ফেইসবুক ব্যবহারে ভিক্ষুদের সচেতনতা জরুরী

অনিমেষ বাসে করে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছিল। রাত দুইটা বাজে তবু ঘুম আসছে না দেখে ফেইসবুকে ঢু মারলো। সেখানে সে দেখে জনৈক ভিক্ষু এখনো অনলাইনে আছে। অনিমেষের মাথায় নানা প্রশ্ন আসলো এত রাতে ভান্তে ফেইসবুকে কী করে? নানা কিছু ভেবে অনিমেষ ভান্তেটির সম্পর্কে খারাপ একটা ধারণা পোষণ করলো মনে মনে। প্রিয় পাঠক, আপনার মনেও এরকম কিছু আসতে পারে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে সেই রাতে ওই ভান্তেটি ভুলবশত ডাটা অফ না করেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। আর তাই তাকে অনলাইনে দেখা গেছে সারা রাত ব্যাপী। আসলে যে তিনি সারা রাত মোবাইলে ফেইসবুক ব্যবহার করেছে তা নয়। এরকম ঘটনা যে গৃহীদের ক্ষেত্রেও ঘটে না তা নয়। তবে গৃহীদের ব্যাপার আর ভিক্ষুদের ব্যাপারে অনেক পার্থক্য আছে। আমাদের দেশে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা পরিবারের বউয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তাদের কোনো ত্রুটি প্রকাশ পেলেই তা ছড়িয়ে দেওয়ার লোকের অভাব থাকে না।

আবার কিছু কিছু বাস্তব ঘটনাও দেখা যায় যে কারণে ভিক্ষুদের প্রতি নেতিবাচক ধারণা উৎপন্ন হয় সাধারণের। আমার দেখা জঘণ্যতম একটা উদাহরণ দিচ্ছি- এক গৃহী তার দুই বান্ধবীকে পাশে নিয়ে একটা ছবি দিলো ফেইসবুকে আর জনৈক (….) কমেন্ট করলো আমার কোনটা এখানে? এই কথাগুলো পড়ে মনে মনে কেউ কেউ হয়তো গালি দিচ্ছেন। যদি গালি দিয়ে থাকেন তবে সেটা আপনার মনের সংকীর্ণতা। একটা বিষয় মনে রাখা জরুরী পরিমল নামে জনৈক শিক্ষক ছিল যার নাম ধরলেই ছাত্রী নিয়ে কেলেংকারীর কথা চলে আসে। তাই বলে বাংলাদেশের সব শিক্ষককে পরিমল ভাবলে তো বিদ্যালয় বলে কিছু থাকবে না। এখানেও ব্যাপারটা সেরকমই জনৈক ভিক্ষু কোথায় কী লিখবেন সেই বিষয়টি ভাবার মতো জ্ঞান না রাখলেও সকল ভিক্ষুকে একই পাল্লায় মাপতে পারবেন না কোনো মতেই। তবে হ্যাঁ গুটিকয়েকের কারণে সুযোগ সন্ধানীরা যেন সবাইকে নিয়ে ঢালাও ভাবে মন্তব্য করতে না পারে সেই বিষয়ে সচেতন করতেই এই লেখা।

আমাদের দেশের আপামর জনসাধারণের (৯০% এর অধিক বলা যায়) ধারণা একজন ভিক্ষু মানেই লোভ, দ্বেষ, মোহমুক্ত ব্যক্তি। তারা মনে করে সাধারণ পোষাক থেকে গৈরিক বসনধারী হওয়ার সাথে সাথেই যেন ঐ ভিক্ষু বিমু্ক্ত পুরুষ হয়ে গেছেন। আর তাই একজন ভিক্ষুর সামান্য ত্রুটি দেখলেই তারা বলে বেড়ায় তিনি নাকি ভিক্ষু!!! তার এই লোভ থাকবে কেনো? সে এমন করবে কেনো? ইত্যাদি, ইত্যাদি। তারা বুঝে না ভিক্ষু হওয়া মানেই লোভ, দ্বেষ, মোহের উর্ধ্বে চলে যাওয়া নয় বরং একজন ভিক্ষু মানে লোভ, দ্বেষ, মোহের ক্ষয় সাধনে রত একজন শিক্ষার্থীকে বুঝায়। আর শিক্ষার্থীর ভুল হতেই পারে। কিন্তু সাধারণ জনগণেরা সেই ভুল মেনে নিতে নারাজ। নিজে ৫টি শীল পালন করেনা কিন্তু সুযোগ পেলেই ভিক্ষুর ২২৭ শীল নিয়ে কথা তুলবে। আর এসব কারণে একজন ভিক্ষুর ফেইসবুক ব্যবহারে সচেতন হওয়া জরুরী বলে মনে করি। তারা যেন ভিক্ষু নিয়ে উল্টাপাল্টা কোনো মন্তব্য করার সুযোগ না পায় ফেইসবুকে একটা কমেন্ট এর সুত্র ধরে।

