সবার উপরে বুদ্ধ

উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসুঃ তথাগত বুদ্ধের গুণ মহিমা যদি কেউ বর্ণনা করতে চায় তবে বইয়ের পর বই শেষ হবে কিন্তু তাঁর গুণ মহিমা বর্ণনা করা শেষ হবে না। আবার সম্যক সম্বুদ্ধ হওয়ার জন্য কল্পে কল্পে বোধিসত্ত্ব জীবন প্রতিপালন কালের বর্ণনা দিতে গেলে সেক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে। যে সকল বোধিসত্ত্বগণ প্রজ্ঞাকে প্রধান করে সম্যক সম্বুদ্ধ হওয়ার জন্য এগিয়ে যান তাঁদেরকে লক্ষাধিক চারি অসংখ্য কল্প ধরে পারমী পূরণ করতে হয়। শ্রদ্ধা ও বীর্য প্রধানদের ক্ষেত্রে তা তো আরো অত্যধিক, তাঁদেরকে লক্ষাধিক আট ও ষোল অসংখ্য কল্প ধরে পারমী পূরণের কথা ত্রিপিটকে উল্লেখ পাওয়া যায়। সম্যক সম্বুদ্ধের পরে কারো কথা চিন্তা করলে প্রথমেই পচ্চেক বুদ্ধের কথা চলে আসে, তাঁদেরকে লক্ষাধিক দুই অসংখ্য কল্প ধরে পারমী পুরণ করতে হয়। অগ্রমহাশ্রাবকদ্বয়কে লক্ষাধিক এক অসংখ্য কল্প ধরে পারমী পূরণ করতে হয়।

এক্ষেত্রে একটা বিষয় স্পষ্ট হয় একজন সম্যক সম্বুদ্ধের যে হারে দীর্ঘ সময় ধরে পারমী পূরণ করে বুদ্ধত্ব লাভ করতে হয় সেদিক থেকে একজন অর্হৎ এর তত সময় ধরে কষ্ট করতে হয় না। আবার এটাও ঠিক তথাগতের যে জ্ঞান তার সাথে একজন অর্হৎ এর জ্ঞানের তুলনা করা চলে না।  তথাগতের সাথে শ্রাবকদের বলের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিম্নে তুলে ধরছি- তথাগতের দশবলের মধ্যে কয়েকটি তথাগত ও শিষ্যদের মধ্যে সমভাবে বিদ্যমান; কয়েকটি শিষ্যদের মধ্যে বিদ্যমান নেই, আর কয়েকটি আংশিকভাবে শিষ্যদের মধ্যে বিদ্যমান। আসবক্ষয়জ্ঞান শিষ্যদের মধ্যেও সমভাবে বিদ্যমান। অনেক ধাতু, নানা প্রকারের ধাতু এবং লোকধাতু জ্ঞান (৪র্থ বল) এবং ইন্দ্রিয়সমূহের মৃদুতা-তীক্ক্ষ্ণতা জ্ঞান (৬ষ্ঠ বল) শুধু বুদ্ধেরই আছে। কারণ-অকারণ জ্ঞান (১ম বল) ও অপর সাতটি জ্ঞানে তথাগতের জ্ঞান যেখানে অসীম সেখানে শিষ্যের জ্ঞান সীমিত। শিষ্য এগুলো বলতে পারেন, কেবল তথাগতই তা ব্যাখ্যা করতে পারেন।

তথাগতের যেরকম পূর্বযোগ, পূর্বচর্যা, ধর্মব্যাখ্যা, ধর্মদেশনা শ্রাবকের সেরকম নয়। তথাগতই হচ্ছে শাস্তা, সম্যকসম্বুদ্ধ, সর্বজ্ঞ, সর্বদর্শী, ধর্মস্বামী, ধর্ম প্রতিষ্ঠাকারী। তথাগতই অনুৎপন্ন মার্গের উৎপাদনকারী, অসঞ্জাত মার্গে সঞ্জাত(জন্ম) আনয়নকারী, অঘোষিত মার্গের ঘোষণা প্রদানকারী, মার্গজ্ঞ, মার্গদর্শনকারী, মার্গবিদ। তথাগতের পরে তাঁর শিষ্যদের মধ্যে আমরা যার কথা আমরা চিন্তা করতে পারি তিনি হচ্ছেন সারিপুত্র মহাস্থবির। সারিপুত্র ভান্তে কিছুক্ষণ বৃষ্টি হলে সেই বৃষ্টিতে কয় ফোঁটা বৃষ্টি পড়েছে তা গণনা করে বলতে পারতেন। এতটা ক্ষমতাধর হওয়া সত্ত্বেও  তাঁর সাথে বুদ্ধের তুলনা চলে না।

