বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি ও ড. জিনবোধি ভিক্ষুর বিরোধ : কোটি টাকার বিহার বঞ্চিত হচ্ছেন বৌদ্ধরা

উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসুঃ বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি শতাব্দী প্রাচীন এক বৌদ্ধ সংগঠনের নাম। ১৮৮৯ সালে বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতির (তৎকালীন চট্টগ্রাম বৌদ্ধ সমিতি) প্রথম সভাপতি শ্রীমৎ উ. গুনামেজু মহাথের এবং সাধারণ সম্পাদক নাজিরকৃষ্ণ চৌধুরী বিহার স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। প্রাথমিকভাবে ভক্ত এবং পূজারীদের আর্থিক সহযোগিতায় ভবনটির একতলা নির্মিত হয়। ১৯০৩ সালে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লাস্থ রংমহল পাহাড়ে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের জন্য মাটি খননকালে একটা পুরাতন বৌদ্ধ মূর্তি পাওয়া যায়। বিহারের সে সময়ের অধ্যক্ষ অগ্গমহা পন্ডিত-উ-ধম্মবংশ মহাথের এর তৎপরতার কারণে মূর্তিটি বঙ্গীয় সরকার এ বিহারে প্রদান করে। বিহারের মূল ভবনটির পাশেই অপর একটি মন্দিরে মূর্তিটি স্থাপন করা হয়।এটি “বুড়াগোঁসাই মন্দির”নামে পরিচিত। বর্তমানে বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতির চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন যথাক্রমে অজিত রঞ্জন বড়ুয়া এবং সুদীপ বড়ুয়া।


বিহারাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. জ্ঞানশ্রী মহাস্থবির। উপাধাক্ষ্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন ড. জিনবোধি ভিক্ষু মহোদয়। কিন্তু তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বৌদ্ধ সমিতি তাকে উপাধ্যক্ষের পদ থেকে অব্যাহতি প্রদান করে গত ১০/৪/২০১২ইং সালে। তিনি এই অব্যাহতির বিরুদ্ধে আদালতের আশ্রয় নেন ৮/৬/২০১২ইং তে মামলা নং ৬২/১২। সেখানে মামলার রায় তার অনুকুলে না যাওয়ায় হাইকোর্টে আপিল করেন যার নং- ৭৬/২০১৪। আপিল মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। বিষয়টি এতটুকু হলে আসলে বলার মতো কিছু ছিল না। কিন্তু আমাদের ক্ষতির বিষয়টি অন্য জায়গায়।
গত ২৮/৩/২০১৬ইং তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারের আধুনিকায়ন তথা ১০ তলা বিহার নির্মাণ কাজের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গত ১২/১০/২০১৬ইং তারিখে নির্মাণ কাজের অনুমোদন পত্র প্রদান করেন যার নং ১২৭৩/০২/২০১৪-১৫ইং।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে এতদূর এগিয়ে যাওয়ার পরও অদ্যাবধি নির্মাণ কাজ শুরু হতে পারেনি বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি এবং ড. জিনবোধি ভিক্ষুর বিরোধের জেরে। ড. জিনবোধি ভিক্ষু নির্মাণ কাজের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রীট করেন গত ৯/৮/১৬ইং তারিখে। ১১/৮/২০১৬ইং তারিখে মাননীয় বিচারপতি রেজাউল হক এবং মাননীয় বিচারপতি জে.এন. দেব এর দ্বৈত বেঞ্চ নির্মাণ কাজের উপর স্থগিতাদেশ প্রদান করেন।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ, উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়াও আরো নানাবিধ বিষয় জানতে পেরে অতীব দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে লিখতে বসা। বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতির নেতৃবৃন্দ কিংবা ড. জিনবোধি ভিক্ষু নিজেদের পক্ষে অসংখ্য যুক্তি দিতে পারবেন। স্ব স্ব মত তুলে ধরতে পারবেন। কারো পক্ষে বা বিপক্ষে লিখা আমার উদ্দেশ্য নয়। মূলত এই কথাই বলতে চাই তাদের এই কোন্দলের কারণে সরকার চাইলেও অনুদানের অর্থ দিয়ে কোটি টাকা প্রজেক্টের বিহার নির্মাণের কাজ শুরু করতে পারছে না। কারণ হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে গিয়ে সরকার কখনোই কিছু করবে না। তাদের দ্বন্ধ চলতে থাকলে যে কোন সময় এই অনুদান ফিরেও যেতে পারে। সাথে বৌদ্ধদের প্রতি এক বিরূপ ধারণাই জন্ম নিতে পারে সরকারের।
যারা সরকারি কার্যক্রমের সাথে জড়িত তারাই বলতে পারেন কোন একটি উন্নয়ন প্রজেক্ট পাশ করতে হলে কতটুকু কাঠখড় পোড়াতে হয়। এখন অনুমোদনকৃত এই প্রজেক্ট বাতিল হলে আবার কার কাছে গিয়ে কখন নতুন করে নতুন প্রজেক্ট অনুমোদন করা সম্ভব হবে তা কেবল ভবিষ্যতই বলতে পারে। কারণ ততদিন এই একই অনুদান থাকবে না, একই প্রজেক্ট থাকবে না, বিহারের নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয়ও একই থাকবে না। এক কথায় যা হারাতে বসেছি তা ফিরে পাওয়া রীতিমতো অসম্ভব কিংবা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
এমতাবস্থায় বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি এবং ড. জিনবোধি ভিক্ষুর নমনীয় ভাবের মাধ্যমে সমঝোতাই কেবল পারে কোটি টাকা ব্যয়ে নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহারের পুন: নির্মাণের কাজ শুরু করতে। অন্যথায় আমরা কোটি টাকার অনুদান হারাবো। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে কখনো বিহার নির্মান শুরু হলেও তখন সেই দানবাক্সের উপরই নির্ভর করতে হবে।
তাছাড়া আদৌ কত বছর পর বিহার নির্মাণের অনুমতি পাওয়া যাবে তাও কল্পনার বিষয়। কারণ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে সরাসরি বলতে পারি হাইকোর্টে বিভিন্ন মামলার কাজ করতে গিয়ে দেখি আমার জন্মের বহু আগের অনেক মামলা আছে যা জটের কারণে এখনো নিষ্পত্তি হয় নি। সেক্ষেত্রে এই মামলাও যে তেমনটা হবে না তা কেউ বলতে পারে না।
আর তাই বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতির নেতৃবৃন্দ তথা ড. জিনবোধি ভিক্ষুর প্রতি মিনতি রইল নিজ নিজ অবস্থান থেকে যতটুকু সম্ভব ছাড় দিয়ে পরস্পরের প্রতি ক্ষমা, মৈত্রী দিয়ে বিষয়টির মীমংসা করুন। সাথে অন্যান্য বৌদ্ধ নেতৃবৃন্দের প্রতিও আহবান রইল নিজেরা উদ্যোগ গ্রহণ করে তাদের মেলবন্ধন রচনা করার। অন্যথায় তাদের হয়তো খুব বেশী ক্ষতি হবে না। ক্ষতি হবে পুরো বৌদ্ধ জাতির। কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য বিহারটি হয়তো আর কখনোই আলোর মুখ দেখবে না।
লেখক : সরকারী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ, ঢাকা।

