বাংলাদেশ ভিক্ষুণী সংঘের মুখপ্রত্র “গৌতমী সাময়িকী” তে প্রকাশিত কালাম সূত্রের ভুল ব্যাখ্যার প্রসঙ্গে

এস.জ্ঞানমিত্র ভিক্ষুঃ তিন চার বছর যাবত অঙ্গুত্তর নিকায়ের তিক নিপাতের (৬৫ নং সূত্র) মহাবর্গের অন্তর্গত কেশপুত্রীয় সূত্র (‘কালাম সূত্র’ নামেই সমধিক পরিচিত) নিয়ে খুব তুলকালাম চলছে। ইদানিং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই সূত্রের যত্রতত্র, যেমন- তেমন ব্যবহার, ব্যাখ্যা দেখা যাচ্ছে। অনেকে বুঝে না বুঝে বিভিন্ন বিষয়ে এই সূত্রকে ব্যবহার করছে এবং তা অনেকক্ষেত্রেই অর্ধব্যাখ্যা বা অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যা। বিশেষ করে বাংলাদেশ ভিক্ষুণী সংঘের মুখপত্র “গৌতমী সাময়িকী” এবং প্রকাশনাটির পক্ষ হয়ে কিছু লোক অতি পান্ডিত্যাচার করে “এমনকি আমি বুদ্ধ বলেছি বলে বিশ্বাস করতে হবে তা নয়” বাক্যটি প্রচার করে। সত্যিকার অর্থে এ রকম বাক্য সূত্রটিতে নেই কেননা, কালাম সূত্রে প্রথম যেই দশপ্রকার বুদ্ধের উপদেশ আছে সেটাকেই অধিকাংশ লোকেরা ইদানিং বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে সূত্রের মূল বিষয়টাই অপাঙক্তেয় করে ফেলছেন। যে কথা উল্লেখ নেই সে কথা যারা প্রচার করেন তারা হয়তো সূত্রটি মনোযোগ দিয়ে পড়েনি। নয়তো তাদের নিজেদের কোন নেতিবাচক উদ্দেশ্য আছে। নচেৎ,সূত্রে যে কথা লিখা নেই তা লিখা বা প্রচার করার আর কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে?

সূত্রটিতে প্রথম দশ প্রকার উপদেশে যে বিষয়ে সন্দেহ হয় বা ইতস্ততঃভাব উৎপন্ন হয় সে বিষয়কে প্রথমেই মিথ্যা হিসেবে বর্জন এবং সত্য হিসেবে গ্রহণ না করার কথা আছে। অর্থাৎ শোনা, দেখা বা পড়া মাত্রই তা আচরণ বা পরিত্যাগ না করতে বলা হয়েছে। কিন্তু তারপরেই বুদ্ধ কালাম জনজাতিকে উপদেশ করতে গিয়ে চারটি শর্তকে মাথায় রেখে কোন বিষয়কে গ্রহণ বা বর্জনের নির্দেশনা দিয়েছেন। যারা ইদানিং কালাম সূত্র নিয়ে বেশি মাতামাতি করছেন তারা অনেকাংশেই কি উপায়ে কোন বিষয় গ্রহণ বা বর্জন হবে সেদিকে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে দৃষ্টি না দিয়ে শুধু প্রথম দশটি উপদেশকেই বারংবার উল্লেখ করেন। কিন্তু মূলতঃ কিভাবে, কোন উপায়ে, কি কি শর্তে গ্রহণ, আচরণ বা বর্জন করা যাবে সেটাই হল মুখ্য।

প্রাথমিকভাবেই গ্রহণ বা বর্জন না করার দশ উপদেশঃ
১.মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে আসছে বলে কোন মতবাদ গ্রহণ বা বর্জন করবেন না (এতে বুদ্ধিশুণ্যতা ও কুসংস্কারের ঝোঁক থাকে), পালি- মা অনুস্সবেন।
২.পরম্পরাগত বলে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস করবেন না (এতে ঐতিহ্যগত (মূলতঃ ধর্মীয়) অন্ধবিশ্বাস থাকে), পালি- মা পরম্পরায।
৩.এটি এরূপ বলে(প্রবাদ আছে) অন্ধ বিশ্বাসে বিভ্রান্ত হবেন না (যুক্তিসিদ্ধ বলে গ্রহণ করা বা না করা), পালি-মা ইতিকিরায।
৪. শাস্ত্রোক্তি বলে মেনে নিবেন না আবার বর্জনও করবেন না, শাস্ত্র বলতে শুধু ধর্মগ্রন্থ নয়, যে কোনও বইকে শাস্ত্র বলা হয়।) পালি- মা পিটকাসম্পদানে।
৫. তর্ক প্রসূত মতে বিশ্বাস করা ও না করা, কোনও বিষয় যুক্তি সিদ্ধ বলে তাতে বিশ্বাস না করা বা করা। (যুক্তি, অনেক ক্ষেত্রে অপযুক্তিও হয়), পালি- মা তক্কহেতু।
৬.অনুমান বশতঃ কোন বিষয় গ্রহণ বা বর্জন করা; পালি- মা নযহেতু।
৭.এই কারণে এরূপ হয়, এই কারণে এভাবে হয় না এরকম চিন্তা দ্বারা কোন কিছু গ্রহণ বা বর্জন না করা; পালি- মা আকার-পরিবিতক্কেন।
৮. নিজের মতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বা মিল আছে বলে সত্য বা অসত্য বলে গ্রহণ করবেন না (কোন বিষয় নিয়ে চিন্তা করার পর, ‘ওহ্ এটি এভাবেই হবে’ এরকম করে কোনও বিষয় গ্রহণ বা বর্জন না করা ); পালি- মা দিট্ঠি-নিজ্ঝানকখনতিযা।
৯.কোন বক্তার বাগ্মীতায় বিমুগ্ধ হয়ে কোন কিছু গ্রহণ বা বর্জন না করা; পালি- মা ভব্বরূপতায।
১০.গুরুজনের(তাপস/সন্ন্যাসী/ধর্মগুরু) প্রতি শ্রদ্ধাবশতঃ কোন মতবাদে বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী না হওয়া; পালি- মা সমণো নো গরূতি।

