বৌদ্ধ ধর্মে সমকামীতা কতটুকু যৌক্তিক?

লিখেছেন- উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসুঃ এই ধরণের একটা বিষয়ে লিখতে হবে কখনো ভাবিনি। তবে সদ্ধর্মের সেবক হিসেবে বিভিন্ন সময় যখন লেখার চেষ্টা করি তখন এই বিষয়টাকে এড়িয়ে গেলাম না। যে সকল পাঠক আমাকে ভালবাসেন আমার লেখাকে পছন্দ করেন তারা ইচ্ছা করলে এই লেখাটি নাও পড়তে পারেন। এ রকম একটা বিষয়কে ভিত্তি করে লিখতে হচ্ছে বলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধত্ব লাভ করার পর পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদেরকে শুরুতেই বিমুক্তি লাভের মূল অন্তরায় হিসেবে যে দুটি বিষয়কে তুলে ধরেছিলেন তার একটি কামাচার আর অন্যটি কিচ্ছ্রসাধন। পরবর্তীতে বিনয় প্রজ্ঞাপ্ত করতে গিয়ে ভিক্ষুদেরকে কামাচারকে বর্জনে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। যে সকল ভিক্ষুগণ কামাচার করবেন তারা পারাজিকাগ্রস্থ হবেন অর্থাৎ তাদের আর ভিক্ষুত্ব থাকবে না। কামাচারের বিশদ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ভিক্ষুসংঘের অতীব প্রয়োজনীয় গ্রন্থ, বলা যায় মোক্ষে প্রবেশের দরজা পাতিমোক্খ এর অর্থকথা কঙ্খাবিতরণীতে। সেখানে মনুষ্য, অমনুষ্য, তীর্যকপ্রাণীদের সাথে কামাচার নিষেধ করা হয়েছে। লিঙ্গ ভেদে পুরুষ, নারী এবং নপুংশক সবগুলোকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আবার দ্বারভেদে গুহ্যমার্গ (মলদ্বার), প্রস্রাবমার্গ, মুখমার্গ এই তিন ধরণের মার্গকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এভাবে সবগুলো মিলিয়ে মোট ৩০ প্রকার মৈথুন সেবন দ্বার সবগুলোকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে ভিক্ষুসংঘের জন্য। এসব দ্বারে মৈথুন সেবন চিত্তে তিল পরিমাণ পুরুষলিঙ্গ প্রবেশ করালেও ঐ ভিক্ষুর পারাজিকা হবে। লিঙ্গভেদের দিকে যদি আমরা চিন্তা করি তবে ওখানেই স্পষ্টত সমকামীতাকে নিষিদ্ধ দেখা যায় ভিক্ষুদের জন্য। ওখানে পুরুষ (ভিক্ষু) পুরুষের সাথে, নারীর সাথে এমনকি নপুংশক বা হিজড়ার সাথে কামাচার করলেও পারাজিকাগ্রস্থ হবে উল্লেখ পাওয়া যায়।

এবার আসি গৃহীদের প্রসঙ্গে। তথাগত বুদ্ধ গৃহীদের জন্য পঞ্চশীল প্রজ্ঞাপ্ত করেছেন যেখানে তিন নম্বর শীলে মিথ্যা কামাচারকে নিষেধ করেছেন। এখানে মিথ্যা কামাচার বলতে অবৈধ কামাচারকে বুঝানো হয়েছে। যে সকল কামাচার সমাজে বৈধ, সমাজ স্বীকৃত তা-ই হচ্ছে বৈধ কামাচার। আমাদের সমাজে স্বামী এবং স্ত্রীর কামাচারই বৈধ বাকী সব ধরণের কামাচার অবৈধ। এখানে কেউ কেউ দুজনের ইচ্ছায় মিলিত হলে সেটাকে বৈধ বলে দাবী করতে পারে, নানা ধরণের যুক্তি প্রদর্শন করতে পারে। সেক্ষেত্রে বলতে হয় আপনার ছোট বোনটি অবিবাহিত অবস্থায় কোন পুরুষের সাথে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তারা পরস্পরের সম্মতিতেই মিলিত হবে আর সেক্ষেত্রে সেই দুইজনের স্বেচ্ছায় মিলনকে কি আপনি বৈধ বলতে পারেন? কিংবা আপনার বড় ভাইটি যদি অন্যের স্ত্রীর সাথে প্রেম করে, দুজনে স্বেচ্ছায় মিলিত হয় তবে সেটাকে কি আপনি দুজনের সম্মতি আছে বলে বৈধ বলতে পারেন? যদি আপনার উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে সেক্ষেত্রে বলার কিছুই থাকেনা।

