বুদ্ধের জন্মান্তরবাদ নিয়ে অপপ্রচার সজাগ হোন

উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসু:

আপনি কি জন্মান্তরবাদ বিশ্বাস করেন? উত্তরটি হ্যাঁ/না যে কোনটিই হতে পারে। আপনি বিশ্বাস করবেন কি করবেন না এটা একান্তই আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। শুধু তাই নয় আপনি আপনার পক্ষে কিংবা বিপক্ষে নিজের মতো করে অসংখ্য প্রবন্ধও লিখতে পারেন। পাঠকদের ভালো লাগলে কেউ কেউ আপনার রীতিমতো ভক্তও হয়ে যেতে পারে। এতটুকু পর্যন্ত হলে কোনো সমস্যাই ছিল না। কিন্তু সমস্যাটা তখনই সামনে আসে যখন আপনি বলে বেড়াবেন বৌদ্ধ ধর্মমতে কোনো জন্মান্তর নেই।

বর্তমানে ঠিক সেধরণের একটি অপপ্রচার খুব ভালভাবেই চলছে। একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী চায় বৌদ্ধ ধর্মে জন্মান্তরবাদ নাই বলে পুরো ত্রিপিটককেই বিতর্কিত করতে। আর ত্রিপিটককে বিতর্কিত করতে পারলেই তাদের আসল উদ্দেশ্য সফল হয়। এ ঘটনা পূর্বেও চলেছে এখন নতুন করে শুরু হয়েছে। কারা সেই সব ব্যক্তি, কেন তারা ত্রিপিটককে বিতর্কিত করতে চায় তা নিয়ে লিখব আমার লেখার একদম শেষের দিকে। তার আগে আজ কিছু প্রশ্ন করতে চাই বৌদ্ধদের উদ্দেশ্যে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করেই জন্মান্তরবাদ সম্পর্কে কিছু বলতে চাই যেনো পাঠক ভাল/মন্দ, সত্য/মিথ্যা গ্রহণের সুযোগ পায়।

আগেই বলেছি তারা ত্রিপিটককে বিতর্কিত করতে চায়। আর তাই ত্রিপিটক থেকে কিছু রেফারেন্স নিয়ে আলোচনা করতে চাই।
প্রথমে সূত্র পিটকে একটু দেখতে চাই জন্মান্তর নিয়ে কি কি লেখা আছে-

১) দীর্ঘ নিকায় ২য় খন্ডের মহাপদান সূত্রে আমরা দেখতে পাই বোধিসত্ব জন্মের পরই বললেন- আমি অগ্র, আমি জ্যেষ্ঠ এবং আমি শ্রেষ্ঠ, এটাই আমার শেষ জন্ম, আমার আর পুনর্জন্ম হবে না। আচ্ছা যদি জন্মান্তর না থাকে তবে এটাই আমার শেষ জন্ম, আমার আর পুনর্জন্ম হবে না বলা হলো কেন?

২) ধর্মপদের পাপ বর্গের ১১নং গাথায় উল্লেখ আছে- মৃত্যুর পরে কেহ কেহ মাতৃগর্ভে ও পাপীরা নরকে উৎপন্ন, ধার্মিকেরা স্বর্গলাভ করে। মৃত্যুর পর স্বর্গ নরক বা জন্মান্তর না থাকলে কেহ কেহ মাতৃগর্ভে কিভাবে যায়, কেহ কেহ স্বর্গ/নরকেই বা কিভাবে উৎপন্ন হয়? কিংবা অঙ্গুত্তর নিকায়ের ৩য় নিপাতে দেবদূত সূত্রে যে নরকের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে সেটি কি তবে মিথ্যা?

