জন্মান্তরবাদ নিয়ে গৌতমী সাময়িকীতে মিথ্যা প্রচারণা!:

বৌদ্ধধর্ম নিয়ে সৌমেন পাত্রের বিভ্রান্তিকর লেখা (পর্ব-২)

বৌদ্ধধর্ম নিয়ে সৌমেন পাত্রের বিভ্রান্তিকর লেখা প্রসঙ্গে কয়েকদিন আগে লিখেছিলাম যেখানে তার লেখার ৬টি সুস্পষ্ট বিভ্রান্তি তুলে ধরেছিলাম। আমার লেখাটির সুচনায় কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয় তুলে ধরেছিলাম। কারা এসব প্রচার করছে তা নিয়ে। কেউ কেউ খুব নোংরা ভাষায় সেই সুচনা অংশের প্রতিবাদ করেছেন। আর প্রতিবাদের ভাষা দিয়ে তাদের নিজেদের জাত চিনিয়েছেন। আমি সে পথের পথিক নই যে তাদেরকে কুরুচিপূর্ণ ভাষা দিয়ে আক্রমণ করবো। সৎ সাহস আছে বলেই লুকোচুরি না করে স্পষ্ট করে নাম ধরে বলেছি যা বলার। তাদের প্রথম অভিযোগ গৌতমী সাময়িকীর প্রচ্ছদে আগুনের ছবি যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু তারা কি জানেনা তারা তার চেয়ে বড় অপরাধ করছে। হাজার বছর ধরে মানুষ যে বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে জানে সেই ধর্মকে নিয়ে তারা যাচ্ছে তাই লেখা প্রকাশ করছে কয়েকটা যুক্তি যোগ করে। তাদের কোনো বিষয়ে অজানা থাকলে তা যারা জানে তাদের কাছে গিয়ে আলোচনাপূর্বক সমাধান চাইতে পারে। কিন্তু বৌদ্ধধর্মে জন্মান্তর নাই, স্বর্গ নরক, পাপ পুণ্য নাই, পরকাল নাই বলে যে মনগড়া লেখা প্রচার করছে তা তো পুরো একটা জাতিগোষ্ঠীর ধর্মবিশ্বাসে আগুন দেওয়ার মতো, যা প্রচ্ছদের ছবিতে আগুনে দেওয়ার চেয়ে বহুগুণ বেশি অপরাধ।

ভিক্ষুণীসংঘের মুখপাত্র গৌতমী সাময়িকী থেকেই এসব বিভ্রান্তিকর লেখা প্রকাশ পায়, আর প্রকৌশলী পুলক বড়ুয়ার এক মুঠো বৌদ্ধ তরুণে এসব প্রচার পায়। এখানে তো মিথ্যা কিছুই বলি নাই। তাহলে তাদের নোংরাভাবে আক্রমণ করলাম কোথায়?সত্য কথাটা প্রকাশ করা কি অপরাধ?

আমার লেখাটিতে এটা স্পষ্ট করেছিলাম যে সৌমেন পাত্রের প্রতীত্যসমুৎপাদ নিয়ে সম্যক কোনো জ্ঞানই নাই। তাই তার মতো করে ইতিহাসের বড় একটা অংশ জুড়ে দিয়ে শেষের দিকে প্রতীত্যসমুৎপাদকে বিভ্রান্তিতে ফেলতে চেয়েছেন। কতটুকু সফল সেটা বিজ্ঞ মহলই বিচার করবে। যাই হোক গত লেখায় প্রাসঙ্গিকতা বড় হওয়ায় বিভ্রান্তি মাত্র ৬টি তুলে ধরেছি আজ নতুন করে আরো যোগ করে পূর্বের ৬টি সহ পুনরায় দিয়ে স্পষ্ট করতে চাই সৌমেন পাত্র কতটাই ভ্রান্ত।

১) সৌমেন পাত্র জন্মান্তরবাদ বলতে কিছু নাই এটা প্রমাণ করতে যেন সুবিধা হয় তাই ত্রিপিটক কবে লিখিত হয় তার ইতিহাস তুলে ধরেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন যে হীনযান আর মহাযানীরা নিজ নিজ মনগড়া বিষয় ত্রিপিটকে যোগ করেছেন। কিন্তু এই ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বেমালুম ভুলে গিয়ে স্বীকার করে নিয়েছেন যে বৌদ্ধধর্ম হতে হীনযান ও মহাযান উভয়ই সৃষ্ঠি হলেও হীনযান মহাযান উভয়েই জন্মান্তরকে বিশ্বাস করতেন। তার লেখার কিছু অংশ তুলে ধরছি-

