বুদ্ধের ধোঁকা !!!

নশ্বর সুজয় : 
(একটি অনুবাদিত লেখা)

বুদ্ধের সময়কালীন একটি ঘটনা। মালুঙ্ক্যপুত্র নামের এক বিদ্যান ব্রাম্মণ বড়ই জিজ্ঞাসু ভঙ্গিতে পাঁচশত শিষ্য সমেত বুদ্ধের নিকট উপস্থিত হলেন। তবে এটা নিশ্চিত যে, আজ মালুঙ্ক্যপুত্র বুদ্ধকে নানা প্রশ্নবাণে পরাজয় করতে সে উদ্যত। কেনা না ইতিপূর্বেও এ বিষয়ে চারিদিকে তার খ্যাতি আছে। উচ্চ বর্ণের লোক অন্যদিকে চারিবেদজ্ঞ, বিদ্যান, হাজারো ভক্ত শিষ্য ইত্যাদি ইত্যাদি।
এভাবে পাঁচশত শিষ্যে পরিবৃত হয়ে মালুঙ্ক্যপুত্রকে আসতে দেখেই বুদ্ধ ক্ষনিকের মধ্যেই জ্ঞাত হলেন যে, হাজারো প্রশ্নে মালুঙ্ক্যপুত্রের মন চট্পট করছে, কিলবিল করছে। এ মুহুর্তে আমি যদি তার জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর দিই তাহলে সে এর কিছুই ধারন করতে পারবে না বরং উল্টো ভ্রান্তরূপে গ্রহন করবে। কারন সব প্রশ্নের উত্তর শব্দগতভাবে সমাধান হয় না, এতে আত্ম উপলব্ধিরও প্রয়োজন।
অতপর মালুঙ্ক্যপুত্র বললেন – ভো গৌতম! আমার অনেক কিছুই জিজ্ঞাস্য আছে, যদি আজ্ঞা হয় তাহলে শুরু করতে পারি?
শান্ত সৌম্য স্বরে বুদ্ধ- মালুঙ্ক্যপুত্র! ঠিক আছে। তবে- আমার একটি শর্ত আছে। তুমি যদি আমার এই ক্ষুদ্র শর্তটি রক্ষা করতে পারো তাহলে আমি তোমার সকল প্রশ্নেরই উত্তর দেব। আমি কথা দিচ্ছি মালুঙ্ক্যপুত্র।
এ কেমন শর্ত ভদন্ত?
হে মালুঙ্ক্যপুত্র! তোমার মস্তিষ্ক তোমার মন এখন নানা প্রশ্নে পরিপূর্ণ, হাজারো প্রশ্ন ঘুরঘুর করছে। এমতাবস্থায় আমার
কোনো উত্তরই তোমার পক্ষে গ্রহন করা সম্ভব নয়। বরং অযোক্তিক মনে হবে।
সুতরাং আমার শর্ত হচ্ছে— তোমাকে একবর্ষা সময় কাল(চারিমাস) এখানে অবস্থান করতে হবে, ধ্যান ও মৌনতা অবলম্বন করতে হবে। আমি কথা দিচ্ছি মালুঙ্ক্যপুত্র! আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ একবর্ষা অন্তে তোমার সকল প্রকার প্রশ্নের উত্তর দেব।
বুদ্ধের এমন শর্ত শুনে মালুঙ্ক্যপুত্র চিন্তিত হলে। একবর্ষাকাল মৌনতা পূর্বক ধ্যান করার পর এ ব্যক্তি আমার জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর দেবে। কে জানে! এমন উত্তর সত্য হয় নাকি মিথ্যা! এমনও তো হতে পারে তার কোনো কথাই আমার মনোপুত হল না। পুরো একবর্ষা বিফলে গেল। এভাবে নানা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে স্থির করলেন ঠিক আছে, একবর্ষাকাল অপেক্ষা করি। আমারও তো নানা প্রশ্নই আছে। গৌতমের এমন শর্ত বিপদজ্জনক না হলেই হলো।
ঠিক ঐ সময় বুদ্ধের অন্যতম শিষ্য সারিপুত্র মালুঙ্ক্যপুত্রের সকাশে এসেই উপবেশন করেন। তার এমন বিচার দেখে সারিপুত্র হাস্যোদ্রেক হলেন। মালুঙ্ক্যপুত্র বিরক্ত ভঙ্গিতে বলেন- কি ব্যাপার! কি হেতু আপনি হাসলেন?
উত্তরে সারিপুত্র- বন্ধু মালুঙ্ক্যপুত্র! আপনি ওনার কথায় বিশ্বাস করবেন না। ওনি অনেক বড় ধোকাবাজ, অনেক বড় প্রতারক। আমাকেও ধোকা দিয়েছেন। তোমার তো সবে পাঁচশত শিষ্য মাত্র আর যখন আমি এসছিলাম তখন আমার হাজারোধিক শিষ্য ছিল। আমিও অনেক বড় কুলীন ব্রাম্মণ ছিলাম, নগরে আমারও অনেক সুখ্যাতি ছিল। কিন্তু এখানে এসে তার (বুদ্ধের) শর্ত রক্ষার্থে সম্মত হয়েছিলাম। বলল মৌন থাকো, ধ্যান কর, সংযতচিত্ত চিত্ত হও ইত্যাদি ইত্যাদি তারপর উত্তর দেব।
এভাবেই একবর্ষা গত হতে হতে নিজের মধ্যে আর কোনো প্রকার প্রশ্নের অবশিষ্ট রইলনা। তদ্ধেতু তাকেও আর প্রশ্ন করার সুযোগই ছিল না।
অতপর বুদ্ধ- মালুঙ্ক্যপুত্র ! আমি কথা দিচ্ছি যেভাবেই হোক আমি আমার কথা রক্ষা করব। তুমি যদি জিজ্ঞাসা না কর তাহলে আমি কিরূপে উত্তর দেব?