একবার প্রশ্ন উঠে যে, কে কাকে দান দিলে বেশি পুণ্য হবে- বুদ্ধ সারিপুত্র ভান্তেকে? নাকি সারিপুত্র ভান্তে বুদ্ধকে দান দিলে? উত্তর এসেছিল বুদ্ধ সারিপুত্র ভান্তেকে দান দিলেই তুলনামূলক বেশি পুণ্য হবে। তার কারণ হচ্ছে দানের ফল সম্পর্কে সারিপুত্র ভান্তের চেয়ে বুদ্ধই বেশী জানেন। এত বিষয় উল্লেখ করার কারণ আছে। আর সে কারণটি হচ্ছে বর্তমান সময়ে আমরা ক্ষেত্র বিশেষে বুদ্ধের চেয়ে তাঁর শিষ্যদের প্রতিই বেশী অনুরক্ততা দেখাই। বুদ্ধের শিষ্যগণ আমাদের কল্যাণমিত্র। তাঁদেরকে আমাদের চতুর্প্রত্যয় দিয়ে সেবা করতে হবে। তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি দান  দিয়ে বিমুক্তির সাধনায় সহায়তা করতে  হবে। তবে তাকে যেন আমরা বুদ্ধ সমতুল্য করে না ফেলি। কেননা বুদ্ধের বর্তমান শিষ্যরা অর্হৎ হতে পারবেন। ধরে নিলাম কেউ একজন অর্হৎ, তাকে আমরা সেবা দিচ্ছি পূজা দিচ্ছি সবই ঠিক আছে কিন্তু তা কোনো অবস্থাতেই বুদ্ধের সমতুল্য করে নয়। কেননা বুদ্ধের  সাথে তাদের  তুলনাই হতে পারে না যা আমি পূর্বের ব্যাখ্যাতে উল্লেখ করেছি। বুদ্ধের পরে যদি আমাদের বড় কোনো শাস্তা থাকে তবে তা হচ্ছে ত্রিপিটক। বুদ্ধের মুখ নিশ্রিত বাণীগুলো সেখানে লিপিবদ্ধ আছে। সেগুলো আমাদের সবার আগে গ্রহণ করতে হবে। আর বাংলাভাষায় পূর্ণাঙ্গ ত্রিপিটক এখন অনেকটাই সুলভ হয়েছে। বুদ্ধের বর্তমান শিষ্যদের কাছেও আমাদের  অবশ্যই যেতে হবে তাদের দেশনা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করতে হবে। তবে সেক্ষেত্রে অন্ধভক্ত হলে চলবে না। বুদ্ধের শিষ্যরা যা বলছেন তা পুরোপুরি সত্য কিনা তা যাচাইয়ের জন্য আমাদের কাছে ত্রিপিটক আছে। প্রয়োজনবোধে ঐ ভান্তের সাথেও আমরা আলাপ করে না বুঝা কিংবা দ্বিধান্বিত হওয়া বিষয়গুলো পরিস্কার করে নিতে পারি। সেক্ষেত্রে ভান্তে এবং যে গৃহী আলাপ করে জানতে গেলো দুজনেই উপকৃত হবে। সেভাবে যাচাই করে গ্রহণ না করে অন্ধভক্ত হয়ে এগিয়ে গেলে, যা বলা হয় তা-ই বিবেচনা করে গ্রহণ না করে অন্ধভক্তি দিয়ে গ্রহণ করলে কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণ বয়ে আনার সম্ভাবনাই বেশী।

মনে রাখা দরকার বুদ্ধের ধর্ম কেবল বিশ্বাসের ধর্ম নয়। তাই তো তথাগত বুদ্ধ আহবান করেছিলেন- এসো দেখ, গ্রহণীয় হলে গ্রহণ করো। যেখানে বুদ্ধ নিজের কথাকে পর্যন্ত বিবেচনা দিয়ে গ্রহণ করতে বলেছেন সেক্ষেত্রে অন্যদের কথা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা এসব ভাবি না বলেই বিভিন্ন সময় দেখা যায় বৌদ্ধরা মতবাদী হয়ে উঠছে।। আমার আহবান থাকবে আসুন আমরা সর্বত্রই সদ্ধর্ম গ্রহণের তরে গমন করবো। অমুক ভান্তেকে বেশী শ্রদ্ধা  করি বলে, অমুক ভান্তের দেশানায় যাবো না তা নয়। সর্বত্রই যেতে হবে, তবে গ্রহণ করবো সেটাই যেটা ত্রিপিটকের সাথে মিলে। সেক্ষেত্রে আমাদেরকে আর অন্ধভক্তিতে পড়ে না থেকে সম্যক পথে এগিয়ে যাওয়া সহজতর হবে। পুকুরে অসংখ্য পানির মধ্য থেকে হাঁস অল্প পরিমাণ দুধ দেখলেও তা খুঁজে নিয়ে পান করতে পারে। আমাদেরকেও সেভাবে অসংখ্য দেশনা থেকে উন্নত বাস্তবসম্মত, ত্রিপিটক সম্মত বিষয়গুলো গ্রহণ করে নিজেকে বিমুক্তির পথে ধাবিত  করতে হবে। আবারো বলছি সবার উপরে বুদ্ধ সেকথাই আমাদের মনে প্রাণে ধারণ করতে হবে।

সকলেই প্রজ্ঞা লাভ করুক।

  • লেখক : সরকারী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ, ঢাকা।
সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!