বুদ্ধ মূর্তি: সাম্য-মৈত্রী-অহিংসার মূর্ত প্রতীক (বুদ্ধ মূর্তির গোড়াপত্তন এবং ক্রমবিকাশ):

বুদ্ধ মূর্তি: সাম্য-মৈত্রী-অহিংসার মূর্ত প্রতীক

Nobel Chy Prajna: আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছরেরও আগে গৌতম বুদ্ধ হিমালয়ের পাদদেশে কপিলাবস্তু নামক রাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রাজৈশ্বয্য, ভোগশ্বর্য্য সব কিছু ত্যাগ করে জীবজগতের মঙ্গলের জন্য সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী হয়ে কঠোর সাধনায় মাধ্যমে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে বুদ্ধত্ব লাভ করেন। তিনি সুদীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর ধর্মপ্রচার করে আশি বছর বয়সে মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্ত হন। এ সুদীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর ধর্মপ্রচার কালে তিনি শিক্ষা দিয়েছেন- মানবতা, স্নেহ, মায়া, মমতা, দয়া, করুণা, সহমর্মিতা, অন্যের ধর্ম বিশ্বাসে শ্রদ্ধা, ভ্রাতৃত্ববোধ, সামাজিক ন্যায়বোধ, সামাজিক কল্যাণ, নৈতিকতা ইত্যাদি সর্ব মানবধর্ম।

বুদ্ধের সময়কালে সমাজে জাতিভেদ প্রথা ও বর্ণ বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছিল। এ সামাজিক বৈষম্যগুলো দূর করার জন্য তিনি তাঁর ধর্মে সাম্যনীতিকে অগ্রাধিকার দেন। বৌদ্ধধর্ম মতে, সাম্যনীতি হচ্ছে- ‘বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার মৌলিক ভিত্তি’। সকল প্রকার দুঃখ, বৈষম্য, অন্যায়, অবিচার, ঘৃণা, সংঘাত প্রভৃতি বিদূরিত করার প্রধান অস্ত্র হচ্ছে- ‘সাম্যনীতি’। এ সাম্যনীতির কারণেই বৌদ্ধধর্ম ভারতবর্ষের সীমারেখা অতিক্রম করে সমগ্র বিশ্বে প্রসারিত হয়েছে। এ জন্য কোনো যুদ্ধ বা রক্তপাত ঘটেনি। বুদ্ধের সাম্যনীতি মানুষকে পরষ্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিক্ষা দেয়। অপরের অভিমত ও দৃষ্টি ভঙ্গির প্রতি সহিষ্ঞু হতে শেখায়। জাতি,বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল বৈষম্য ও বিভাজন বিদূরিত করে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে। মহাকারুণিক গৌতম বুদ্ধ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অদ্বিতীয় মহামানব যিনি শুধুমাত্র মানব জাতি নয় বিশ্বে যত প্রকার প্রাণী আছে শক্তিশালী কি দুর্বল, উচ্চ, মধ্য বা নিচু গোত্রের, ক্ষুদ্র বা বৃহৎ,দৃশ্য বা অদৃশ্য, কাছের বা দূরের, জীবিত বা জন্ম প্রত্যাশী-সকল প্রাণীর সুখ কামনা করেছেন। এমনকি তিনি প্রকৃতির প্রতিও মৈত্রী প্রদর্শন পূর্বক ‘বিনা প্রয়োজনে গাছের পাতা ছেঁড়া ও ডালপালা কাটা উচিত নয়’ বলে উপদেশ দিয়েছেন।

সাম্য-মৈত্রী-অহিংসার মূর্ত প্রতীক:

বুদ্ধমূর্তি সাম্য-মৈত্রী-অহিংসার মূর্ত প্রতীক। বিশ্বের সমগ্র বৌদ্ধদের ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও ঐক্যের প্রতীক। যখনই কোন বৌদ্ধ বিশ্বের যেকোন স্থানে বুদ্ধমূর্তির সামনে আসেন তখনই সে মাথা নত করে তাঁকে বন্দনা জানায়- কি থেরবাদী, কি মহাযানী, এমনকি মূর্তি পূজা বিরোধীও! প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করছি, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মূর্তি পূজার বিরোধী ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তক মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র ছিলেন। তিনি দু’বার বুদ্ধগয়ায় গিয়েছিলেন। তিনি নিজে বলেছেন, তাঁর জীবনে মাত্র একবারই মূর্তির সম্মুখে প্রণাম নিবেদনের প্রেরণা জেগেছিল এবং তা বুদ্ধগয়াতে বুদ্ধমূর্তি দর্শন করেই তাঁর এই ভাবোদয় হয়। এবং রবীন্দ্রনাথ বুদ্ধমূর্তির সামনে মাথা নত করেন। এ প্রসঙ্গে শ্রী কৃষ্ণ কৃপালনীর উক্তি স্মরণীয়। তিনি Viswa Bharatiquarterly, April 1943 সংখ্যায় ১৭৯ পৃষ্টায় লিখেছেন- “Only once in his life said Rabindranath did he feel like prostrating himself before an image. And that was when he saw the Buddha at Gaya”. মহিলাদের স্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থের ১২৪ পৃষ্টায় শ্রীমতী অমিয়া বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন- “একদিন তিনি অন্যের অজ্ঞাতসারে নিশিদ্ধ সময়ে যান মন্দিরে (বুদ্ধগয়ার মন্দিরে) এবং ভেজানো দরজা হঠাৎ উন্মুক্ত করে দেখতে পান উচ্চ বেদিতে উপবিষ্ট বিরাট বুদ্ধমূর্তির সম্মুখে দণ্ডায়মান কবিগুরুর ধ্যানগম্ভীর নিশ্চল প্রতিমূর্তি, দুই চক্ষে দর বিগলিত আশ্রুধারা”। জানা যায়, বুদ্ধগয়া থেকে ফিরে এসে রবীন্দ্রনাথ মস্তক মুণ্ডন করেছিলেন। তখন কবির মনে বৈরাগ্যের সঞ্চার হয়েছিল।

প্রথম বুদ্ধ মূর্তি:

বৌদ্ধ শাস্ত্র পাঠে জানা যায় একসময় রাজা প্রসেনজিৎ বুদ্ধকে প্রশ্ন করেছিলেন- “ভগবান, আপনার অবর্তমানে কাকে পূজা করলে আপনার পূজা হবে?” সর্বজ্ঞ বুদ্ধ প্রত্যুত্তরে ভাষণ করেছিলেন- “আমার অবর্তমানে বোধিবৃক্ষকে পূজা করলে আমার পূজা হবে”। তখনো ভগবান বুদ্ধ মূর্তি নির্মাণে মত দেনদি।

কখন থেকে বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ শুরু হয়েছে বা প্রথম বুদ্ধ মূর্তি কোনটি এই নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। কিংবদন্তি অনুসারে, গৌতম বুদ্ধ তিন মাসের জন্য তাবতিংসে তার মা ও ঋদ্ধিমান দেবতাদের অভিধর্ম দেশনা করতে গিয়েছিলেন। এদিকে বুদ্ধের অবর্তমানে বুদ্ধ ভক্ত রাজা প্রসেনজিৎ চন্দন কাঠের একটি বুদ্ধমর্তি তৈরী করে বুদ্ধের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। বুদ্ধের আগমনের সাথে সাথে সেই মূর্তিটিও সরিয়ে নেয়া হয়। অনেকের মতে, সেই বুদ্ধমূর্তি চীনে সংরক্ষিত আছে বলে উক্ত আছে!

মৌর্য্য সাম্রাজ্য:

বুদ্ধের সময় অজাতশত্রুপ্রমুখ বহু রাজন্যবর্গ ও শ্রেণীবর্গ বুদ্ধের একনিষ্ট ভক্ত ছিলেন। তখন যদি বুদ্ধ মূর্তি প্রচলন থাকতো নিশ্চয় বুদ্ধমূর্তি তৈরী করতেন। তাছাড়া মৌর্য্য সাম্রাজ্যে সম্রাট অশোক ছিলেন বৌদ্ধধর্মের নিবেদিত প্রাণ। তিনি স্বধর্মের প্রচার ও স্থায়িত্বের জন্য শত শত স্তুপ, স্তম্ভ, বিহার, চৈত্য, রেলিং, শিলালিপি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তখনও বুদ্ধ মূর্তি প্রচলন কিংবা উদ্ভব হয়নি বলেই মৌর্যশিল্প কলায় বুদ্ধ মূর্তি দেখা যায় না। নচেৎ অশোক যেরুপ স্বধর্মপ্রাণ নরপতি ছিলেন অবশ্যই তিনি বুদ্ধ মূর্তি নির্মাণ করাতেন। পরবর্তী শুঙ্গ যুগেও বুদ্ধ মূর্তির নির্দশন দেখা যায়নি। এই যুগ পর্যন্ত বৌদ্ধ শিল্পকলায় বুদ্ধের প্রতীক হিসেবে-