“বৌদ্ধধর্মের এই অভিনব রূপটির মহাযান নামকরণের কারণ আছে। পূর্ববর্তী ভিক্ষুরা মনে করতেন, তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য নিজেদের পুনর্জন্ম রোধ করা। মহাযানীরা বললেন, এ তো সুস্পষ্ট স্বার্থপরতা। পৃথিবীরে এত অজ্ঞ প্রাণী পুনর্জন্ম রোধ করতে না পেরে দুঃখ পাবে আর আমি একা নির্বাণ লাভ করব? তার চেয়ে ভালো, আমি এই সব অজ্ঞ প্রাণীদের নির্বাণ লাভে সাহায্য করার জন্য বারবার জন্মাব।”

প্রিয় পাঠক, পাত্রের উদ্বৃতিতেই স্পষ্ট হয় পূর্বের হীনযানী খ্যাতরাও পুনর্জন্ম বিশ্বাস করতেন আবার পরে উৎপন্ন হওয়া মহাযানীরাও পুনর্জন্ম বিশ্বাস করতেন। অর্থ্যাৎ সব বৌদ্ধদের মধ্যে কখন নির্বাণ লাভ করবে তা নিয়ে দুই ধরণের মত থাকলেও দুদলই যে পুনর্জন্ম বিশ্বাস করতেন তা স্পষ্ট তিনি নিজেই করেছেন। বুদ্ধ পুনর্জন্ম সম্পর্কে অসংখ্যবার বলেছেন বলেই তৎকালীন সময়েও সব বৌদ্ধরা জন্মান্তরে বিশ্বাস করতেন। অতএব এতবছর পরে এসে পাত্র মহোদয় যে পুনর্জন্ম নেই বলে প্রচার করতে চাইছেন সেটা যে তারই ব্যক্তিগত চিন্তাধারা, বুদ্ধের চিন্তাধারা নয় তা তো স্পষ্ট।

২) পাত্র মহোদয় ইতিপূর্বে বলেছেন যে কোন কিছু কালাম সূত্রের ন্যায় বিবেচনা দিয়ে, অভিজ্ঞতা দিয়ে গ্রহণ করতে। অথচ সেই পাত্র নিজেই হুট করে বলে বসলেন— “বুদ্ধ নিজেও কখনও তাঁর পূর্বজন্মের কাহিনী শোনান নি।”আচ্ছা পাত্র মহোদয় কি বুদ্ধের সমকালীন কেউ ছিলেন? নইলে তিনি হুট করে এভাবে কিভাবে বলতে পারেন যে বুদ্ধ কাহিনী শোনান নি? তিনি তো বুদ্ধকে দেখেন নাই তাহলে এই অভিজ্ঞতা কই পেলেন। ভবিষ্যত বা অতীত জন্ম দেখছেন না বলে জন্মান্তর তিনি বিশ্বাস করছেন না, বুদ্ধের প্রচারিত ধর্মকে বিভ্রান্তিতে ফেলছেন অথচ এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ছাড়াই বলে দিলেন বুদ্ধ তার পূর্বজন্মের কাহিনী শোনান নি। এমনভাবে বললেন যেন তিনি ‍বুদ্ধের সেবক আনন্দ হিসেবে প্রতিনিয়ত বুদ্ধের সাথেই থাকতেন। এখানে স্পষ্ট পাত্র মহোদয় নিজের বেলায় ঠিক অন্যের বেলায় ভিন্ন।

৩) বুদ্ধ যেখানে স্বতন্ত্রভাবে চতুরার্য্য সত্য, আর্য্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ, প্রতীত্য সমুৎপাদ নীতি প্রচার করলেন সেখানে পাত্র বাবু বলছেন বুদ্ধের প্রকৃত মতকে সম্যকরূপে বুঝতে হলে নাকি তৎকালীন ব্রাহ্মণ্যধর্মের উপনিষদ পড়তে হবে। আচ্ছা প্রিয় পাঠক বলুন তো, চতুরার্য্য সত্য, আর্য্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ, প্রতীত্য সমুৎপাদ নীতি এরকম মৌলিক বিষয়ের সাথে উপনিষদের কী দরকার। ঠাকুর ঘরে কে রে আমি কলা খাই না। প্রকারান্তরে পাত্র মহোদয় কি তবে উপনিষদ পড়তে উদ্বুদ্ধ করলেন?