৩) ধর্মপদের জরা বর্গে ৮নং গাথায় দেখা যায় তথাগত বু্দ্ধ বুদ্ধত্ব লাভ করেই বললেন- গৃহকারকের সন্ধান করতে গিয়ে তাকে না পেয়ে অনেক জন্ম পরিভ্রমণ করেছি। বুদ্ধ হওয়ার পূর্বে যে জন্মান্তরের কথা এই গাথায় আছে তার স্বপক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায় আরো এক জায়গায় যেখানে আমরা জানতে পারি প্রজ্ঞাপ্রধান হয়ে সম্যক সম্বুদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করলে চারি অসংখ্য লক্ষ কল্প পারমী পূর্ণ করতে হয়। শ্রদ্ধা প্রধান বা বীর্য প্রধানদের তো আরো বেশি লাগে। এখন বুদ্ধ যে বুদ্ধত্ব লাভের পূর্বে জন্মজন্মান্তর ঘুরেছেন বলেছেন কথাটি কি তবে মিথ্যা?

৪) মধ্যম নিকায় ২য় খন্ডে মহাসিংহনাদ সূত্রে বুদ্ধ উল্লেখ করেছেন- হে ভিক্ষুগণ, আমি দিব্যদৃষ্টিতে বিশুদ্ধ নেত্রে অতিক্রম করে দেখছি, সত্ত্বগণ চ্যুত হচ্ছে, পুনর্জন্ম লাভ করছে, স্বীয় কর্মানুসারে পাপীরা হীন, কুৎসিত রূপ লাভ করছে, দুর্গতি ভোগ করছে, পুণ্যবানেরা উত্তম, সুবর্ণ লাভ করছে, সুগতি ভোগ করছে। আচ্ছা বুদ্ধ কি তবে পুনর্জন্ম না দেখেই এমনটা মিথ্যাচার করেছেন? কিংবা তোদেয় পুত্র শুভ মানবকে বলেছিল অতীত জন্মের কর্মের কারণে এই জন্মে কেউ ধনী, কেউ গরীব, কেউ কালো, কেউ সুন্দর হয়ে জন্ম নেয় কথাগুলো কি মিথ্যা?

৫) সংযুক্ত নিকায়ের নিদানবর্গের অত্থিরাগ সূত্রে বুদ্ধ বলছেন- যেখানে নামরূপের সঞ্চার আছে….সেখানে ভবিষ্যত পুনর্ভবের উৎপত্তি আছে। যেখানে ভবিষ্যত পুনর্ভবের উৎপত্তি আছে সেখানে ভবিষ্যত জন্ম, জরা ও মরণ আছে। আচ্ছা এই যে ভবিষ্যত পুনর্ভবের কথা বললেন বুদ্ধ সেটা কি তবে মিথ্যে?

৬) মধ্যম নিকায় ২য় খন্ডে ঘটিকার সূত্রে দেখা যায় কশ্যপ বুদ্ধের সময়ে বর্তমান গৌতম বুদ্ধ জ্যোতিপাল নামে বোধিসত্ত্ব হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তবে কি এই জন্মগ্রহণের কথাটি মিথ্যাচার ছিল?

৭) অঙ্গুত্তর নিকায়ের ৩য় নিপাতের গোতমকচেতিয় সূত্রে তথাগত বলছেন- আমি পুরোপুরি উপলব্ধি করে দেশনা করি, না জেনে নয়। বু্দ্ধ যদি পুরোপুরি উপলব্ধি করে, জেনে দেশনা করেন তবে জন্মান্তর যে নেই সেটা না বলে উল্টো বানিয়ে বানিয়ে জন্মান্তরের গল্প বললেন কেন?

৮) সংযুক্ত নিকায়ের অনমতগ্গ সংযুক্তের তৃণকাষ্ঠ সূত্রে বুদ্ধ স্পষ্ট করে বললেন- হে ভিক্ষুগণ, সংসার অনাদি। অতীত জন্ম প্রত্যক্ষ না হওয়ায় অবিদ্যা, নিবরণ এ আবৃত থেকে তৃষ্ণা এবং সংযোজনের মাধ্যমে সত্ত্বগণ জন্ম থেকে জন্মান্তরে পরিভ্রমণ করে। আচ্ছা জন্মান্তর না থাকলে বুদ্ধ এমন মিথ্যাচার করেছেন কেন?

