্লাহর হাতেই।কারন কোন আয়াতেই বর্তমান সমাজে সমকামীদের কি শাস্তি সমাজ দিবে সেই ব্যাপারে আলোকপাত হয়নি তবে তিনি তাদের উপর পূর্বে কি শাস্তি দিয়েছিলেন তাঁর বর্ণনা আছে।কোরআনের সমকামীতার ব্যাপারে যে আয়াতগুলো তা অনেকটা উভকামীতার উপর।যেমন লুত সম্প্রদায় তাদের বউদের রেখে সমকাম করতো পুরুষদের সাথে।
হাদীসে সমকামীতার ব্যাপারে যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা তেমন ভিত্তিযুক্ত নয়।যেমন শাস্তির ব্যাপারে বহুমতের প্রভাব পরিলক্ষিত।যেহেতু সেই সময়ে সমকামীতা এত বেশী ছিলো না বিশেষ করে আরব সমাজে তাই এই ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নেই।
তবে ব্যাপারটা খুবই নিন্দনীয় এই বিষয়ে মুসলমান ধর্ম স্পষ্ট।কারো পক্ষে এটা বলা বৈধ হবে না যে ইসলাম ধর্মে সমকামীতার বৈধতা আছে অথবা সমকামীতার ব্যাপারে ইসলাম ধর্ম সহনশীল।ইসলাম ধর্মে এই কাজ(সমকামীতা) পুরোপুরি হারাম।
ইসলামী আইন ব্যাখ্যাকারী চার ইমাম সমকামিতার শাস্তি কি হবে তা নিয়ে একমত হতে পারেন নি। ইমাম আবু হানিফা সমকামীদের শাস্তির বিধানের ব্যাপারে হত্যা করার হাদীস গ্রহন করেন নি।অবস্থা পর্যালোচনা করে শারীরিক শাস্তি দেয়ার পক্ষে,অর্থদন্ড হতে পারে। ইমাম আবু বকর আল জাসাস বলেন, সমকামীদের হত্যা করার ব্যাপারে যে দুটি হাদিস আছে তা গ্রহনযোগ্য নয় এবং উক্ত হাদিস অনুসারে তাদেরকে কোন বৈধ শাস্তি দেয়া যেতে পারে না। তিনি এই হাদিস টি কে ভিত্তি হিসেবে ধরেন, “Muslim blood can only be spilled for adultery, apostasy and homicide”।
ইমাম হাম্বলী এগুলোর বিরোধিতা করেন এবং সমকামিতার শাস্তি মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করেন।
ইমাম শাফী মৃত্যুদন্ডের পক্ষে মত না দিলেও অর্থ দন্ডের দিকে মত দেন।
সবকিছুর সার কথা হলো কেউ পাপ করার পর সংশোধীত হয়ে গেলে এক রকম শাস্তি আর পাপের উপর অবিচল থাকলে কঠোর শাস্তি।

খ্রীস্টান:
বাইবেলে সমকামীতার আলোচনা তেমন ব্যাপক না হলেও আংশিক যা এসেছে তার সারমর্ম।
সমকামীতা একরকমের পাপ (আদি পুস্তক ১৯:১-১৩; লেবীয় ১৮:২২; রোমীয় ১:২৬-২৭; ১ করিন্থীয় ৬:৯) রোমীয় ১:২৬-২৭ পদ সুনির্দিষ্টভাবে শিক্ষা দেয় যে, ঈশ্বরের অবাধ্য হওয়া এবং তাঁকে অস্বীকার করার ফলস্বরূপ সমকামিতার শাস্তি দেওয়া হয়েছে। লোকেরা যখন অবিশ্বাসের কারণে পাপ করতেই থাকে, তখন ঈশ্বর “লজ্জাপূর্ণ কামনার হাতে” তাদের ছেড়ে দেন যেন তারা আরও জঘন্য পাপে ডুবে যায় এবং ঈশ্বরের কাছ থেকে দূরে থাকার ফলে নিস্ফল ও নৈরাশ্যের জীবন অনুভব করতে পারে। ১ করিন্থীয় ৬:৯ পদে বলা হয়েছে যে, যারা সমকামিতায় “দোষী”, তারা ঈশ্বরের রাজ্যের অধিকার পাবে না।