৪) পাত্র বাবু বুঝাতে চেয়েছেন যে, বুদ্ধ বলেছেন এক, শিষ্যরা আক্ষরিক অর্থে বুঝেছেন অন্য। পুরো ত্রিপিটকে এরকম দু একটা ঘটনা পাওয়া যায় যেখানে কিছু কিছু শিষ্যের নিজেদের মধ্যে দ্বিধা উৎপন্ন হয়েছিল আবার বুদ্ধ সেগুলো পরিস্কার করে দিয়েছেন এমনটাও উল্লেখ আছে। তাই বলে বুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্ম হীনযান, মহাযান কিংবা অন্যান্য সবাই পুরো জন্মান্তরটা নিয়েই ভুল বুঝবেন এমন হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া বুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এতগুলো অর্হৎ এর কথা উল্লেখ পাওয়া যায় তবে কি তারা সবাই মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন ছিল? মায়ানমার, শ্রীলংকা থেকে শুরু করে সব বৌদ্ধ প্রধান বা অপ্রধান দেশ সমূহ যেখানে এই জন্মান্তরে বিশ্বাসী সেখানে মহা সম্যকদৃষ্টি সম্পন্ন কি তবে পাত্র বাবুই আছেন? বাকীরা সবাই বুঝি মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন? কথাটা ভাবতেই খুব হাসি পায়। বুদ্ধ পরবর্তী নতুন বুদ্ধের আবির্ভাব হয়েছে দেখে।

৫) পাত্র মহোদয় দেবদহ সুত্রের সারার্থ না বুঝে তারও ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন- জৈনরা পুনর্জন্ম বিশ্বাস করে ঠিকই কিন্তু যেহেতু তারা যথাযথ না জেনে ধারণার বশবর্তী হয়েই অতীত জন্মের কথা বলছেন তাই তাদের মতবাদ ভিত্তিহীন–এটা বলে মূলত জৈনদেরকে ধারণা বশবর্তী না হয়ে অভিজ্ঞতা দিয়ে তা অর্জন করতে বলেছেন। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়- পাত্র মহোদয় একদিকে ত্রিপিটকে মনগড়া অনেক কাহিনী ঢুকেছে বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে ত্রিপিটকের যেসব সূত্র নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা দিতে পারবেন সেগুলোর রেফারেন্সই দেন। মানে সেগুলো বিকৃত হয় নি। আর অসংখ্য সুত্রে যে পুনর্জন্ম তথা জন্মান্তরবাদের কথা উল্লেখ আছে সেসব ক্ষেত্রে সুত্রগুলো বিকৃত। তাহলে  বুঝে নিতে পারেন পাত্র নিজেই যে বিভ্রান্ত তা সহজেই।

৬) পাত্র মহোদয় দীর্ঘ নিকায়, মজ্ঝিম নিকায়, সংযুক্ত নিকায় ও অঙ্গুত্তর নিকায়ে বুদ্ধের ধর্ম সংক্রান্ত বক্তব্যগুলি পাওয়া যায় বলে স্বীকার করেছেন। স্বীকার করেনি খুদ্দক নিকায়ের কথা। এবার তাহলে আসি তিনি যেসব নিকায় স্বীকার করেছেন সেখানে কী আছে।

দীর্ঘ নিকায় ২য় খন্ডের মহাপদান সূত্রে আমরা দেখতে পাই বোধিসত্ব জন্মের পরই বললেন- আমি অগ্র, আমি জ্যেষ্ঠ এবং আমি শ্রেষ্ঠ, এটাই আমার শেষ জন্ম, আমার আর পুনর্জন্ম হবে না। আচ্ছা যদি জন্মান্তর না থাকে তবে এটাই আমার শেষ জন্ম, আমার আর পুনর্জন্ম হবে না বলা হলো কেন?