সূত্র পিটকে এরকম কয়েকশত উদাহরণ আছে। এবার আমরা একটু বিনয় পিটক আর অভিধর্ম পিটক দেখবো-

৯) বিনয় পিটকের মহাবর্গে উল্লেখ পাওয়া যায়, বুদ্ধ গাথায় বলছেন- উদিত মগধে পূর্বে ধর্ম সকল/ নহে সুচিন্তিত তাহা, শুদ্ধ নির্মল/ উদঘাটিত এবে জান অমৃতের দ্বার/ জন্ম-জরা-মৃত্যু হতে করিতে উদ্ধার। আচ্ছা মৃত্যুর পর যদি আর জন্মই না থাকে তবে বুদ্ধ মৃত্যু থেকে উদ্ধারের পথের কথা কেন বললো?

১০) অভিধর্ম পিটকের পুগ্গল পঞঞত্তি তে পাওয়া যায়- সপ্তজন্ম পরিগ্রাহক নামক এক প্রকার পুদ্গল বা ব্যক্তি পাওয়া যায় যারা ইহলোকেই ত্রিবিধ সংযোজন ক্ষয় করে স্রোতাপন্ন হন। এবং অনধিক সাতজন্মের মধ্যেই সর্ব তৃষ্ণা ক্ষয় করেন। জন্মান্তর না থাকলে স্রোতাপন্নের যে ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তা মিথ্যে হয়ে যায়। আসলেই কি স্রোতাপন্ন বলতে কিছু নাই?

আপনি যদি মেনে নেন যে জন্মান্তর নেই তবে আপনাকে মানতে হবে ত্রিপিটকের সবকিছু মিথ্যা। কারণ জন্মান্তর নাই মানলে বর্তমানে যে বিনয় পিটক, সূত্র পিটক, অভিধর্ম পিটক আছে তার সবগুলোই মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয় উপরোক্ত রেফারেন্স সমূহের কারনে।

আপনাকে কেউ কেউ বলবে ত্রিপিটকে অনেক বিকৃতি ঢুকেছে। ভান্তেরা মনগড়া অনেক বিষয় যোগ করেছে। ইতিহাস বলে ১ম, ২য় সংগীতিতে সবাই অর্হৎ ভান্তে ছিলেন। ৩য় সংগীতিতে যখন থেকে ত্রিপিটক লেখা শুরু হয় সেখানেও অর্হৎ মোগ্গলী পুত্র তিষ্য ভান্তেকে পাওয়া যায়। তবে কি এই অর্হৎ ভান্তে থাকাকালীন বুদ্ধের মূল ত্রিপিটককে বিকৃত করা হযেছে? অর্হৎ এর কি আদৌ কোন বিদ্বেষ, হিংসা, লাভ, যশ খ্যাতি পাওয়ার আকাঙ্খা থাকে যে কারণে ত্রিপিটককে বিকৃত করবে? তাদের কথা সত্য হলে দেখা যায় সূত্র, বিনয়, অভিধর্ম পিটকের প্রতিটি অংশেই মিথ্যা কথা ঢুকেছে। আসলেই কি তাই?

যাই হোক উপরোক্ত আলোচনার পর যদি মনে করেন আসলে ত্রিপিটক মিথ্যা, জন্মান্তর নাই সেটাই সত্য তবে আপনি আপনার বিশ্বাস নিয়ে থাকুন। যাদের মনে দ্বিধা আছে বা যারা ত্রিপিটকে আস্থা রাখেন তারা নিচের অংশটুকু পড়ুন—