১) হাতি- বুদ্ধের মাতৃগর্ভে অভিসন্ধি গ্রহণ

২) অশ্ব- সংসার ত্যাগের প্রতীক

৩) বোধিবৃক্ষ- বুদ্ধত্বলাভের প্রতীক

৪) ধর্মচক্র- সারনাথে প্রথম ধর্মদেশনার প্রতীক

৫) স্তুপ (চৈত্য)- মহাপরিনির্বাণের প্রতীক ইত্যাদি ব্যবহার করা হত।

 

কুষাণ যুগ:

কুষাণ যুগ (খৃষ্টীয় ৫০ হতে ৩০০বৎসর)। কুষাণ যুগ প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই যুগ নানা কারণে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে যে অন্ধকারময় যুগের সূচনা হয়েছিল তা দূর করে কুষাণ রাজারা ভারতে এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং সেখানে সুষ্ঠু শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য তারা গৌরবের অধিকারী। সংক্ষেপে বলতে গেলে, প্রাচীন ভারতে মৌর্যদের পরে রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপনে কুষাণ রাজাদের দান সত্যই প্রশংসনীয়। কুষাণ আমলে বিদেশি সাম্রাজ্যের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। রোমান সাম্রাজ্য, মিসর ও পশ্চিম-এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সুতরাং রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠাই কুষাণদের একমাত্র কীর্তি নয়, বিদেশে ভারতীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রসারেও তাদের যথেষ্ট দান রয়েছে। এবং বৌদ্ধ ধর্মের ক্ষেত্রে কুষাণদের অবদান অনবদ্য।

কুষাণ রাজা কর্তৃক বিদেশী শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তাদের পক্ষাবলম্বনের কথাই ছিল কনিষ্ক ও তার অনুগামী কুষাণ রাজাদের সরকারী শিল্পকলা। খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দী হতে আরম্ভ করে তিন-চার শত বছরের শিল্পের অগ্রগতি এখান থেকে আরম্ভ হয়। এ জন্য ভারত শিল্পের ইতিহাসে এই যুগটি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

গান্ধার শিল্পকলা:

কুষাণ যুগে গান্ধার শিল্পকলায় সূচনা হয় এবং কুষাণ যুগে মহাযান ধর্মমতের ব্যাপক প্রসারতা লাভ করে। মহাযানীরা বুদ্ধের ধর্ম বাণীর চেয়ে তাঁর ব্যক্তি জীবনের উপর বেশী গুরুত্বারোপ করতেন। তাই এদেরকে বলা হয় বুদ্ধযান বা বোধিসত্ত্বযান। এ আমলে মহাযান বৌদ্ধধর্মের প্রকৃষ্ট বিকাশে গান্ধার শিল্পেই সর্বপ্রথম বুদ্ধমূর্তির নির্মাণ শুরু হয়। গান্ধারে (পাকিস্তান), গ্রিক, রোমান, পারসিক ও ভারতীয় শিল্পের মিশ্রণে সৃষ্টি হয় ঐতিহাসিক গান্ধার শিল্পকলা। এই গান্ধার ভাস্কর্যের অনুপম উদাহরণ গৌতম বুদ্ধের মূর্তি। উল্লেখ্য যে, সমসাময়িক কালে মথুরা ও অমরাবতীতেও বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ কাজ শুরু হয়। প্রাচীন ভারতে গান্ধার ছাড়াও অমরাবতী ও মথুরায় ভাস্কর্য শিল্প সমান গৌরবে বিরাজমান ছিল।

বুদ্ধমূর্তির ক্রমবিকাশ:

