বিতর্কিত উপাধি এবং প্রসঙ্গ কথা

বর্তমান সময়ে বড়ুয়া বৌদ্ধদের মধ্যে ভিক্ষুসংঘদের নামের সাথে নানা বিশেষণ যোগ করার প্রবণতা খুব বেশী পরিমাণে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষণ বা উপাধিগুলো দিতে গিয়ে মাঝে মাঝে এমনও দেখা যায় যে কী বিশেষণ দিচ্ছেন তার অর্থ স্বয়ং উপাধি-দাতারাও বুঝতে পারেন না। অন্যদিকে একদলকে দেখা যায় যারা এই উপাধিগুলো নিয়ে নানা বিশ্লেষণ করে লেখা লিখতে, ব্যঙ্গ করতে। ফলে যাদের নামের সাথে এসব উপাধি যোগ করা হচ্ছে তারা সর্বসাধারণের কাছে হয়ে উঠছেন বিতর্কিত। যেসব বিজ্ঞ ব্যক্তিরা এসব উপাধির অর্থ বুঝেন তারা মনে মনে হাসেন। উদাহরণস্বরুপ যিনি কোনদিন স্কুলের মাটিতে পা রাখেন নাই তার নামের সাথে যদি শিক্ষাবিদ বিশেষণ লাগানো হয় তবে উপাধিটি হাস্যকরই হয়ে যায়।

আমাদের দেশের সহজ-সরল কিছু ব্যক্তি নানান সময় অতি শ্রদ্ধা দেখাতে গিয়ে এ ধরণের কাজ করে বসে। অনেক সময় তারা তাদের পুজনীয় ভিক্ষুটিকে মার্গফললাভী ভেবে বসেন নানা কারণে ফলে তারাই এসব কাজ খুব বেশী করেন। একজন ভিক্ষু ধ্যানের মাধ্যমে ঋদ্ধি লাভ করতে পারে কিন্তু তারা বুঝেনা ঋদ্ধি লাভ করা আর মার্গফল লাভ করা এক নয়। যিনি মার্গফল লাভ করেন তিনিই কেবল বিষয়টি বুঝতে পারেন। সাধারণ পৃথকজনদের সাধারণত বুঝার উপায় তেমন একটি নেই যে ঐ ভিক্ষু মার্গফল লাভ আদৌ করেছেন কি করেন নাই। নিদ্রাহীনতা, ভয়হীনতা ইত্যাদি দ্বারা অনুমান করা যায় মাত্র নিশ্চিত হওয়া যায় না। যাই হোক কেন এই ধরণের উপাধি সাধারণ দায়কেরা কিভাবে হুট করে দিয়ে দেয় নানা কারণে তার কয়েকটি উদাহরণ বাস্তব জীবন থেকে দিতে চাই। তারপর আরো আলোচনা করতে চাই-

ঘটনা – ০১) সাতকানিয়া থানাধীন শীলঘাটা জ্ঞানপাল-রত্নপ্রিয় অরণ্য ধ্যান কুটিরে পুজ্য প্রজ্ঞেন্দ্রিয় থের মহোদয়ের প্রথমদিকে অবস্থানকালীন ঘটনা- সেই গ্রামে কিছু হিন্দু পরিবার বাস করেন, তারা এক রাতে ভাবল যে অহো! ভান্তেরা যদি আমাদের বাড়িতেও পিণ্ডাচারণের জন্য আসতেন। এদিকে ভান্তেও যেহেতু প্রায় প্রতিটি বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছেন পরদিন সকালে কাকতালীয়ভাবে ঐ বাড়িতেই পিণ্ডাচারণের জন্য গেলেন। হিন্দু পরিবারের সদস্যগণ তো মহাখুশি। তারা বাড়িতে যা ছিল তা দিল। এদিকে বাড়ির আশেপাশের কয়েকজনকে বিষয়টি জানাল যে, কাল রাতে ভেবেছি আর আজ সকালে ভান্তে এসেছেন। নিশ্চয় ভান্তে সেটা ধ্যানবলে জানতে পেরেছেন। খুব দ্রুত কথাগুলো পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়লো। গ্রামের অনেকেই ভান্তেকে মার্গফললাভী ভিক্ষু হিসেবে ভাবতে শুরু করল। কয়েকদিন পর এসব বিষয় নিয়ে বিহার থেকেই স্বয়ং এক ভান্তে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। আর পুজ্য প্রজ্ঞেন্দ্রিয় ভান্তে জানালেন এটা কাকতালীয়ভাবেই ঘটেছে এখানে ধ্যানবলে জানার কিংবা মার্গফল লাভের কোনো বিষয় নাই।