বুদ্ধের সময়ে বুদ্ধ যখন জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে বুকে টেনে নিয়েছেন তখন তার বিরুদ্ধে তির্থীয়, জৈনরা নানা অপপ্রচার করেছে। ব্রাহ্মণেরা ধর্মান্তর রোধে বুদ্ধকে তাদের অবতার বলে চালিয়ে দেন। বর্তমান সময়েও দেখা যাচ্ছে দলিতরা দলে দলে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করছে আর এটাকে রোধ করতে হলে ত্রিপিটককে বিকৃত করার বিকল্প কিছুই নেই। আর তাই তারা জন্মান্তর নেই বলে প্রচার করে বেড়াচ্ছে। জন্মান্তর নাই বলে যারা বুদ্ধের একান্ত প্রতিনিধি হয়ে বৌদ্ধদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টায় রত তাদের নাম দেখুন মিলে যাবে আমার কথার সাথে একদম। এই তারাই তো ভগবান বুদ্ধ (লেখক ধর্মানন্দ কোসম্বী) নামক বই লিখে একের পর এক সুকৌশলে মিথ্যাচার করেছে বুদ্ধের নামে। এমনকি গৌতম বুদ্ধের জীবনীকে বিপস্সী বুদ্ধের জীবনী বলে পর্যন্ত বিতর্কিত করতে চেয়েছে। তারা আবার দলে বেঁধে নেমেছে একটু সজাগ হোন।

তারা ত্রিপিটককে অস্বীকার করে কিন্তু ত্রিপিটকের যেই সূত্রকে বিতর্কে কাজে লাগানো যাবে সেই কালাম সূত্রকে বার বার কাজে লাগায়। সেই সূত্রকে দিয়েই ঘোলা পানিতে মাছ ধরতে চায়। সাধারণ বৌদ্ধরাও অনেকে বিভ্রান্ত হতে পারেন তারা বলতে পারেন জন্মান্তরতো আসলেই দেখা যায় না বিশ্বাস করবো কেন? আপনার মনে এমন প্রশ্ন আসবে বলেই বুদ্ধ খুদ্দক নিকায়ের উদানের কঙ্খারেবত সূত্রে বলেছেন-

সন্দেহ যা হয় উদিত স্ব-পর মনে
এই ভবে কিংবা পরভবে
ধ্যানীগণ তেজে সেই সবে
বীর্যভরে ব্রহ্মচর্য আচরণ করে যবে।

অর্থ্যাৎ ব্রহ্মচর্য আচরণ করেই আপনার সন্দেহকে বুদ্ধ জয় করতে বলেছেন। এক কথায় বুদ্ধের ধর্মকে আচরণ করেই সন্দেহের ক্ষয় সাধন করতে বলেছেন। মনে রাখতে হবে, বুদ্ধের ধর্ম ছেলে খেলার কোনো বিষয় নয়। আর তাই তো খুদ্দক নিকায়ের উপোসথ সূত্রে বুদ্ধ বলেছেন- হে ভিক্ষুগণ, মহাসমুদ্র যেমন ক্রমনিম্ন, ক্রমগভীর, ক্রমশ অগাধ গম্ভীর, হঠাৎ প্রপাতের মতো অতি গভীর নহে, সেই প্রকার এই ধর্মেও ক্রমিক শিক্ষা, ক্রমিক কার্য, ক্রমিক আচরণ, (এই ধর্মবিনয়ের সাথে পরিচয় হতে না হতে)হঠাৎ অর্হত্ত্ব লাভ হয় না। বুদ্ধের এই গুরু গম্ভীর ধর্মকে বুঝতে হলে অনুশীলনের বিকল্প নাই।

তাই কারো কথায় বিশ্বাস না করে অনুশীলন করে সত্যটা গ্রহণ করুন। আর যারা বুদ্ধের জন্মান্তরবাদ নিয়ে অপপ্রচার করছে তাদের বিরুদ্ধে সজাগ হোন। জন্মান্তর না থাকলে তো মৃত্যুতেই সব শেষ, নির্বাণ লাভের আর দরকার কি? এতো ধর্মকর্ম করারও বা কি দরকার তাই নয় কি? অতএব আবারো বলছি সজাগ হোন, সতর্ক হোন তারা আপনার পরিবারের কোনো সদস্যের মনেও উদ্ভট প্রশ্ন বা চিন্তাধারা ঢুকিয়ে দিয়ে বিভ্রান্তিতে ফেলে তাদের স্বার্থ হাসিল করতে পারে।

লেখক- অফিসার, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ, ঢাকা।

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!