বর্তমান সময়ে আরো এক ধরণের মানুষ আছে যারা নানান কারণে ইচ্ছে করেই ভিক্ষুদের কুৎসা রটনার জন্য প্রস্তুত থাকে। ফেইসবুকেই তো নানা লেখা দেখি যেখানে তারা লিখে ভিক্ষুরা নাকি নিজেদের লাভ সৎকার বৃদ্ধির জন্য কেবল দান করার কথা বলে থাকে। আর এরকম উৎপেতে থাকা লোকেরা ভিক্ষুর কোনো ত্রুটি ফেইসবুকে পেলে তারা তো সেটাকে টেনে আরো লম্বা করবে। একারণেও ভিক্ষুদের ফেইসবুক ব্যবহারে সচেতন হওয়া জরুরী।

আপনি মনে মনে ভাবতে পারেন আমাদের (ভিক্ষুদের) নিয়ে কেনো সাধারণের এত মাথা ব্যাথা? আপনাকে নিয়ে মাথা ব্যাথা হওয়ার অনেক কারণ আছে। প্রথমত, আপনি একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। আর তাই আপনার আচরণে যেন মন্দ কিছু প্রকাশ না পায় সেটার ব্যাপারে আপনাকেই সচেতন হবে। আপনাকে নিয়ে মাথা ব্যাথার আরো কারণ আছে। একজন গৃহী ডক্টরেট ডিগ্রী ধারী আর একজন ভিক্ষু কোনোরকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ না করলেও ঐ গৃহী ভান্তেকে মাথা নত করে প্রণাম করে। আর তাই আপনার প্রতি তাদের কিছু প্রত্যাশা তো থাকবেই। শুধু তাই নয় একজন অতীব গরীব গৃহীও যদি কোনো ভান্তেকে ফাং করে তখন সে পুরো বছরে মিলে যে উন্নত খাবারের স্বাদ গ্রহণ করে নি তা আপনার জন্য আয়োজনের চেষ্টা করে। আপনাকে অত্যধিক শ্রদ্ধা করে বলেই। আর তাই আপনার কাছ থেকেও প্রকারান্তরে সে কিছু প্রত্যাশা করতেই পারে।

যাই হোক, আমার লেখায় কেউ কেউ মনে করতে পারেন যে আমি মনে হয় ভান্তেদের জ্ঞান দিতে বসেছি। আসলে তা নয়, আমি ভান্তেদের হিতাকাঙ্খী তাই তাদের নিয়ে কেউ বাজে কিছু লিখুক সেটা কোনমতেই চাই না, আর তাই কেবল সচেতনতার জন্য এই লেখা।

একজন ভিক্ষু একটু সচেতন হলেই এড়াতে পারেন বিষয়গুলো উদাহরণস্বরুপ- ১) মেয়েদের কোনো ছবি দেখলে তাতে নাইস, বিউটিফুল, খুব সুন্দর এসব লেখা থেকে বিরত থাকা।২) কোনো প্রেমের গল্প দেখলে সেখানে লাইক না দেওয়া, ৩) একটা মেয়েকে অযাচিত ভাবে কমেন্ট করে জিজ্ঞেস না করা যে আপনি বিবাহিত কি না, ইত্যাদি। এক কথায় যেসব বিষয়গুলো একজন ভিক্ষুর সাথে যায় না সেসব বিষয় এড়িয়ে চলা। আমি আগেই বলেছি একজন ব্যক্তি গৈরিক বসনধারী হলেই যে লোভ, দ্বেষ, মোহের উর্ধ্বে চলে যাবেন সাথে সাথে তা নয়। তবে তার আচরণে যেন সেসবের বহিঃপ্রকাশ না ঘটে বিশেষ করে এই ফেইসবুকে তার জন্য নিজেকেই সচেতন হতে হবে। কারণ ফেইসবুকে কিছু হলে তা সারা বিশ্বের মানুষ এক সাথে দেখতে পারে নিমিষেই।