ঈশ্বর সমকামিতার মনোভাব দিয়ে মানুষ সৃষ্টি করেন নাই। পবিত্র বাইবেল বলেছে, লোকেরা পাপের কারণে সমকামী হয় (রোমীয় ১:২৪-২৭) এবং এটা তাদের নিজেদের পাপপূর্ণ ইচ্ছার পরিণতি। একজন ব্যক্তি সমকামিতার মত এমন সংবেদনশীল অনুভূতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে; যেমন কেউ কেউ আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে এবং অন্যান্য পাপস্বভাব নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তার মানে কিন্তু এ-ই নয় যে, ঐ ব্যক্তি তার পাপ স্বভাবের অধীনে নিজেকে চালাচ্ছে বলে তাকে ক্ষমা করা যায়। যদি কোন ব্যক্তি রাগ বা উগ্রতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, তাহলে তাকে কি ঐরকম ইচ্ছার অধীনে থাকতে দেওয়া যায়? অবশ্যই দেওয়া যায় না! সমকামিতার ক্ষেত্রেও ঠিক একই কথা বলা যায়।
যাইহোক্, বাইবেল কিন্তু সমকামিতাকে অন্যান্য পাপের চেয়ে “বড়” বলে বর্ণনা করে নাই। ১ করিন্থীয় ৬:৯-১০ পদে যে পাপগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সমকামিতা হচ্ছে সেগুলোর একটি, যা কিনা ঈশ্বরের রাজ্য থেকে একজনকে দূরে রাখে। বাইবেল অনুসারে- ব্যভিচারী, প্রতিমা পূজক, খুনী, চোর ইত্যাদির মতই সমকামীও ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা পাবার সুযোগ পেতে পারে। তবে যারা যীশুকে উদ্ধারকর্তা বলে বিশ্বাসে গ্রহণ করেছে, তাদের সকলকেই সমকামিতা সহ সকল পাপের উপরে বিজয়ী হবার শক্তি দিতে ঈশ্বর প্রতিজ্ঞা করেছেন (১ করিন্থীয় ৬:১১; ২ করিন্থীয় ৫:১৭; ফিলিপীয় ৪:১৩)।

বৌদ্ধ ধর্মে সমকামীতা কতটুকু যৌক্তিক?

সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধত্ব লাভ করার পর পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদেরকে শুরুতেই বিমুক্তি লাভের মূল অন্তরায় হিসেবে যে দুটি বিষয়কে তুলে ধরেছিলেন তার একটি কামাচার আর অন্যটি কিচ্ছ্রসাধন। পরবর্তীতে বিনয় প্রজ্ঞাপ্ত করতে গিয়ে ভিক্ষুদেরকে কামাচারকে বর্জনে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। যে সকল ভিক্ষুগণ কামাচার করবেন তারা পারাজিকাগ্রস্থ হবেন অর্থাৎ তাদের আর ভিক্ষুত্ব থাকবে না। কামাচারের বিশদ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ভিক্ষুসংঘের অতীব প্রয়োজনীয় গ্রন্থ, বলা যায় মোক্ষে প্রবেশের দরজা পাতিমোক্খ এর অর্থকথা কঙ্খাবিতরণীতে। সেখানে মনুষ্য, অমনুষ্য, তীর্যকপ্রাণীদের সাথে কামাচার নিষেধ করা হয়েছে। লিঙ্গ ভেদে পুরুষ, নারী এবং নপুংশক সবগুলোকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আবার দ্বারভেদে গুহ্যমার্গ (মলদ্বার), প্রস্রাবমার্গ, মুখমার্গ এই তিন ধরণের মার্গকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এভাবে সবগুলো মিলিয়ে মোট ৩০ প্রকার মৈথুন সেবন দ্বার সবগুলোকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে ভিক্ষুসংঘের জন্য। এসব দ্বারে মৈথুন সেবন চিত্তে তিল পরিমাণ পুরুষলিঙ্গ প্রবেশ করালেও ঐ ভিক্ষুর পারাজিকা হবে। লিঙ্গভেদের দিকে যদি আমরা চিন্তা করি তবে ওখানেই স্পষ্টত সমকামীতাকে নিষিদ্ধ দেখা যায় ভিক্ষুদের জন্য। ওখানে পুরুষ (ভিক্ষু) পুরুষের সাথে, নারীর সাথে এমনকি নপুংশক বা হিজড়ার সাথে কামাচার করলেও পারাজিকাগ্রস্থ হবে উল্লেখ পাওয়া যায়।
