রাঙামাটি-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানবাহন শুরু, চলছে ভূমি ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা, বিভিন্ন সমস্যাতে রাঙামাটিবাসী

সুপ্রিয় চাকমা শুভ, রাঙামাটি প্রতিনিধি :
 
রাঙামাটি – চট্টগ্রাম মহাসড়কে হালকা যানচলাচল শুরু হয়েছেঃ-
২১ জুন ( বুধবার) দুপুর ২ ঘটিকার সময়ে সংস্কার করা রাস্তা হালকাভাবে যানবাহন চলাচলের জন্য উদ্ধোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব জনাব এম.এ.এন. সিদ্দিকী। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার মোঃ রুহুল আমিন, সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম ডিভিশনের জেসিও মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার, রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান, রাঙ্গামাটি জেলা পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান, সড়ক ও জনপথ বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সাংবাদিকবৃন্দ।
 
রাঙামাটিতে ভূমি ধসের কারনে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম মহাসড়ক যানচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। রাঙামাটির শাল বাগান এলাকায় দেড়শ ফুট জুড়ে মাটি ধসে পড়ে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়কের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। দীর্ঘদিন যাত্রী ও পথচারীদের ভোগান্তির মধ্যে দিয়ে টানা আট দিন ধরে সেনা বাহিনীর ইঞ্জিয়ারিং কোর এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মীরা ওই স্থানের সড়কের দুই পাশে মাটি ভরাটসহ ইটের খোয়া ফেলার মাধ্যমে আজ যোগাযোগের জন্য যান চলাচল খুলে দেওয়া হয়েছে।
 
অপরদিকে, প্রবল বৃষ্টিপাতে ভূমি ধসে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্থ লোকজনদের ও ঘরবাড়ি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির তালিকা এখনো সম্পন্ন হয়নি। তালিকা প্রনয়নের কাজ এখনও চলছে। রাঙামাটি সদর উপজেলায় ১৯টি আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রিত ভূক্তভোগীদের সাথে কথা বলে তারা সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ভাবে তালিকা তৈরীর দাবী জানান।
 
এছাড়া গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান প্রেস ব্রিফিং জানান, ভূমি ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের সঠিক ভাবে তালিকা তৈরীর জন্য সবাইকে আহব্বান জানান। তিনি আরও বলেন প্রবল বৃষ্টিপাতে ভূমি ধসে নিহত ব্যক্তির পরিবারের ১১৮ জনদের আত্বীয় স্বজন জনপ্রতি নগদ ৩০ হাজার টাকা, ত্রিশ কেজি চাউল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ১৯টি আশ্রিত কেন্দ্রে সার্বিক সহযোগিতার কাজ অব্যহত চলছে।
 
ভূমি ধসে পাহাড়ি আদিবাসী ৯ জনের সাপ্তাহিক ক্রিয়া সম্পন্ন:-
গত ১৩ জুন রাঙামাটিতে ভয়াবহ ভূমি ধসে ১১৮ জন নিহত হয়।তাদের মধ্যে আজ একই দিনে পাহাড়ি আদিবাসীদের ধর্মীয় ভাব মর্যাদায় সাপ্তাহিক ক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। মৃতদের উদ্দেশ্য ভিক্ষু সংঘের উপস্থিতিতে বুদ্ধ মূর্তিদান, সংঘদান, অষ্টিপরিস্কার দান, হাজার বাতি দান সহ নানা বিধ দান করা হয়েছে।
 
বৃষ্টি পড়লেই বেড়ে যায় মানুষের মনে আতঙ্ক:-
রাঙামাটিতে প্রবল বৃষ্টি পাতের কারনে ১১৮ জন মৃত্যু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক ঘর-বাড়ি। হালকা হালকা বৃষ্টি পাত শুরু হলেই মানুষের মনে শুরু হয় আতঙ্ক। ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ধরনের গুজব। অনেকে নিজের জীবন নিরাপত্তার জন্য আশ্রয় নিয়েছে প্রতিবেশী ও আত্মীয়ের বাড়িতে।
এ ব্যাপারে হোমিও ডাক্তার নির্মল কান্তি চাকমা বলেন, গত বারে ভূমি ধস আমার বাড়ির উপর পড়েছে। দুটি বসতবাড়ি সম্পূর্ণ ধসে একাকার হয়ে যায়। নিজের আর একটি বসতবাড়ি যদিও বা নিরাপদ রয়েছে তবুও ভয়ে বাসা ভাড়া করে জীবন কাটান হচ্ছে।
ভাড়াটিয়াদের অধিক হারে বেড়েছে ঘর ভাড়ার দাম:-
ভূমি ধসের কারনে অনেক পরিবার মা হারা, বাবা হারা, সন্তান হারা ও আত্মীয় হারা হয়েছে। হয়েছে অনেকে বসতভিটা হারা। আশ্রয়ের জন্য নিতে হচ্ছে ভাড়া বাসা। রাঙামাটিতে অনেক পরিবার নিরাপদ স্থান হিসেবে ভাড়া বাসা নিয়ে দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত বাসা ভাড়ার দাম। ভূক্তভোগী বাসার ভাড়াটিয়ারা জানান, যেখানে একটি টিনের বাড়ি তিন হাজার টাকা। সেখানে ছয় হাজার টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে যা এই দুর্যোগের সময় কারোর গ্রহণ যোগ্য বলে বিবেচিত নয়।
 