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

3 Comments

  1. আমার একটা মতামত আছে, যা আমি প্রত্যক্ষভাবে দেখেছি। বৌদ্ধ নেতৃবৃন্দের মধ্যে এখন ধর্মের উপর কোন শ্রদ্ধা কিংবা চেতনা কাজ করে না। একসময় রামু তে যখন হামলা হয় তখন আমরা চট্টগ্রামে অবস্থানরত ছাত্রদের এবং ছাত্রসংগঠনের উদ্যোগে মানববন্ধন এর আয়োজন করেছিলাম, হাজার হাজার উপস্থিতি হয়েছিল সেদিন। কিন্তু আমরা দেখেছি, শুধু ছবিতে দেখা যাচ্ছে না মনে হওয়ায় প্রথম সারির এক বৌদ্ধ নেতা ( নাম উল্লেখ করছি না) এক ভিক্ষুকে দিল এক বিশাল ধাক্কা। ভিক্ষুটি পড়ে ব্যাথা পেল। পরে আমরা ছাত্রদের চাপে পড়ে বিহারে এসে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হল। যদিও তিনি ক্ষমা চাইতে রাজি ছিলেন না। শুধু ছবিতে আসাটাই কিংবা নিজের বাহবা নিতেই আজকের বৌদ্ধ নেতারা ব্যাস্ত। ধর্মের ধারে কাছেও তারা নাই। ধর্মকে টিকিয়ে রাখছি আমরা সাধারন অনুসারীরা। সুতরাং এ ব্যাপারে নৈতিকতাবোধ থেকে কিছু লিখা আমরা আপনার কাছে আশা করি।।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!