বৌদ্ধরা এদেশ ছেড়ে চলে গেলেই কি সমাধান আসবে?

লিখেছেন- উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসু

(প্রসঙ্গ : বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উপর একের পর এক হামলা)
কয়দিন ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উপর একের পর এক হামলা হচ্ছে। কারণ কী? কারণ একটাই মায়ানমারে মুসলিমদের উপর হামলা হচ্ছে তার বদলা নেওয়া হচ্ছে। মায়ানমারে যখন সেনাবাহিনী কর্তৃক হামলা শুরু হয় তখন এদেশের বৌদ্ধ তথা ভিক্ষুসংঘরাই সবার আগে প্রতিবাদ করে মানব বন্ধন করে। এমনকি এই বারের আগেরবার যখন এই ধরণের ঘটনা ঘটেছিল তখনও সবার আগে এদেশের ভিক্ষুরাই প্রতিবাদ করেছিল। এসব যেন কারো চোখে পড়ে না।

মিডিয়া প্রায় সময় প্রচার করে যাচ্ছে মুসলিমদের উপর বৌদ্ধদের আক্রমণ হিসেবে। অন্যদিকে একগুয়ে কিছু এদেশি লোক আছে যারা প্রচার করছে মায়ানমারে মুসলিমরা থাকতে না পারলে এদেশে বৌদ্ধরাও থাকতে পারবে না। এখন বাংলাদেশী বৌদ্ধরা এদেশ ছেড়ে চলে গেলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? ধরুন বাংলাদেশী বৌদ্ধরা (বড়ুয়া, চাকমা, মারমা ইত্যাদি) কাল সবাই দল বেধে কোনো এক দেশে চলে গেল তারপর কী হবে? তারপর যা ঘটবে তার একটা সম্ভাব্য তালিকা দিলাম-

১. সারাবিশ্বে এ দেশ পাকিস্তানের মতো সাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে পরিচিতি পাবে। কারণ বৌদ্ধদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা রোহিঙ্গাদের চলে আসার ন্যায় সর্বত্র প্রকাশ পাবে মিডিয়ার কল্যাণে।

২. জাপানের মতো দেশ এদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে (জাপানই ৭১ এর পর থেকে এদেশে সর্বোচ্চ সহায়তা দিয়েছে, হলি আর্টিজেনে নিজ দেশের খ্যাতনামা প্রকৌশলীদের হারিয়েও বাংলাদেশের পাশে থেকেছে, এমনকি পদ্মা সেতু বিশ্বব্যাংক নানা তালবাহানা করলেও জাপানের জাইকা তেমনটা করেনি)।

৩. রোহিঙ্গারা বড়ুয়া চাকমাদের ফেলে যাওয়া বাড়ি ঘরে অবস্থান করে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করবে।

৪. পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থান করে তারা রাখাইন রাজ্যের মতো এদেশকেও ইয়াবা তৈরীর কারখানায় পরিণত করবে পার্বত্য অঞ্চলকে।

৫. অশিক্ষিত এসব রোহিঙ্গাদের বিশেষ করে শিশুদের ব্যবহার করে নতুন জঙ্গী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সহজ হবে প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলে। বলা যায় এখন যে জঙ্গীরা অনেকটাই থেমে গেছে সেই জঙ্গীরা নব উদ্যোমে এদেশেকে জঙ্গীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল বানাবে।

৬. কুটনৈতিকভাবে সবদিকেই ব্যর্থ হয়ে সবকিছুই হারাবে এদেশ। এই মুহূর্তে ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া, আমেরিকা কেউই নেই বাংলাদেশের পাশে।

৭. ভারত রোহিঙ্গা ইস্যু ছাড়া অন্যান্য সব বিষয়ে পাশে আছে। তখন হয়তো আর পাশে থাকবে না ভারতও। এখন আমরা যতই ভারত বিদ্বেষী হই না কেনো, ভারত দুই দিন পেয়াজ রপ্তানী বন্ধ করলে এদেশে পিয়াজের কেজি যে ২০০ হয়ে যায় সেটাও ভাবতে হবে। অর্থাৎ সব দ্রব্য মূল্যের উর্ধ্বগতি হবে।

৮. রোহিঙ্গারা ৫০০ টাকার কাজ ২০০ টাকায় করে দেবে ফলে সাধারণ বাঙ্গালীরা শ্রম বাজার হারাবে আর ধনীরা এই রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে কম টাকায় কাজ করিয়ে নিবে ঠিকই কিন্তু বাজার দর ছাড়বে না ফলে এক শ্রেণীর ধনী আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হবে আর সাধারণ মানুষরা নিঃস্ব হয়ে যাবে। উদাহরণ স্বরুপ-গার্মেন্টেসে রোহিঙ্গা শ্রমিকদের কম বেতনে নিয়োগ দেবে, বাঙ্গালীরা চাকরী হারাবে, আর ব্যবসায়ীরা আগের দামেই কাপড় রপ্তানী করে দ্বিগুণ ধনী হবে।

৯. চুরি ডাকাতি বেড়ে যাবে। ইতিমধ্যেই কক্সবাজার এলাকার অনেকেই মিডিয়াতে সাক্ষাৎকার দিচ্ছে রাতে তাদের ছাগল গরু হারিয়ে যাচ্ছে বলে। এটা আরো বাড়বে যখন বাঙ্গালীরাও চাকরী হারাবে তখন জীবন চলার তাগিদে তারাও এই পেশায় নেমে যাবে।

