যে অর্থে প্রবারণা

সুজয় বড়ুয়াঃ প্রবারণা বৌদ্ধদের অন্যতম একটি ঐতিহ্যবাহী জাতীয় উৎসব। গণতান্ত্রিক জীবনে ঐক্যের ডাক। আজ থেকে আড়াই হাজার বছর পূর্বেও বুদ্ধের গণতান্ত্রিক মননশীলতার শ্রেষ্ঠ আহ্বান এ প্রবারনা। আভিধানিক গণের মতে, প্রবারনা অর্থে প্রকৃষ্টরূপে বারণ বুঝায়। যা অকুশল যা ভ্রান্তি যা অনৈর্বাণি যা প্রমত্ত এমন অকল্যাণকর জীবনাচার হতে নিজেকে বারণ করা।
 
প্রবারণার আজ্ঞা চালু হওয়ার পূর্বেও ভিক্ষুরা বুদ্ধের প্রজ্ঞাপ্ত বিনয় নিয়মে বর্ষাব্রত প্রতিপালন করত। তবে কেউ প্রবারণা করত না।
গণতান্ত্রিক জীবনে সংঘসদস্যদের কেমন গুণের অধিকারী হওয়া বাঞ্ছনীয় তা বুদ্ধ উত্তমরূপে বুঝিয়ে দিয়েছেন- বুদ্ধ তখন সাবস্তীর মহাবিহার জেতবনে অবস্থান করছিলেন। সেই সময়ে ভিক্ষুদের নিয়ম ছিল ভিক্ষুরা যেখানে অবস্থান করুক না কেন, তিনমাস বর্ষবাস সমাপন করে বুদ্ধকে দর্শন করা এবং নানা কুশলাকুশল জিজ্ঞাস করা।
ঠিক ঐ সময় একদল ভিক্ষু দীর্ঘ পথপরিক্রমায় কোশলরাজ্য হতে সাবস্তীতে বুদ্ধের সকাশে উপস্থিত হন।
 
বুদ্ধ তাদেরকে কুশলাকুশল বিনিময়ে জিজ্ঞাসা করলেন- তোমরা কিভাবে বর্ষাবাস উদযাপন করলে? উত্তরে ভিক্ষুগন বললেন- ভদন্ত! আমরা পরস্পরের মাঝে বিবাদ বিসংবাদ বিতর্ক এড়াতে তিনমাসকাল মৌনতা অবলম্বন করি। পুরো বর্ষাবাস কারো সাথে কেউ একটি বারের জন্যেও বাক্য বিনিময় করিনি। একেবারে কঠোর মৌন ব্রত পালনে বর্ষাবাস পালন করি।
 
ভিক্ষুদের এমন কথায় উত্তরে বুদ্ধ মৃদুতিরস্কার করেন এবং বলেন- ভিক্ষুগণ! তোমাদের এরূপ আচরণ প্রসংসার যোগ্য নয়, খুবই নিন্দীয়। একসাথে একস্থানে বাস করতে গেলে একে অপরে বহু বাদ বিসংবাদ হওয়া অস্বাভাবিক নহে। দোষ ত্রুটি হওয়া স্বাভাবিক তাই বলে মৌনতা অবলম্বন করা উপযুক্ত সমাধান নহে। তাই আমি অনুজ্ঞা করছি- ভিক্ষুগণ! আজ থেকে বর্ষাবাস অন্তে তোমরা একত্রিত হয়ে প্রবারনা করবে।পরস্পর পরস্পরের দোষ ত্রুটির জন্যে ক্ষমা প্রার্থী হবে এবং পরস্পর পরস্পরকে প্রকৃতরূপে বরণ করে নেবে। কেউ দোষ ত্রুটির ঊর্ধ্বে নহে। তা অস্বাভাবিকও নহে। এক স্থানে অবস্থান করলে পরস্পর পরস্পরকে অনুশাসন করা, শীল বিনয়ের প্রতি গারবতা রেখে ক্ষেত্রবিশেষ বারণ নিবারণ আদেশ উপদেশ করলে শাসনের ও উভয়ের মহামঙ্গল সাধিত হয়। শাসন পরিশুদ্ধ হয়। এভাবেই বুদ্ধ প্রবারনার গুরত্ব উপস্থাপন পূর্বক ভিক্ষুসংঘকে প্রবারনা করা বাধ্যতা মূলক করেন।
এ হলো প্রবারনার তাৎপয্য সংক্ষেপে।
(মহাবর্গ, বিনয় পিটকে)
এছাড়াও বুদ্ধ তার প্রকৃত দর্শনের স্বরূপ ঠিক এভাবেই ব্যক্ত করেছিল-
যো হি পস্সতি সদ্ধম্মং সো মং পস্সতি পণ্ডিতে,
অপস্সমানো সদ্ধম্মং মং পস্সমপি ন পস্সতি।
যে ব্যক্তি ধর্ম আচরনের মধ্য দিয়ে আমাকে দেখে তিনিই বাস্তবিক আমাকে দেখে। যে ব্যক্তি সত্য পরিহার করে শুধু শুধু পূতিগন্ধময় দেহ দেখে তার পক্ষে আমার দর্শনও হয় না , ধর্ম দর্শনও হয় না।
যিনি পরিশুদ্ধিতার উপায় ঠিক এভাবে বলেছিলেন- নৈরণ্জনা নদী বা এমনি নদীতে স্নান করে লোভ দ্বেষ মোহ বিদূরীত করা ধৌত করা সম্ভব নয়। “কিং কাহসি গযং গন্ত্বা, উদপানোপি তে গয়া। গয়া তীর্থে স্নান করে কিবা ফল? ততপেক্ষা বাড়ী পাতকূয়াই শ্রেয়। যদি তুমি ত্রিদোষ লোভ দ্বেষ মোহ মুক্ত হতে পারো।
সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!