এবার আসি গৃহীদের প্রসঙ্গে। তথাগত বুদ্ধ গৃহীদের জন্য পঞ্চশীল প্রজ্ঞাপ্ত করেছেন যেখানে তিন নম্বর শীলে মিথ্যা কামাচারকে নিষেধ করেছেন। এখানে মিথ্যা কামাচার বলতে অবৈধ কামাচারকে বুঝানো হয়েছে। যে সকল কামাচার সমাজে বৈধ, সমাজ স্বীকৃত তা-ই হচ্ছে বৈধ কামাচার। আমাদের সমাজে স্বামী এবং স্ত্রীর কামাচারই বৈধ বাকী সব ধরণের কামাচার অবৈধ। এখানে কেউ কেউ দুজনের ইচ্ছায় মিলিত হলে সেটাকে বৈধ বলে দাবী করতে পারে, নানা ধরণের যুক্তি প্রদর্শন করতে পারে। সেক্ষেত্রে বলতে হয় আপনার ছোট বোনটি অবিবাহিত অবস্থায় কোন পুরুষের সাথে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তারা পরস্পরের সম্মতিতেই মিলিত হবে আর সেক্ষেত্রে সেই দুইজনের স্বেচ্ছায় মিলনকে কি আপনি বৈধ বলতে পারেন? কিংবা আপনার বড় ভাইটি যদি অন্যের স্ত্রীর সাথে প্রেম করে, দুজনে স্বেচ্ছায় মিলিত হয় তবে সেটাকে কি আপনি দুজনের সম্মতি আছে বলে বৈধ বলতে পারেন? যদি আপনার উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে সেক্ষেত্রে বলার কিছুই থাকেনা।
আবারও বলছি বৌদ্ধ ধর্মমতে যেটা সমাজ স্বীকৃত কামাচার এক কথায় স্বামী-স্ত্রীর কামাচারই হচ্ছে বৈধ। তথাগত বুদ্ধ যে সমাজে যে বিষয়টি গ্রহণীয় নয় তা বর্জন করতে বলছেন। এখন আমাদের সমাজে কি সমকামীতা গ্রহণীয় না বর্জনীয়? সমাজ বলতে আমরা কেবল বৌদ্ধ সমাজকে বুঝলে হবে না। আমাদের আশেপাশে যারা আছে তাদের সবাইকে নিয়েই তো আমরা সমাজবদ্ধ জীব। আমাদের আশেপাশে এই দেশে মুসলিম, হিন্দুরা বাস করে। মুসলিমদের সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষ পুরুষের সাথে কামাচার তো দুরের কথা, নারীর প্রস্রাবমার্গ ব্যতীত গুহ্যমার্গে কামাচারকেও নিষিদ্ধ করেছে। হিন্দুধর্মেও এই সমকামীতাকে বৈধতা দেয় নি। খ্রিষ্টানধর্মেও নেই এই সমকামীতার বৈধতা। তার মানে সমকামীতা সমাজ স্বীকৃত বৈধ কোন বিষয় নয়। অতএব সমাজে যেটা অবৈধ সেটা তো মিথ্যা কামাচারই। আর এই মিথ্যা কামাচার কখনোই গ্রহণীয় হতে পারে না বৌদ্ধ ধর্মে। এই মিথ্যা কামাচারকারী অবশ্যই পঞ্চশীল লঙ্ঘনকারী। আর এই মিথ্যা কামাচার সম্পাদনকারী তো বুদ্ধের প্রকৃত ধর্ম বিমুক্তির পথে কোন অবস্থাতেই গমন করতে পারে না কারণ প্রজ্ঞা লাভে শীল বিশুদ্ধি এবং চিত্ত বিশুদ্ধি হচ্ছে মূল।
কেউ কেউ বলতে পারেন সমাজে আগে ছিল না এখন আমরা সেটা চালু করবো তাতে সমস্যা কোথায়? এ প্রসঙ্গে মহাপরিনির্বাণ সূত্রে বুদ্ধ বলছেন- যে সমাজ পূর্বে যে বিধি ব্যবস্থাপিত হয় নাই এরূপ কোন বিধি ব্যবস্থাপিত করে না, পূর্বের ব্যবস্থাপিত সুনীতিগুলো লঙ্ঘন করে না, যথা ব্যবস্থাপিত ধর্মের অনুবর্তী হয়ে গমন করে সেই সমাজের শ্রীবৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী, পরিহানী হবে না। এখানে একটি বিষয় খেয়াল করুন পূর্বের মানুষগুলোর যে যৌন আকাঙ্খা ছিল না তা নয়। কিন্তু তারা স্বামী-স্ত্রীর মিলনকেই বৈধতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, সুনীতি হিসেবে গণ্য করেছে। আর তাই বুদ্ধের কথা মানলে তো সেই সুনীতির লঙ্ঘণ করার কোনো প্রশ্নই আসে না। নতুন করে এই বিষয়ে বিধি ব্যবস্থাপিত করার প্রশ্নই আসে না। ফলে সমকামীতা কোনো অবস্থাতেই বৈধতা পায় না।