এব্যাপারে সরাসরি সাক্ষাৎকারে রিন্টু চাকমা তদারকি করে জানান, রাঙামাটিতে সব কিছু মনিটরিং হচ্ছে। কিন্তু বাসা ভাড়া যে অতিরিক্ত করে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে সেটি কেউ মনিটরিং করেনা। আমার পরিচিত এক ব্যক্তি তার বাসাটি নিরাপদ নয় ভেবে দুই মাসের জন্য অগ্রিম ২০,০০০/- প্রতিমাসে ১০,০০০/- টাকা ভাড়া দিতে হয়েছিল। যেখানে ভাড়া ৩-৫ হাজারের মধ্যে সেখানে ১০,০০০/- দিতে হয়েছে।
 
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন:-
সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার সুযোগ নিয়ে কেউ যেন কোনো ধরণের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে সে লক্ষ্যে লঞ্চঘাট ও বাজার মনিটরিং করছে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ। রাঙামাটি রিজার্ভ বাজারের মাছবাজার, কাঁচাবাজারসহ বিভিন্ন দোকান ও লঞ্চঘাট মনিটরিং করা ও তদারকির জন্য প্রশাসক জনাব মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান ও জেলা পুলিশ সুপার জনাব সাঈদ তারিকুল হাসান অন্যতম ভূমিকা পালন করছেন।
 
উল্লেখ্য যে, গত ১৩ জুন রাঙামাটিতে টানা ভারী বর্ষনে শহরের ভেদভেদীর যুব উন্নয়ন বোর্ড এলাকা, মুসলিম পাড়া. শিমুলতলী এলাকা, সাপছড়ি, মগবান, বালুখালী এলাকায় এবং জুরাছড়ি,কাপ্তাই, কাউখালী ও বিলাইছড়ি এলাকায় ৫ সেনা সদস্যসহ ১১৮ জন মারা যান। ক্ষতিগ্রস্ত হয় অনেক ঘরবাড়ি। ভূমি ধসের কারনে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক বিধস্ত হয়ে পড়লে যানচলাচল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এখনও খোলা আকাশের নিচে অবস্থান লংগদুর তিন এলাকাবাসী, সরকারে পক্ষ থেকে এখনও দেওয়া হয়নি সহযোগিতা:- বিক্র রঞ্জন চাকমা
মোটর সাইকেল চালক নয়নের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ২ জুন রাঙামাটি জেলাধীন উপজেলা লংগদুতে সেটেলার বাঙালী কর্তৃক পাহাড়ি আদিবাসীদের বসতবাড়িতে অগ্নি সংযোগের কারনে তিনটিলা, মানিকজোড় ছড়া, বাট্ট্যা পাড়া তিন এলাকাতে ২২৪ টি ঘর-বাড়ি আগুনে পুড়ে যায়। ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় তিন এলাকাতে। বাড়ি ঘর আগুনে পুড়ে যাওয়ার কারনে অনেকের খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করতে হচ্ছে। এখনও বসতবাড়ি নির্মানে কোন প্রকার সাহায্য প্রদান করা হয়নি ক্ষতিগ্রস্তদের। অনেকে বৌদ্ধ বিহার, অনেকে বিদ্যালয়ে, অনেকে প্রতিবেশীর বাড়ি আশ্রয় নিয়ে অনেকে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে।
 
এব্যাপারে আজ ভুক্তভোগী ক্ষতিগ্রস্ত বিক্র রঞ্জন চাকমা মুঠোফোনে জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সরকার বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও এখনও কোন প্রকার সহযোগিতা পায়নি ক্ষতিগ্রস্ত তিন এলাকাবাসী। বিভিন্ন এনজিও, সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা থেকে ত্রান তুলে দিয়ে কোন রকমে দিন কাটাতে হচ্ছে। এছাড়া মানিকজোড় ছড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৭টি পরিবার আশ্রয় নিয়ে কোন রকমে একবেলা ভাত খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। ১৭টি পরিবারের সদস্যের মাত্র একটি টয়লেট ব্যবহারের কারনে বিভিন্ন রোগ,দুগন্ধ ও শিশু সহ অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। জীবন হয়ে পড়েছে দূর্বিষহ।
সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!