মধ্যম নিকায় ২য় খন্ডে মহাসিংহনাদ সূত্রে বুদ্ধ উল্লেখ করেছেন- হে ভিক্ষুগণ, আমি দিব্যদৃষ্টিতে বিশুদ্ধ নেত্রে অতিক্রম করে দেখছি, সত্ত্বগণ চ্যুত হচ্ছে, পুনর্জন্ম লাভ করছে, স্বীয় কর্মানুসারে পাপীরা হীন, কুৎসিত রূপ লাভ করছে, দুর্গতি ভোগ করছে, পুণ্যবানেরা উত্তম, সুবর্ণ লাভ করছে, সুগতি ভোগ করছে। আচ্ছা বুদ্ধ কি তবে পুনর্জন্ম না দেখেই এমনটা মিথ্যাচার করেছেন? কিংবা তোদেয় পুত্র শুভ মানবকে বলেছিল অতীত জন্মের কর্মের কারণে এই জন্মে কেউ ধনী, কেউ গরীব, কেউ কালো, কেউ সুন্দর হয়ে জন্ম নেয় কথাগুলো কি মিথ্যা?

সংযুক্ত নিকায়ের নিদানবর্গের অত্থিরাগ সূত্রে বুদ্ধ বলছেন- যেখানে নামরূপের সঞ্চার আছে….সেখানে ভবিষ্যত পুনর্ভবের উৎপত্তি আছে। যেখানে ভবিষ্যত পুনর্ভবের উৎপত্তি আছে সেখানে ভবিষ্যত জন্ম, জরা ও মরণ আছে। আচ্ছা এই যে ভবিষ্যত পুনর্ভবের কথা বললেন বুদ্ধ সেটা কি তবে মিথ্যে?

মধ্যম নিকায় ২য় খন্ডে ঘটিকার সূত্রে দেখা যায় কশ্যপ বুদ্ধের সময়ে বর্তমান গৌতম বুদ্ধ জ্যোতিপাল নামে বোধিসত্ত্ব হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তবে কি এই জন্মগ্রহণের কথাটি মিথ্যাচার ছিল?

অঙ্গুত্তর নিকায়ের ৩য় নিপাতের গোতমকচেতিয় সূত্রে তথাগত বলছেন- আমি পুরোপুরি উপলব্ধি করে দেশনা করি, না জেনে নয়। বু্দ্ধ যদি পুরোপুরি উপলব্ধি করে, জেনে দেশনা করেন তবে জন্মান্তর যে নেই সেটা না বলে উল্টো বানিয়ে বানিয়ে জন্মান্তরের গল্প বললেন কেন?

সংযুক্ত নিকায়ের অনমতগ্গ সংযুক্তের তৃণকাষ্ঠ সূত্রে বুদ্ধ স্পষ্ট করে বললেন- হে ভিক্ষুগণ, সংসার অনাদি। অতীত জন্ম প্রত্যক্ষ না হওয়ায় অবিদ্যা, নিবরণ এ আবৃত থেকে তৃষ্ণা এবং সংযোজনের মাধ্যমে সত্ত্বগণ জন্ম থেকে জন্মান্তরে পরিভ্রমণ করে। আচ্ছা জন্মান্তর না থাকলে বুদ্ধ এমন মিথ্যাচার করেছেন কেন?

পাত্র মহোদয় যেসব নিকায়ের কথা স্বীকার করেছেন সেখানেও জন্মান্তর স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয় তবে কি জন্মান্তর নাই বলে নবরুপে নতুন কোনো ধর্ম প্রচার করতে চান পাত্র?

তার লেখার প্রতীত্যসমুৎপাদের অংশটিও অসংখ্য ভুলে ভরা যার উদাহরণ গত পর্বে দিয়েছি তবু জানার সুবিধার্থে আবারো যোগ করলাম—

৭) সৌমেন পাত্র নামক ভদ্রলোক তার লেখার এক অংশে লিখেছেন- “গৌতম বুদ্ধের জীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থগুলিতে পাওয়া যায় না। তবে যে সামান্য কিছু ….. কোথাও লেখা নেই যে, তিনি মৃত্যুর পর নির্বাণ লাভ করেছিলেন। ….এছাড়া অন্যান্য বহু ভিক্ষুর সম্পর্কেও বলা হয়েছে যে, তারা মৃত্যুর আগেই নির্বাণ লাভ করে অর্হৎ হয়েছিলেন। সুত্ত পিটকের অসংখ্য স্থানে আমরা বুদ্ধের মুখে শুনি যে, তার ধর্মের চুড়ান্ত ফল এই জীবনে পাওয়া যায়, মৃত্যুর পরে নয়। এই বিষয়টিতেও পুনর্জন্মের প্রচলিত ব্যাখ্যা সমস্যার মুখে পড়ে। এই ব্যাখা অনুযায়ী নির্বাণ ও দৈহিক মৃত্যু একসঙ্গে ঘটা উচিত। অর্থাৎ এই তত্ত্ব অনুসারে পয়ত্রিশ বছর বয়সেই বুদ্ধের মৃত্যু হয়ে যাওয়া উচিত ছিল।”