কোনো কোনো ব্যক্তি এখানে কালাম সূত্রকে নিয়ে আসতে পারে তারা বলবে অতীতে ছিল না বলে এখন থাকবেনা তা তো হতে পারে না, যেহেতু আমার বিবেচনা বলছে এটা বৈধ অতএব সমকামীতায় কোনো বাধা নেই। মজার ব্যাপার হচ্ছে যারা অন্যের স্ত্রীর সাথে কামাচারে লিপ্ত হয় তারা সেটাকে বৈধ মনে করেই তা করে। নতুবা তাদের বিবেক যদি বলতো এটা অনৈতিক কাজ হচ্ছে, আমি অবৈধ কাজ করতে যাচ্ছি তবে সে কোন অবস্থাতেই তা করতে পারতো না।
আমি আগেও অনেকবার বলেছি, কালাম সূত্রের রেফারেন্স দিয়ে সবকিছু বৈধ হতে পারে না, সবকিছু গ্রহণীয় বর্জনীয় হতে পারে না। কালাম সূত্রের রেফারেন্সকে বিবেচনা করার মতো আপনাকে আগে সে অবস্থানে যেতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ : স্কুলে যাওয়া কোনো ছাত্রের কাছে স্কুলটা একটা বিরক্তির জায়গা, গাদা গাদা পড়া মুখস্থ করতে হয়, দিতে না পারলে শাস্তি পেতে হয়, পরীক্ষা দিতে হয় কয়দিন পর পর। তাদের বিবেচনায় স্কুলে যাওয়ার চেয়ে বাসায় বসে কাটানোই উত্তম। এখন তাদের সেই বিবেচনাকে আপনি গ্রহণ করতে পারেন না কারণ তারা এখনও পরিপক্ব নয়।
অনুরুপভাবে বুদ্ধের দেশিত কালাম সূত্রের গ্রহণের পূর্বে আপনাকে বুদ্ধের দেশিত আরো অনেক বিষয়ে পরিপক্ব হতে হবে। আর যারা প্রকৃত অর্থে বুদ্ধের দেশিত বিষয়ে পরিপক্ব হবে তারা তো যৌনতাকে বর্জনের চেষ্টা করবে, ইন্দ্রিয়কে সংযত করতে সচেষ্ট হবে। কারণ বুদ্ধের দেশনার বিভিন্ন অংশে যৌনতাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, ইন্দ্রিয়কে দমনের কথা বলা হয়েছে। ধর্মপদে দেখুন যমক বর্গের ০৮ নম্বর গাথায় বলা হয়েছে যারা ইন্দ্রিয়সমূহে সুসংযত মার বা রিপুগণ তাদেরকে অভিভূত করতে পারে না। ১০ নম্বর গাথায় ও সংযতেন্দ্রিয় এর কথা বলা হয়েছে। অপ্রমাদবর্গের ০৫ নম্বর গাথায় ইন্দ্রিয় দমনের দ্বারা সংসার স্রোত অতিক্রম তথা আত্মপ্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। যারা বুদ্ধের ধর্মকে জানবে তারা তো কিভাবে ইন্দ্রিয়ে সংযম হওয়া যায় তা নিয়েই ব্যস্ত থাকবে, কালাম সূত্র গ্রহণ করে সমকামী হবে কি হবে না তাদের জন্য বিষয়গুলো অমূলকই।
কেউ কেউ বলতে পারেন, বুদ্ধ স্পষ্ট করে কোথাও বলে নি সমকামীতা নিষিদ্ধ অতএব কেনো আমরা তা করবো না? তাদেরকে বলতে চাই বুদ্ধ তো স্পষ্ট করে কোথাও বলে নি আপন বোনের সাথে কামাচার নিষিদ্ধ তাহলে আপনি সেটাও করতে পারেন আপনার যুক্তি দিয়ে।
কেউ কেউ দালাই লামার কথা বলেন, নেটে সার্চ দিয়ে দেখুন, দালাইলামা কোথাও বলছেন আমাদের ধর্মীয় বইগুলো দেখতে হবে, কোথাও বলছেন আমাদের পূর্বের বইগুলো আমি পাল্টাতে পারিনা, আবার কোথাও বলছেন- দুজনের সম্মতি থাকলে সেখানে আমি কিছু বলতে পারি না। আগেই বলেছি দুজনের সম্মতি থাকলে অবিবাহিত পুরুষ মহিলাও কামাচার কারতে পারে, আবার অন্যের স্ত্রীর সাথেও কামাচার করা যায়, তাই বলে কি তা বৈধ হতে পারে? এখানে মনে রাখা উচিত, দালাই লামা তিব্বতের ধর্মীয় নেতা হিসেবে পরিচিত হলেও তার কথাকে ধর্তব্য ধরতে হবে এমনটা নয়।