কুষাণ যুগে শিল্প বিকাশের ক্ষেত্র তিনটি। এদের মধ্যে অতি পুরাতন ও বিখ্যাত নগর মুথুরা। এখানকার শিল্পকলায় বিদেশী ভাবধারা দেখা গেলেও শিল্প প্রেরনার মূল উৎসটি ছিল ভারতীয়। ভারতীয় শিল্প রীতিতে যে সমস্ত স্থাপত্য ও ভাস্কর্য নির্মিত হয় এগুলো হল মথুরা শিল্পের উদ্ভব। মথুরা শিল্পকলার প্রসার ঘটে- তক্ষশীলা, সাঁচী, কোশাম্বী, শ্রাবস্তী, সারানাথসহ বিভিন্ন স্থানে। মথুরা শিল্পকলায় বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্বের মূর্তিগুলো বিকাশ লাভ করে। কিংবদন্তী আছে যে, প্রথমে ভারতীয় শিল্পীরা বুদ্ধমূর্তি নির্মাণের ব্যাপারে সাহস করেনি। কারণ কুষাণ যুগে নির্মিত বুদ্ধমূর্তি গুলোতে বুদ্ধের যে মহাপুরুষ লক্ষণসমূহ ফুটিয়ে তোলা  হয়েছিল তা ভারতীয় শিল্পদের মনপুতঃ হয়নি। তাই মথুরার শিল্পীরা এগিয়ে এলেন বুদ্ধমূর্তি নির্মাণে। মথুরার শিল্পীরা তাঁর ভাব ও আদর্শের রুপ দিয়েছেন বুদ্ধমূর্তিতে। এখানে সাধারণ মানব মূর্তির মতো বুদ্ধ মূর্তিতে রূপদান করা হয়নি। বুদ্ধমূর্তিকে অন্যমূর্তি হতে তফাৎ করা হয়েছে মহাপুরুষ লক্ষণযুক্ত করে। তাই অজানুলম্বিত বাহু, হাতের অঙ্গলী জোড়া, প্রশস্তবক্ষ, সুক্ষ্মত্রিচীবর ইত্যাদি লক্ষণযুক্ত করে মথুরা শিল্পকলায় বুদ্ধমূর্তিকে রূপদান করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মথুরা থেকে পাওয়া সিংহাসনে বসা বুদ্ধ মূর্তিতে ভাস্কর্যশিল্পের এক অদ্ভূদ অগ্রগতি দেখা যায়। এই মূর্তিই হল পরবর্তীকালের বসা মুর্তিগুলোর আর্দশ স্বরূপ। শিল্পী এখানে বুদ্ধের মুখশ্রীতে হাস্য লাবন্য-স্বর্গীয় ভাব ফুটিয়ে তুলতে সমর্থ হয়েছেন। মথুরার শিল্পীরীতি ভারতীয় ভাবধারায় নির্মিত বলে ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসে এর গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মথুরায় নির্মিত বুদ্ধমূর্তি সমগ্র উত্তর ভারতে জনপ্রিয়তা লাভ করে। মথুরা বৌদ্ধ শিল্পকলার প্রাণ কেন্দ্র হয়ে উঠে। বুদ্ধমূর্তিগুলো প্রধানত তিনভাগে বিভক্ত। যথা-

ক) স্থানক (দণ্ডায়মান), খ) আসন (বসা অবস্থা), গ) শায়িত (শোয়া অবস্থা)

ছবি: স্থানক, আসন এবং শায়িত বুদ্ধ মূর্তি।

মূর্তিগুলোর আবার বিভিন্ন মুদ্রা আছে। যথা-

ক) অভয় মুদ্রা, খ) ধর্মচক্রমুদ্রা, গ) বরদা মুদ্রা, ঘ) ভূমিস্পর্শ মুদ্রা, ঙ) ধ্যানী মুদ্রা ইত্যাদি।

ছবি: অভয় মুদ্রা, ধর্মচক্র মুদ্রা, বরদা মুদ্রা, ভূমিস্পর্শ মুদ্রা এবং ধ্যানী মুদ্রা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

ইক্ষাকুবংশ ও অমরাবতী শিল্প:

আনুমানিক খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে ইক্ষাকুবংশের রাজা শ্রী ধীর পুরুষ দত্তের রাজত্বকালে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় অমরাবতীর বৌদ্ধ শিল্পকলা গড়ে ওঠে। এই শিল্পকলায় গান্ধার ও মথুরা শিল্পকলার সমন্বয় ঘটে। সেখানকার শিল্প (বুদ্ধমূর্তি) সজীব ও প্রাণবন্ত। সেখানে বহু বুদ্ধমূর্তি, বোধিসত্ত্বমূর্তি নির্মিত হয়। পরবর্তীতে এই শিল্প ভারতসীমা অতিক্রম করে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।