ঘটনা- ০২) সাতকানিয়া থানাধীন করইয়ানগর শ্মশানভূমি ধ্যানচর্চা কেন্দ্রে পুজ্য প্রজ্ঞেন্দ্রিয় ভান্তে অবস্থানকালীন সময়ে সেখানে এক মুসলিম কাঠ মিস্ত্রি কাজ করতো। সে বিভিন্ন চেয়ার, জানালা ইত্যাদি তৈরী করছিল সেখানে। একদিন সে প্রচার করলো যে, সে যখন ভান্তের চক্রমণ ঘরে ঢুকলো তখন দেখে অনেকগুলো ভান্তে পুজ্য প্রজ্ঞেন্দ্রিয় ভান্তেকে বন্দনা করছেন, আর ভান্তে তখন ধ্যানেরত। আর সে যাওয়ার একটু পর নাকি সবাই কোথায় হারিয়ে গেল। কথাটা শুনার পর মনে কৌতুহল জাগলো। সরাসরি ভান্তের কাছে ঘটনার সত্যতা জানতে চাইলাম। ভান্তে হেসে দিলেন। হেসে দিয়ে আমাকে বললেন- উপাসক, আমি গৃহী থাকাকালীন সময়ে কাঠের হিসাবগুলো ভালোই রপ্ত করেছিলাম। আমি এখানে হিসাব করে দেখতেছি ঐ কাঠমিস্ত্রি ইতিমধ্যেই কাঠ কিনেছে বলে আপনাদের কাছ থেকে ২ ফুট কাঠের দাম বেশি নিছে। আমি কী প্রশ্ন করলাম আর ভান্তে কী উত্তর দিচ্ছে একটু অবাক হলাম। পরে ভান্তে বলতেছে এইসব ঘটনার কোনো সত্যতা নাই। আর আসলেই যদি সে এরকম কিছু দেখতো তবে আমার জন্য তৈরী করা চেয়ার থেকেও সে মিথ্যা বলে দুই ফুট কাঠের দাম বেশি নিতো না। আমাকে সে ভয় পেত। এইবার আমি না হেসে পারলাম না ভান্তের কথা শুনে।

ঘটনা-০৩) লোহাগাড়া থানাধীন লক্ষণেরখীল গ্রামে পুজ্য প্রজ্ঞেন্দ্রিয় ভান্তের ধ্যানকোর্সে আচার্য হিসেবে যাওয়ার কথা। আর তাই গ্রামের কতিপয় শ্রদ্ধাবান পোস্টার ছাপালেন। সেখানে তারা অতি শ্রদ্ধাভরে লিখেছেন আর্যপুত্র প্রজ্ঞেন্দ্রিয় থের আরো উপাধি তো আছেই। এটা দেখে ভান্তে খুবই ক্ষেপে গেলেন। এবং কড়া ভাষায় জানিয়ে দিলেন যেখানে যেখানে এই পোস্টার লাগানো হয়েছে সেগুলো ছিড়ে না ফেললে ভান্তে ধ্যান কোর্সেই যাবেন না।

প্রিয় পাঠক, উপরোক্ত তিনটি ঘটনার সত্যতা যাচাই করে দেখতে পারেন। প্রথম দুটি ঘটনার মতো কাকতালীয় কিছু কারণেই আমরা হুজুগের বসে নানান উপাধি দিই। তাছাড়া যারা শ্মশানে বা অরণ্যে থাকেন তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের উৎসুক্যটা একটু বেশি-ই। আর এ কারণে তারা বিশেষণ যোগ করতে দ্বিধা করেন না। একটু কিছু হলেই ভেবে বসেন ভান্তে মনে হয় ঋদ্ধি দ্বারা এটা করেছেন। যারা উপাধি দেয় তারা বুঝতে চায়না অতি শ্রদ্ধার কারণে ভান্তের প্রশংসা করছি এসব টাইটেল দিয়ে নাকি ভান্তেকে উল্টো নিন্দিত করছি। এখানে তারা নন্দিত করতে গিয়ে বরং নিন্দিতই করে ফেলে। কেউ যদি লিখে ফেলেন অমুক ভান্তে লাভীশ্রেষ্ঠ । এখানে ভান্তের গুণগানের পরিবর্তে বিতর্কেই জড়িয়ে দিলেন ভান্তেকে। কারণ এক বুদ্ধের শাসনামলে একজনই লাভীশ্রেষ্ঠ ভিক্ষু থাকেন। তাঁকে অসংখ্য জন্ম ধরে পারমী পূরণ করে আসতে হয়, পূর্বের প্রার্থনা থাকতে হয় এই শ্রেষ্ঠত্ব উপাধি লাভের জন্য। বেশিরভাগ সময় দেখা যায় তারা এক বুদ্ধের কাছে এই প্রার্থনা করেন এবং অনেক কল্প পরে  আরেক বুদ্ধের সময়ে এসে সেই উপাধি প্রাপ্ত হন।

প্রিয় পাঠক, আমার এই লেখাটি কোনো ভান্তেকে বিতর্কিত করার জন্য নয়। বরং সবাইকে সচেতন করানোর জন্য। কারণ এসব উপাধির কারণে বৌদ্ধরা ইদানীং বহুধা বিভক্ত হয়ে পড়ছি। কেউ বলছি অমুক ভান্তে এই লাভী, কেউ তার বিরুদ্ধে লিখছি, কেউ বা দূর থেকে হাসছি, কেউ বা বিরক্তি ভরে বিষয়গুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি। অতএব, কোনো ভিক্ষুকে উপাধি দিতে গিয়ে আমরা যেন এটা ভাবি, নন্দিত করতে গিয়ে যেন নিন্দিত করে না ফেলি এটাই কামনা।

অন্যদিকে তৃতীয় ঘটনার মতো ভান্তেদেরকেই বলতে হবে এসব লিখবেন না। যেসব ভান্তেদের নামের সাথে এসব লিখা হয় তারা যদি নিরবতা পালন করেন তবে ধরে নেয়া যায় ভান্তের মৌন সম্মতি আছে এই উপাধি বা বিশেষণের ক্ষে্ত্রে। ফলে বিতর্ক তৈরী করা আরো সহজ হয়ে যায়। ভান্তেরা নিষেধ করলে সাধারণ দায়করা এসব লিখবেন না ফলে বিতর্ক সৃষ্ঠি হওয়ারও কোনো কারণ অবশিষ্ট থাকবে না।

সকলেই প্রজ্ঞা লাভ করুক।

লেখক : সরকারী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ, ঢাকা।

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

1 Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!