প্রিয় পাঠক, এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট হয় পাত্র মহোদয় নির্বাণের যে প্রকারভেদ আছে তা জানেন না। তাই তিনি নির্বাণ লাভের সাথেই মৃত্যুবরণকে টেনে এনেছেন আর মৃত্যু না হলে বৌদ্ধধর্মের পুনর্জন্মের ব্যাখ্যা সমস্যার মুখে পড়ে বলে উল্লেখ করেছেন। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে এই আমাদের দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্ররাও জানে নির্বাণ দুই প্রকার। জীবিত অবস্থায় সকল প্রকার তৃষ্ণা ক্ষয়ে যে নির্বাণ অবস্থা প্রাপ্ত হন তা হচ্ছে সোপাদিশেষ নির্র্বাণ আর দেহত্যাগে যখন সবকিছুই শেষ হয়ে যায় তখন তাকে বলে নিরুপাদিশেষ নির্বাণ। বুদ্ধ ৩৫ বছর বয়সে সোপাদিশেষ নির্বাণ প্রাপ্ত হয়েছিলেন আর ৮০ বছর বয়সে নিরুপাদিশেষ নির্বাণ। তাই বহু ভিক্ষুর নির্বাণ প্রাপ্তির কথায় কোনো সমস্যা আসে না। তারা সবাই সোপাদিশেষ নির্বাণ প্রাপ্ত হয়। আর নির্বাণ যে জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায় সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ হয় না। প্রশ্নবিদ্ধ যেটা হলো সেটা হচ্ছে নির্বাণ সম্পর্কে পাত্রের বিস্তারিত অধ্যয়ন না করা। তিনি অধ্যয়ন না করে উল্টো বুদ্ধের নির্বাণের ব্যাখ্যা কে বিভ্রান্তিতে ফেলতে চেয়েছেন।

৮)  পাত্র মহোদয় লিখেছেন- “প্রতীত্যসমুৎপাদকে তিন জন্মজুড়ে ব্যাখ্যা করার ফলে কেউ যে বর্তমান জীবনের শেষেই নির্বাণ লাভ করতে পারবে, তেমন নিশ্চয়তাও দেওয়া যাচ্ছে না।” প্রকৃত অর্থে নির্বাণ লাভের সাথে অতীত জন্ম আর ভবিষ্যত জন্মটা জরুরী নয়। এই দেহ নামরুপের সমষ্ঠি। নামরূপ থেকে ষড়ায়তন উৎপন্ন হয়, ষড়ায়তন থেকে স্পর্শ উৎপন্ন হয়। স্পর্শ থেকে বেদনা উৎপন্ন হয়। এই বেদনাকে যথাযথ দর্শন করতে পারলেই নির্বাণ লাভ সম্ভব। তাই অতীতের অবিদ্যা, সংস্কার আর ভবিষ্যতের বেদনা থেকে তৃষ্ণা, উপাদান, ভব, জাতি, জরা-মরণেরও কোনো প্রয়োজন নেই। কেবল নামরূপ থেকে বেদনা পর্যন্ত গবেষণা চর্চা করেই বিমুক্তি লাভ সম্ভব। পাত্র মহোদয়ের এ বিষয়ে যথার্থ অধ্যয়ন নেই বলেই নির্বাণ লাভ করতে তিন জন্ম লাগবেই কিংবা এই বর্তমান জন্মে নির্বাণ লাভের নিশ্চয়তা নাই বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।