আবারও বলছি বৌদ্ধ ধর্মমতে যেটা সমাজ স্বীকৃত কামাচার এক কথায় স্বামী-স্ত্রীর কামাচারই হচ্ছে বৈধ। তথাগত বুদ্ধ যে সমাজে যে বিষয়টি গ্রহণীয় নয় তা বর্জন করতে বলছেন। এখন আমাদের সমাজে কি সমকামীতা গ্রহণীয় না বর্জনীয়? সমাজ বলতে আমরা কেবল বৌদ্ধ সমাজকে বুঝলে হবে না। আমাদের আশেপাশে যারা আছে তাদের সবাইকে নিয়েই তো আমরা সমাজবদ্ধ জীব। আমাদের আশেপাশে এই দেশে মুসলিম, হিন্দুরা বাস করে। মুসলিমদের সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষ পুরুষের সাথে কামাচার তো দুরের কথা, নারীর প্রস্রাবমার্গ ব্যতীত গুহ্যমার্গে কামাচারকেও নিষিদ্ধ করেছে। হিন্দুধর্মেও এই সমকামীতাকে বৈধতা দেয় নি। খ্রিষ্টানধর্মেও নেই এই সমকামীতার বৈধতা। তার মানে সমকামীতা সমাজ স্বীকৃত বৈধ কোন বিষয় নয়। অতএব সমাজে যেটা অবৈধ সেটা তো মিথ্যা কামাচারই। আর এই মিথ্যা কামাচার কখনোই গ্রহণীয় হতে পারে না বৌদ্ধ ধর্মে। এই মিথ্যা কামাচারকারী অবশ্যই পঞ্চশীল লঙ্ঘনকারী। আর এই মিথ্যা কামাচার সম্পাদনকারী তো বুদ্ধের প্রকৃত ধর্ম বিমুক্তির পথে কোন অবস্থাতেই গমন করতে পারে না কারণ প্রজ্ঞা লাভে শীল বিশুদ্ধি এবং চিত্ত বিশুদ্ধি হচ্ছে মূল।

কেউ কেউ বলতে পারেন সমাজে আগে ছিল না এখন আমরা সেটা চালু করবো তাতে সমস্যা কোথায়? এ প্রসঙ্গে মহাপরিনির্বাণ সূত্রে বুদ্ধ বলছেন- যে সমাজ পূর্বে যে বিধি ব্যবস্থাপিত হয় নাই এরূপ কোন বিধি ব্যবস্থাপিত করে না, পূর্বের ব্যবস্থাপিত সুনীতিগুলো লঙ্ঘন করে না, যথা ব্যবস্থাপিত ধর্মের অনুবর্তী হয়ে গমন করে সেই সমাজের শ্রীবৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী, পরিহানী হবে না। এখানে একটি বিষয় খেয়াল করুন পূর্বের মানুষগুলোর যে যৌন আকাঙ্খা ছিল না তা নয়। কিন্তু তারা স্বামী-স্ত্রীর মিলনকেই বৈধতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, সুনীতি হিসেবে গণ্য করেছে। আর তাই বুদ্ধের কথা মানলে তো সেই সুনীতির লঙ্ঘণ করার কোনো প্রশ্নই আসে না। নতুন করে এই বিষয়ে বিধি ব্যবস্থাপিত করার প্রশ্নই আসে না। ফলে সমকামীতা কোনো অবস্থাতেই বৈধতা পায় না।

কোনো কোনো ব্যক্তি এখানে কালাম সূত্রকে নিয়ে আসতে পারে তারা বলবে অতীতে ছিল না বলে এখন থাকবেনা তা তো হতে পারে না, যেহেতু আমার বিবেচনা বলছে এটা বৈধ অতএব সমকামীতায় কোনো বাধা নেই। মজার ব্যাপার হচ্ছে যারা অন্যের স্ত্রীর সাথে কামাচারে লিপ্ত হয় তারা সেটাকে বৈধ মনে করেই তা করে। নতুবা তাদের বিবেক যদি বলতো এটা অনৈতিক কাজ হচ্ছে, আমি অবৈধ কাজ করতে যাচ্ছি তবে সে কোন অবস্থাতেই তা করতে পারতো না।

আমি আগেও অনেকবার বলেছি, কালাম সূত্রের রেফারেন্স দিয়ে সবকিছু বৈধ হতে পারে না, সবকিছু গ্রহণীয় বর্জনীয় হতে পারে না। কালাম সূত্রের রেফারেন্সকে বিবেচনা করার মতো আপনাকে আগে সে অবস্থানে যেতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ : স্কুলে যাওয়া কোনো ছাত্রের কাছে স্কুলটা একটা বিরক্তির জায়গা, গাদা গাদা পড়া মুখস্থ করতে হয়, দিতে না পারলে শাস্তি পেতে হয়, পরীক্ষা দিতে হয় কয়দিন পর পর। তাদের বিবেচনায় স্কুলে যাওয়ার চেয়ে বাসায় বসে কাটানোই উত্তম। এখন তাদের সেই বিবেচনাকে আপনি গ্রহণ করতে পারেন না কারণ তারা এখনও পরিপক্ব নয়।