প্রিয় পাঠক, যুগ এখন অতীব আধুনিক। অতি আধুনিকতা মানুষের উন্নতি যেমন আনছে তেমন অবনতিও কম আনছেনা। পারমানবিক শক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ পাচ্ছেন, বিদ্যুৎ দিয়ে এসি চলছে, ফ্যান চলছে, ট্রেন চলছে তেমনি পারমানবিক শক্তি দিয়ে মুহুর্তেই পৃথিবীর সবাইকে ধবংস করে দেওয়ার সুযোগও পাচ্ছেন। আপনি কোনটি ব্যবহার করবেন সেটিই মূল বিষয়। ভাল এর পিঠে মন্দ অবশ্যই থাকবে। তাই ভালটিকেই গ্রহণ করুন।
পরিশেষে আবারো এটুকু বলেই শেষ করতে চাই বৌদ্ধ ধর্মে মিথ্যা কামাচারকে কোন অবস্থাতেই বৈধতা দেয় না। সমকামীতা কোনো অবস্থাতেই বৈধ বা স্বীকৃত কোনো বিষয় হতে পারে না। আপনি কতটুকু গ্রহণ বা বর্জন করবেন বিষয়গুলো একান্তই আপনার। সত্য জানার জন্য উদগ্রীব অনুসন্ধিৎসু বৌদ্ধদের জন্যই কেবল এই লেখা।
সকলেই প্রজ্ঞা লাভ করুক।
তথ্য উৎস :
১) প্রজ্ঞা ভাবনা, ভদন্ত বংশদীপ মহাস্থবির
২) ভিক্ষু পাতিমোক্খ, ভদন্ত প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির
৩) ধম্মপদ, ভদন্ত ধর্মাধার মহাস্থবির
৪) মহাপরিনির্বাণ সূত্র, রাজগুরু ধর্মরত্ন মহাস্থবির
লেখক: সরকারী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ, ঢাকা।

বাংলাদেশের আইনে সমকামীতার শাস্তি ::
বর্তমান বিশ্বে অনেক দেশেই সমকামিতাকে বৈধ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এটি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যে কোন ধরনের যৌন-সহবাস, তা স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হোক, শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সমকামীতার ব্যাপারে বাংলাদেশের আইন কি বলে। বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাকৃতভাবে কোনো পুরুষ, নারী বা জন্তুর সাথে প্রকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সহবাস করেন, সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ডে বা দশ বছর পর্যন্ত কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন এবং তদুপরি অর্থদন্ডেও দন্ডিত হবেন।
এ ধারায় বর্ণিত অপরাধীরূপে গণ্য হবার জন্য যৌন সহবাসের নিমিত্তে অনুপ্রবেশই যথেষ্ট বিবেচিত হবে।
[Section 377. Unnatural offences– Whoever voluntarily has carnal intercourse against the order of nature with any man, woman or animal, shall be punished with imprisonment for life, or with imprisonment of either description for a term which may extend to ten years, and shall also be liable to fine.
Explanation– Penetration is sufficient to constitute the carnal intercourse necessary to the offence described in this section.]
এই ধারার অধীনে সমলিঙ্গ মানুষের মধ্যে পরস্পর যৌন-সহবাস, পায়ুকাম এবং পশ্বাচার (পশুর সাথে নর বা নারীর পায়ু বা যোনিপথে সংগম) শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এধরনের অপরাধ স্বেচ্ছায় করলেও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!