আমার লেখার সূত্র ধরে কেউ কেউ বলে বসতে পারেন ভিক্ষুদের ফেইসবুক ব্যবহারের দরকার কী? প্রথমেই বলতে চাই- বুদ্ধের সময়ে ফেইসবুকের প্রচলন ছিল না তাই বুদ্ধ ফেইসবুক ব্যবহার করতে পারবে না এরকম বিনয় প্রজ্ঞাপ্ত করে নি।আবার ভিক্ষুদের সংগায়নেও এই ব্যাপারে বিধি নিষেধ আরোপ হয় নি তাই ব্যবহার না করার জন্য কেউ বলতে পারে না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে কী কাজে সেটা ব্যবহৃত হচ্ছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। ফেইসবুক ব্যবহার করে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু সমাজে অনেক অবদান রাখতে পারে।বর্তমান সময়ের তরুণ প্রজন্ম বই পড়তে চায় না। ভিক্ষুরা যদি ছোট ছোট প্রবন্ধ লিখে প্রচার করে তবে এই তরুণ প্রজন্ম সেগুলো পড়বে। কারণ তারা ফেইসবুক ছাড়া চলতে পারে না। শুধু তরুণ নয়, অনেক প্রবীণ এবং মধ্যবয়সীরাও এখন ফেইসবুক ব্যবহার করে। তারাও উপকৃত হতে পারে।তাই সদ্ধর্ম প্রচারের একটি উত্তম মাধ্যম এখন এই ফেইসবুক। ভালো লেখা এখানে প্রকাশিত হলে ধর্মান্তরের মতো অনেক বিষয় তুলনামূলক কমে আসতে পারে। আবার ত্রিপিটকের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সাধারণ মানুষ পড়তে পারে এই ফেইসবুকের মাধ্যমে। আর তাই ভিক্ষুদের ফেইসবুক ব্যবহারে আমি সরাসরি বিরোধী নয়। আমি এমন বৌদ্ধ ভিক্ষুকেও দেখেছি বৌদ্ধদের জন্য গণমাধ্যম তৈরী করেছেন অনলাইন পত্রিকা, অনলাইন টিভি ইত্যাদি। এসবের দ্বারা বৌদ্ধদের এক প্রান্তের সংবাদ অন্য প্রান্তে চলে যাচ্ছে সহজেই। আমেরিকায় অবস্থান করেও চট্টগ্রামের কঠিন চীবর দান সরাসরি দেখছে এই অনলাইন টিভি ব্যবহার করে। কিংবা জনকন্ঠের বাজে প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া যাচ্ছে এই মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে। গতকাল এক ভিক্ষুর পোস্ট দেখলাম, তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন ফেইসবুকে। স্ট্যাটাসটিতে একটি তথ্য দেওয়া আছে যেখানে লেখা আছে সারিপুত্র ভান্তের মাতা কিভাবে জায়গা দান দিয়ে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন তার কথা। ভান্তে যদি এই স্ট্যাটাসটি না দিতেন তবে বিষয়টি আমার জানা হত না। আর তাই ভিক্ষুর ফেইসবুক ব্যবহারে খারাপ কিছু দেখি না। তবে সেটার অপপ্রয়োগ না হলেই হলো। পরিশেষে আপনার ছোট্ট একটা কমেন্টকে কেন্দ্র করে কেউ যেন সকল ভিক্ষুদের নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ভরা মন্তব্য করার সুযোগ না পায় সে বিষয়ে সচেতন হওয়ার জন্য ভিক্ষু/শ্রামণদের আহবান জানিয়ে শেষ করছি।

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!