এভাবে দেখতে দেখতে প্রায় একবর্ষা গত হলো। মালুঙ্ক্যপুত্রও শর্তানুসারে ধ্যাননিষ্ঠ হলেন, মৌন হলেন, কথা বার্তায় উঠা বসায় সব কিছুতেই নিজের মধ্যেই এক অন্য রকম পরিবর্তন ঘটে গেল। জিজ্ঞাসু মন দমিত হলো; সে একবর্ষা পূর্বের মালুঙ্ক্যপুত্র আর বর্তমান মালুঙ্ক্যপুত্রের মধ্যে আকাশ পাতাল পরিবর্তন ঘটল। মনে মনে লাজ্জাও অনুভব করতে লাগলেন। পূর্বের একটি প্রশ্নের উত্তরও তার আর অবশিষ্ট রইলনা।
আজ একবর্ষা পুর্ণ হওয়ার অন্তিম দিন, পূর্বের শর্তানুসারে বুদ্ধ বললেন –
মালুঙ্ক্যপুত্র! তোমায় বচন দিয়েছিলাম তোমার জিজ্ঞাসিত সকল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার। এখনই উপযুক্ত সময়, তুমি তোমার সকল প্রশ্ন নিসঙ্কোচে করতে পারো।
শান্ত সৌম্য ধীর মালুঙ্ক্যপুত্র লজ্জামাখা হাস্যোদ্রেক গলায় বললেন- ভদন্ত! সত্যি আপনি আমাকে ধোকা দিয়েছেন। সারিপুত্র ঠিকই বলেছিল। আজ আর কোনো প্রশ্নই জিজ্ঞাসা করার মতোই অবশিষ্ট নেই। জিজ্ঞাসতব্য সকল প্রশ্নই আজ লীন হয়েগেছে। এতো দিন আমি ভ্রান্ত ছিলাম, হীনব্রতে মতিভ্রমের মতো দিকবিদিক ছুটেছিলাম। নিজেকে নিজে মিথ্যার জালে আবদ্ধ করেছিলাম। তখন অহংকার বোধ এতোটাই ছিল যে, নিজেকে সবকিছুতে অদ্বিতীয় মনে হতো।
এতাদিসং করিত্বান বহুং দুগ্গতিগামিনং,
বুয্হমানো মহোঘেন বুদ্ধং সরণমাগমং
সারণ গমনং পস্স, পস্স ধম্ম-সুধম্মতং।

বাংলা-
এতাদৃশ হীনব্রতে জীবন সায়াহ্নে,
প্রতিষ্ঠিত হইনু আমি বুদ্ধের শরণে;
বুদ্ধের আজ্ঞাপথ করি অনুসরণ,
সদ্ধর্মের ধর্মগুণ করেছি দর্শন।
(পালি – বঙ্গানুবাদে- নশ্বর)
(বুযহমানো মনোঘেনাতি- মহাস্রোতে পতিত হওয়ার সময় বা ভেসে যাওয়ার সময় বুঝায়, অর্থাৎ কামাদি মহা প্লাবনে কবলিত হয়ে অপায় সমুদ্রে পতনোন্মুখ হওয়া।)

হে মালুঙ্ক্যপুত্র! তুমি যদি প্রকৃত সত্য আত্মোপলব্ধি দ্বারা অবগত না হতে তাহলে আমি শত উত্তর দিলেও তা তোমার বোধের বাহিরে থাকত। বরং আরো নানা প্রকার ভ্রান্তির সৃজন হতো। যেভাবে নিদ্রিত ব্যক্তির নানা স্বপ্ন উৎপন্ন হয় কিন্তু জাগ্রত ব্যক্তির স্বপ্ন উৎপন্ন হয় না। ঠিকানরূপ ভাবে আত্মলবদ্ধ সত্য জ্ঞাত হীন ব্যক্তির নানা প্রশ্নই সৃজন করে, এতে হাজারো যুক্তি বা উত্তর দিলেও তা গ্রহনের ক্ষমতা রাখে না।
হে মালুঙ্ক্যপুত্র! মানুষের মন এমনই। যে হাজারো প্রশ্নের সৃজন হয় আবার সে মনে তার সমাধানও আছে। যদি মনকে নিজের বসে দমিত শান্ত সমাহিত সংযত করা না যায় তাহলে যতই উত্তর দিক না কেন , প্রশ্ন প্রশ্্রই থেকে যায়।

মানুষের মন এমনই উপলব্ধকারী যে, যখন শান্ত সমাহিত সংযত আত্মোপলব্ধে জাগ্রত থাকে তখন আর কোনো প্রকার প্রশ্নই অবশিষ্ট থাকে না।

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!