অনুরুপভাবে বুদ্ধের দেশিত কালাম সূত্রের গ্রহণের পূর্বে আপনাকে বুদ্ধের দেশিত আরো অনেক বিষয়ে পরিপক্ব হতে হবে। আর যারা প্রকৃত অর্থে বুদ্ধের দেশিত বিষয়ে পরিপক্ব হবে তারা তো যৌনতাকে বর্জনের চেষ্টা করবে, ইন্দ্রিয়কে সংযত করতে সচেষ্ট হবে। কারণে বুদ্ধের দেশনার বিভিন্ন অংশে যৌনতাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, ইন্দ্রিয়কে দমনের কথা বলা হয়েছে। ধর্মপদে দেখুন যমক বর্গের ০৮ নম্বর গাথায় বলা হয়েছে যারা ইন্দ্রিয়সমূহে সুসংযত মার বা রিপুগণ তাদেরকে অভিভূত করতে পারে না। ১০ নম্বর গাথায় ও সংযতেন্দ্রিয় এর কথা বলা হয়েছে। অপ্রমাদবর্গের ০৫ নম্বর গাথায় ইন্দ্রিয় দমনের দ্বারা সংসার স্রোত অতিক্রম তথা আত্মপ্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। যারা বুদ্ধের ধর্মকে জানবে তারা তো  কিভাবে ইন্দ্রিয়ে সংযম হওয়া যায় তা নিয়েই ব্যস্ত থাকবে, কালাম সূত্র গ্রহণ করে সমকামী হবে কি হবে না তাদের জন্য বিষয়গুলো অমূলকই।

কেউ কেউ বলতে পারেন, বুদ্ধ স্পষ্ট করে কোথাও বলে নি সমকামীতা নিষিদ্ধ অতএব কেনো আমরা তা করবো না? তাদেরকে বলতে চাই বুদ্ধ তো স্পষ্ট করে কোথাও বলে নি আপন বোনের সাথে কামাচার নিষিদ্ধ তাহলে আপনি সেটাও করতে পারেন আপনার যুক্তি দিয়ে।

কেউ কেউ দালাই লামার কথা বলেন, নেটে সার্চ দিয়ে দেখুন, দালাইলামা কোথাও বলছেন আমাদের ধর্মীয় বইগুলো দেখতে হবে, কোথাও বলছেন আমাদের পূর্বের বইগুলো আমি পাল্টাতে পারিনা, আবার কোথাও বলছেন- দুজনের সম্মতি থাকলে সেখানে আমি কিছু বলতে পারি না্। আগেই বলেছি দুজনের সম্মতি থাকলে অবিবাহিত পুরুষ মহিলাও কামাচার কারতে পারে, আবার অন্যের স্ত্রীর সাথেও কামাচার করা যায়, তাই বলে কি তা বৈধ হতে পারে? এখানে মনে রাখা উচিত, দালাই লামা তিব্বতের ধর্মীয় নেতা হিসেবে পরিচিত হলেও তার কথাকে ধর্তব্য ধরতে হবে এমনটা নয়।

প্রিয় পাঠক, যুগ এখন অতীব আধুনিক। অতি আধুনিকতা মানুষের উন্নতি যেমন আনছে তেমন অবনতিও কম আনছেনা। পারমানবিক শক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ পাচ্ছেন, বিদ্যুৎ দিয়ে এসি চলছে, ফ্যান চলছে, ট্রেন চলছে তেমনি পারমানবিক শক্তি দিয়ে মুহুর্তেই পৃথিবীর সবাইকে ধবংস করে দেওয়ার সুযোগও পাচ্ছেন। আপনি কোনটি ব্যবহার করবেন সেটিই মূল বিষয়। ভাল এর পিঠে মন্দ অবশ্যই থাকবে। তাই ভালটিকেই গ্রহণ করুন।

পরিশেষে আবারো এটুকু বলেই শেষ করতে চাই বৌদ্ধ ধর্মে মিথ্যা কামাচারকে কোন অবস্থাতেই বৈধতা দেয় না। সমকামীতা কোনো অবস্থাতেই বৈধ বা স্বীকৃত কোনো বিষয় হতে পারে না। আপনি কতটুকু গ্রহণ বা বর্জন করবেন বিষয়গুলো একান্তই আপনার। সত্য জানার জন্য উদগ্রীব অনুসন্ধিৎসু বৌদ্ধদের জন্যই কেবল এই লেখা।

সকলেই প্রজ্ঞা লাভ করুক।

 

তথ্য উৎস :

১)   প্রজ্ঞা ভাবনা, ভদন্ত বংশদীপ মহাস্থবির

২)   ভিক্ষু পাতিমোক্খ, ভদন্ত প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির

৩)   ধম্মপদ, ভদন্ত ধর্মাধার মহাস্থবির

৪)   মহাপরিনির্বাণ সূত্র, রাজগুরু ধর্মরত্ন মহাস্থবির

লেখক: সরকারী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ, ঢাকা।

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

1 Comment

  1. লেখক বিষয়টাকে কেবল ব্যবিচার হিসেবে ধরে নিয়েছেন। এখানে শুধু বিবাহ বহির্ভূত কামাচারকেই বিশ্লেষণ করে গিয়েছেন। সমলিংগের দুই বা ততোধিক ব্যক্তি বিবাহ করলে এবং তাদের কামাচার সমপর্কে কিছুই বললেন না। অথচ এটাই আসল বিষয়ববস্তু হওয়া উচিৎ ছিল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!