কোন মত’কে বর্জন করার
শর্ত বা উপায়ঃ

১.যখন আপনি নিজে নিজে জানবেন এই মতটি বা এই বিষয়গুলো অকুশল, অসুন্দর, অশুভ তখন সেগুলো বর্জন করতে হবে।
২.যখন আপনি নিজে নিজে জানবেন বিষয়গুলো নিন্দনীয়, তখন সেগুলো বর্জন করতে হবে।
৩.যখন আপনি নিজে নিজে জানবেন বিষয়গুলো বিজ্ঞ-প-িতগণকতৃক পরিত্যক্ত, তখন সেগুলো বর্জন করতে হবে।
৪.যখন আপনি নিজে নিজে জানবেন বিষয়গুলো গ্রহণ করলে, আচরণ করলে ক্ষতি হবে, দুঃখ উৎপন্ন হবে তখন সেগুলো বর্জন করতে হবে।

কোন মত’কে গ্রহণ ও
আচরণ করার শর্ত বা উপায়ঃ

১.যখন আপনি নিজে নিজে জানবেন বিষয়গুলো কুশল, শুভ ও সুন্দর তখন সেগুলো গ্রহণ ও আচরণ করতে হবে।
২.যখন আপনি নিজে নিজে জানবেন বিষয়গুলো অনিন্দনীয় ও দোষমুক্ত তখন সেগুলো গ্রহণ ও আচরণ করতে হবে।
৩.যখন আপনি নিজে নিজে জানবেন বিষয়গুলো বিজ্ঞ-প-িতগণ কতৃক প্রশংসিত তখন সেগুলো গ্রহণ ও আচরণ করতে হবে।
৪.যখন আপনি নিজে নিজে জানবেন বিষয়গুলো গ্রহণ করলে, আচরণ করলে মঙ্গল সাধন, কল্যাণ হবে, সুখ উৎপন্ন হবে তখন সেগুলো গ্রহণ ও আচরণ করতে হবে।

সম্মানিত পাঠক, এখন বিশ্লেষণ করে দেখুন কে বা কারা বা সঠিক, কোন সিদ্ধান্ত বা কোন পন্থা আপনার নিজের, নিজের সমাজের ক্ষতি করছে, আপনাকে বিভ্রান্ত করছে, বিদ্যমান সুন্দর ও সম্প্রীতিকে ধ্বংস করছে। এবং কোন বিষয়গুলো আপনাকে, সমাজকে, স্ব-জাতিকে সর্বোপরি বিশ্বকে কল্যাণের দিকে, শান্তির দিকে, সম্প্রীতির দিকে, সৌহার্দ্যের দিকে পরিচালিত করছে।

প্রথম দশ গ্রহণ বা বর্জনের শর্তের পাশাপাশি কোন বিষয় গ্রহণ বা বর্জনের উপায়গুলো বা শর্তগুলো যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই আপনি/আমি সঠিক ও যথাযথ পন্থাকে গ্রহণ ও আচরণ করতে পারব। এবং সুন্দরে-একতায় বিভেদ সৃজনকারী, অকল্যাণকর বিষয়কে পরিত্যাগ করে সুখ ও কল্যাণের পথে চলতে পারব। সুতরাং, কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নয়, বুদ্ধোপদিষ্ট গ্রহণ-বর্জনের উপরোক্ত উপায়গুলোকে মুখ্য রেখেই জীবন পরিচালন করা জ্ঞানীর কর্তব্য।

(প্রয়োজন হলে সূত্রটি আদ্যোপান্ত মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।)

লেখক: বি,এস এস,(অর্নাস),এম, এস,এস,রাষ্ট্রবিজ্ঞান (বাংলাদেশ); এম,এ,(বুদ্ধিষ্ট স্টাডিজ) থাইল্যান্ড)।

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!