৯)  পাত্র মহোদয় এক অংশে লিখেছেন- “প্রতীত্য-সমুৎপাদের চক্রটি ব্যাখ্যা করার সময় নামরূপের এই সংজ্ঞাকে সামান্য পরিবর্তন করে বলা হয়, বিজ্ঞান নামের অংশ নয়।”… এই কথাটি একদম ডাহা মিথ্যা কথা, উদ্ভট কথা। কারণ নাম বলতে স্পষ্ট করেই বলা আছে- বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞানের সমষ্টি হচ্ছে নাম। অর্থাৎ এই বিজ্ঞান নামেরই অংশ যা স্বতন্ত্র ভুমিকা রেখে নাম-রূপ উৎপন্নে প্রত্যয় হিসেবে কাজ করে। ডিমের কুসুমকে আলাদা করে কুসুম বলা হলেও ডিমে যুক্ত হলে একত্রে ডিমই বলা হয়। তেমনটা অবিদ্যা, সংস্কার হয়ে যে বিজ্ঞান উৎপন্ন করে সেই বিজ্ঞানই পরে নামরূপে একত্রিত হয়ে যায়। তাই বলে বিজ্ঞান নামের অংশ নয় এটা কোথাও উল্লেখ নাই। এটাও তার বিভ্রান্তি।

১০)  এই  ভদ্রলোক বিজ্ঞান আর বেদনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আরো বেশি বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন। তিনি লিখেছেন “একই জন্মে দুবার বিজ্ঞানের সৃষ্টি হতে পারে না।” বিজ্ঞান শব্দের অর্থ চিত্ত, মন ইত্যাদি। এখন পাঠক আপনারাই ভেবে দেখুন তো চিত্ত তো মুহুর্তে মুহুর্তে পাল্টায় মুহুর্তে মুহুর্তে উৎপন্ন হয়। যেই চিত্ত বা মন এখন আমেরিকা যেতে আগ্রহী হলো সেই মন একটু পর সেখানে না গিয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করতে পারে । এসব হয় মনের প্রতি মুহুর্তের পরিবর্তন এর ফলে। যেখানে অসংখ্য চিত্ত বা মন পাওয়া যায় বুদ্ধ যেখানে ৮৯ আবার ১২১ প্রকার চিত্তের কথা বলেছেন সেখানে পাত্র মহোদয় বলছেন একই জন্মে দুবার বিজ্ঞান সৃষ্ঠি হতে পারে না। এখন বলুন তার সম্পর্কে কি বলা যায়।

১১)  তিনি লিখেছেন-“চিত্ত কিন্তু পঞ্চস্কন্ধের অংশ নয়।” পাত্র মহোদয় চিত্ত আর বিজ্ঞান কি জানেন না। রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান এই পঞ্চকেই পঞ্চস্কন্ধ বলে। এখানে বিজানন শক্তি আছে বলে বিজ্ঞান, চিন্তন করে বলে চিত্ত, আর মনন করার শক্তি আছে বলে মন। অর্থাৎ চিত্ত, বিজ্ঞান, মন পরস্পর প্রতিশব্দ। আর পাত্র বাবু জানেন না যে চিত্ত আর বিজ্ঞান এক তাই বলছেন চিত্ত পঞ্চস্কন্ধের অংশ নয়।

১২)  তিনি বুদ্ধ শ্বাশতবাদ ও উচ্ছেদবাদ বিশ্বাস করতেন না বলে বিশ্লেষণ করেছেন আবার পাত্র মহোদয় নিজেই যে উপসংহারে বৌদ্ধধর্মকে উচ্ছেদবাদ হিসেবে প্রকাশ করেছেন তা বুঝতে পারেন নাই। কারণ জন্মান্তর বলতে কিছু যদি না থাকে এ জন্মেই সব শেষ হয়ে গেলে সেটা তো উচ্ছেদবাদই হয়। তার মানে একই লেখায় তিনি পরস্পর স্ববিরোধী মন্তব্য জুড়ে দিয়েছেন।

পাঠকবৃন্দ ভেবে দেখুন তার এক লেখায় এত সমস্যা আছে- সেই সমস্যা সম্পর্কে আমাদের মুক্তমনারা কিছুই জানেনা, অতএব বুঝে নিন সৌমেন পাত্র এবং তার লেখার প্রচারকারীদের দৌরাত্ম কতটুকু। অপপ্রচারে বিভ্রান্তিতে না পড়ে বিচার দিয়ে গ্রহণ করুন। আর অপপ্রচারকারীদের চিনে রাখুন যাতে ভবিষ্যতে তাদের কথায় বিভ্রান্তিতে পড়তে না হয়। সকলেই প্রজ্ঞা লাভ করুক।

  • লেখক : অফিসার, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ, ঢাকা।
সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!