গুপ্ত যুগ:

গুপ্ত যুগ ছিল একটি প্রাচীন ভারতীয় সাম্রাজ্য। আনুমানিক খ্রিষ্টীয় ৩২০ থেকে ৫৫০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে এই সাম্রাজ্য প্রসারিত ছিল। মহারাজ শ্রী গুপ্ত ধ্রুপদি সভ্যতা-র আদর্শে এই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। গুপ্ত শাসকদের আমলে যে শান্তি ও সমৃদ্ধি স্থাপিত হয়েছিল, তার ফলশ্রুতিতে দেশ বৈজ্ঞানিক ও শিল্পক্ষেত্রে বিশেষ উৎকর্ষলাভ করতে সক্ষম হয়। গুপ্ত যুগকে বলা হয় ভারতের স্বর্ণযুগ। এই যুগ ছিল আবিষ্কার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বাস্তুবিদ্যা, শিল্প, ন্যায়শাস্ত্র, সাহিত্য, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, ধর্ম ও দর্শনের বিশেষ উৎকর্ষের যুগ।

এ গুপ্তযুগেও বৌদ্ধ শিল্পকলার ব্যাপক সমৃদ্ধিও ঘটে। যদিওবা গুপ্ত যুগে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রবল প্রতিপত্তি ছিল, কিন্তু গুপ্ত সম্রাটগণের পরম সহিষ্ণুতার জন্য তাঁদের সময়ে বৌদ্ধ ধর্মের সম্প্রসারণ বিন্দুমাত্র ব্যাহত হয়নি। গুপ্ত যুগের অন্যতম সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রছিল পুন্ড্রবর্দ্ধন। এ সময়ের বুদ্ধমূর্তি সমূহ অধিকতর সুন্দর, প্রাণবন্ত ও অনুপম। বুদ্ধমূর্তি গুলোতে মুখমন্ডলের সমানুপাত গঠন, করুণা বিলাসিত চক্ষুদ্বয়, ওষ্ঠের হাস্য লাবন্য-স্বর্গীয় পবিত্রতায় পূর্ণবিকাশ দেখা যায়।

পাল যুগ:

পাল যুগেও বহু বুদ্ধমূর্তি ও বৌদ্ধদের দেব-দেবীর মূর্তি নির্মিত হয়। অষ্ঠম শতাব্দীর মধ্যভাগে গোপাল নামে এক সামন্ত রাজার উত্থানের মধ্য দিয়ে পাল যুগের দীর্ঘ শাসনকালের সূচনা হয় (৭৫০ থেকে ১১৫৫ খ্রি.)। গোপালের মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র ধর্মপাল (৭৭০-৮১০) দীর্ঘ ৪০ বছর রাজত্ব করেন। এরপর ধর্মপালের পুত্র দেব পালের (৮১০-৮৫০) চার দশকের শাসনকাল ছিল পাল যুগের সুবর্ণ সময়। শাসক হিসেবে তিনি ছিলেন সুযোগ্য ও দূরদর্শী। দেব পালের মৃত্যুর পর মূলত পাল রাজত্বে অবক্ষয় শুরু হয়। সর্বশেষ মদন পালের (১১৪০-১১৪৪খ্রি.) মৃত্যুর পর পাল শাসনের সলতে ক্ষীণ হয়ে আসে। তবে ৪০০ বছরের পাল যুগছিল একটি সুশৃঙ্খল শাসনকাল।