১০. বলা যায় ০৫ বছরেই বাংলাদেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হবে। কারণ কী? কারণ ইয়াবার ব্যাপক ব্যবহার। রোহিঙ্গা যারা আসছে তাদের সাথে দেখবেন ৪-৬ ছেলে মেয়ে। ৭০ হাজার এসেছে পেটে সন্তান নিয়ে। তাদের এতো সন্তান থাকার কারণ কী? বলতে লজ্জাজনক হলেও মূল কারণ ইয়াবা ব্যবহার আর যথেচ্ছা যৌনাচার।

১১. এরকম আরো অসংখ্য সমস্যার সাথে যোগ হতে পারে ভারতের হিন্দু উগ্রবাদীদের উগ্র আচরণ। তারাও তখন বলবে মায়ানমারের ঘটনার কারণে বৌদ্ধরা দেশ ছেড়েছে আর এই বিষয়কে কেন্দ্র করে যেকোন ইস্যু খুজে সেদেশের মুসলিমদের এদেশে তাড়াতে পারে। আর তখন যদি সেদেশের ২০ কোটি মুসলিম এদেশে চলে আসে প্রাণভয়ে রোহিঙ্গাদের মতো করে তখন কি হবে এদেশের একটু ভেবে দেখুন তো।

কারো কারো মনে হতে পারে আমি এদেশের মুসলিমদের মনে হয় ভয় দেখাচ্ছি। বাস্তবতা তা নয়, বাস্তবতা হচ্ছে যে সমস্যা সৃষ্ঠি হয়েছে তা কেবল মায়ানমার আর রাখাইন জনগোষ্ঠীর মধ্যে। কিছু উগ্রপন্থী রাখাইনদের সেনা চৌকিতে গুলি চালানোর বদলা নিতে মায়ানমারের সেনাবাহিনী যা করছে তা রীতিমতো জঘণ্য কাজ। তা কেউ সমর্থন করতে পারে না। অপরাধ কেউ করলে তাকে সনাক্ত করতে হবে। তাই বলে নির্বিচারে হত্যা নির্যাতন মেনে নেওয়া যায় না।

তবে এই নির্যাতনের কথা প্রচার করতে গিয়ে যে হারে বাংলাদেশীরা পূর্বেকার বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড় কিংবা ভুমিকম্পে নিহত মানুষদের রোহিঙ্গা হত্যা নামে প্রচার করছে তাও জঘণ্য। সব পোস্টেই লেখা থাকে কেবল বৌদ্ধ কর্তৃক মুসলিম নিধন। আসলেই কি তাই? তা হলে মায়ানমারের অন্য প্রদেশে এত মুসলিম থাকে কীভাবে? এমনকি তাদের সর্ববৃহৎ প্যাগোডা সোয়েডাগন এর পাশেও মুসলিমদের মসজিদ থাকে কীভাবে? আবার অনেকে মায়ানমারের ভিক্ষুসংঘের কিছু আন্দোলনের পূর্বেকার ছবি প্রচার করছে বর্তমান সময়ের ঘটনা নাম দিয়ে সাম্প্রদায়িক ইন্ধন যোগাতে। অথচ এই কথা সবাই জানে যে রোহিঙ্গাদের উপর হামলা করছে সেনাবাহিনীরা কোন অবস্থাতেই বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নয়। মিথ্যা দিযে তো সত্যের প্রচার করা যায় না বরং এরকম মিথ্যা প্রচারে সত্য বিষয়গুলোও সত্য কি না প্রশ্ন জাগে মনে।

মোট কথা মায়ানমারে যে সেনাবাহিনী কর্তৃক যে নির্যাতন হচ্ছে সেটা রাখাইন রাজ্যের সাথে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দ্বন্ধের ফসল। আর এই দ্বন্ধে ইন্ধন জোগায় আরসা নামক এক জঙ্গি জনগোষ্ঠী। এখন আমাদের উচিত হবে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক জনমত গড়ে তোলে রাখাইনে যে অত্যাচার চলছে তার সত্য বিবরণ তুলে ধরে বিশ্ব সম্প্রদায়কে বুঝিয়ে মায়ানমারের উপর চাপ দিয়ে রোহিঙ্গাদের সেদেশে ফেরত নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা। অন্যথায় এদেশে রোহিঙ্গারা থিতু হয়ে গেলে এদেশে মহাসংকটে পড়বে।

পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের সমব্যথী হয়ে বৌদ্ধদের উপর একের পর এক আক্রমণ চলতে থাকলে সারা বিশ্বে আরো একটি নেগেটিভ বার্তা যাবে। যারা মূল্য কেবল বাংলাদেশকেই দিতে হবে। তাই সকলের প্রতি অনুরোধ বিশেষ করে বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমের প্রতি – বৌদ্ধ মুসলিমের সংঘাত বলে প্রচার করে সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক সংবাদ প্রচার করা থেকে বিরত থাকুন। মায়ানমারের সেনাবাহিনীর বর্বরতার কথা তুলে ধরুন কোন অবস্থাতেই বৌদ্ধ মুসলিমের দ্বন্ধ হিসেবে নয়। সাথে সাধারণ মুসলিমদের প্রতিও অনুরোধ (বিশেষ করে যারা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উপর আক্রমণ করছেন), বৌদ্ধদের উপর হামলায় শান্তি আসবে না, বৌদ্ধরা পালালেও শান্তি আসবে না বরং অশান্তি বাড়বে।

মহান মুক্তিযুদ্ধেও বৌদ্ধরা অবদান রেখেছে দেশ ছেড়ে পালায় নি। অতএব বৌদ্ধদের নিজ নিজ অধিকার থেকে বঞ্চিত করার চিন্তা না করে আমরা বাংলাদেশীরা যে বড় সমস্যায় পড়ে গেছি তার পরিত্রাণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে সচেষ্ট হই।

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!