পাল রাজারা সবাই বৌদ্ধ ছিলেন। সে সময় কয়েকজন খ্যাতিমান ভাস্কর ছিলেন তন্মধ্যে বিটপাল ও ধীমানপাল উল্লেখযোগ্য। রাজা ধর্মপালের সময় বিখ্যাত বিক্রমশীলা বৌদ্ধ বিহার, পাহারপুরের সোমপুর বিহার, কুমিল্লা জেলার ময়নামতি, পন্ডিত বিহার প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রত্নতাত্বিক খননকার্যের ফলে এখানে বহু প্রত্ন সম্পদ আবিস্কৃত হয়েছে। এদের মধ্যে বুদ্ধমূর্তি উল্লেখযোগ্য। ধারণা করা হয়, গুপ্ত যুগের তুলনায় পালযুগের মূর্তি শিল্প সংখ্যা ও বিভিন্নতার ক্ষেত্রে অধিকতর লোকপ্রিয়তা অর্জন করলেও উৎকর্যতার ক্ষেত্রে সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। শুধু পাল যুগে নালান্দায় বিশেষ করে কালো পাথরের মূর্তিগুলো অধিকাংশ অভিনব সৃষ্টি। এগুলোর মধ্যে পাওয়া যায় বিভিন্ন নব কল্পনার অভিব্যক্তি ও সম্পূর্ণ পরিণত সৃজনশীলতার পরিচয়।  এ সময়ে কাঁচের গড়া মূর্তিগুলোও পালযুগের শ্রেষ্ঠ নির্দশন। এগুলোর অনুকরণে কাশ্মীর, তাঞ্জের, নাগপট্টম, বার্মা, থাইল্যান্ড, জাবা ও শ্রীলংকায় প্রাপ্ত মূর্তি গুলোতে মূর্তি শিল্পের দ্রুত ক্রমোন্নতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়াযায়।

উনিশ শতক:

উনিশ শতকে বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণের সাথে সাথে বিহারে বিহারে বুদ্ধমূর্তি প্রয়োজন হয়ে পড়ে- সে সময় কিছু হিন্দু ভাস্করেরা বুদ্ধমূর্তি নির্মাণে বিরাট ভূমিকা পালন করে। আরাকান চট্টগ্রামের সন্নিকটে হওয়ায় কিছু কিছু বুদ্ধমূর্তি সেখান থেকে এদেশে আসে। বর্তমানে থাইল্যান্ড থেকে বহু বুদ্ধমূর্তি এদেশে এসেছে। এর জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির অবদান গৌরবের। শ্রীলংকা থেকেও কিছু কিছু মূর্তি আনা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, এককালে এদেশে প্রচুর বৌদ্ধ দেব-দেবীর মূর্তি তৈরী হয়েছিল এগুলো মহাযানী প্রভাবের ফল। এভাবেই বৌদ্ধ দেবায়তন গড়ে উঠেছিল। এখনও চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, জাপান প্রভৃতি দেশের বৌদ্ধ বিহারে বুদ্ধমূর্তি ছাড়াও অন্যান্য দেব-দেবীর মূর্তি লক্ষ্য করা যায়। তন্মধ্যে বোধিসত্ত্ব মূর্তি, চারি লোকপাল দেবতারও মূর্তি রয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য মূর্তির মধ্যে তারা, মঞ্জুশ্রী, প্রজ্ঞা পারমিতা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে এসব মূর্তি বৌদ্ধ বিহারে এখন দেখা যায় না।

পরিশিষ্ট:

মহাকারুণিক বুদ্ধের ধর্ম মূলতঃ পারমার্থিক। এতে ব্যক্তি বা ভক্তিবাদের চেয়ে লোকোত্তর তথা আধ্যাত্মিকতার বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বুদ্ধের পরিনির্বাণকাল হতে কুষান সাম্রাজ্যের আরম্ভ কাল পর্যন্ত সময়ে (খৃঃ পূঃ ৬ষ্ঠ শতক হতে খৃীষ্ঠিয় প্রথম শতক) প্রাচীন বৌদ্ধ শিল্পকলায় কোন বুদ্ধ মূর্তি আবিষ্কৃত হয়নি। এবং থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্মে প্রথম বুদ্ধমূর্তি পূজার কোন বিধান ছিল না। কারণ থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্মে লৌকিকতার চেয়ে লোকোত্তরে তথা আধ্যাত্মিকতাকে বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে মহাযান মতবাদ প্রকৃষ্টরূপে বিকাশে বুদ্ধমূর্তির উদ্ভব এবং পূজার প্রচলন হয়। কারণ মহাযান মতবাদে বুদ্ধের মৌলিক বিষয়বস্তুর চেয়ে বুদ্ধের ব্যক্তি জীবনের উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া (মুক্ত বিশ্বকোষ), প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, বাংলাদেশের বৌদ্ধধর্ম, বুদ্ধ মূর্তির উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ- সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু, বুদ্ধমূর্তির ইতিহাস, ক্রমবিকাশ ও প্রভাব- ডক্টর প্রণব কুমার বড়ুয়া, Himalayanmart, all-history.org, Indian Sculpture, Buddhaskulptur, Gandhara.com etc.

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!