প্রবারনা পূর্ণিমায় ফাঁনুস উত্তোলন বর্জন সংক্রান্তে বৌদ্ধ নেতাদের কাছে আমার ব্যক্তিগত অভিমত

বিভিন্ন নিউজের মাধ্যমে জানা গেছে প্রবারনা পূর্ণিমায় ফাঁনুস উত্তোলন বর্জন করা হয়েছে। এমন কি এই ফাঁনুস উত্তোলনকে আনন্দ উৎসব হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে মিডিয়ার কাছে। এমন কান্ডজ্ঞাণহীন বক্তব্যকে আমি একনিষ্ঠ বৌদ্ধ হিসেবে তীব্র প্রতিবাদের সাথে প্রত্যাখ্যান করছি। কারণ এই ফাঁনুস উত্তোলন কোন উৎসব নয়। এটি একটি পূজার অনুষ্ঠান যা বৌদ্ধরা তথাগত গৌতম বুদ্ধের শাসনামল থেকে আজ অবধি অতীব সমারোহে পালন করে আসছে এবং যতদিন বুদ্ধের শাসন থাকবে ততদিন করবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের কিছু বৌদ্ধ নেতা ধর্মের পূজার অনুষ্ঠানকে বিতর্কিত করে আনন্দের উৎসব বলে বর্জন করার বিবৃতি দিয়েছেন সংবাদ সম্মেলন করে। শুধু তাই নই, এই উৎসবের অনুষ্ঠানকে বর্জন করে টাকাগুলো অসহায় রোহিঙ্গ্যাদের সাহায্যে পাঠিয়ে দেবেন বলেও ঘোষনা দিয়েছেন। অবশ্যই আমিও চাই মানবতার সিড়িতে দাঁড়িয়ে অসহায় রোহিঙ্গ্যাদের সহায়তা করতে। তাই বলে কি আমরা ধর্মের পূঁজা আর্চনা বর্জন করব? তাতো কখনোই হতে পারে না।
 
ফাঁনুস উত্তোলন অনুষ্ঠান বজায় রেখেও কি আমরা রোহিঙ্গ্যাদেরকে সহায়তা করতে কি পারি না? এর মধ্যেও তো বৌদ্ধদের বিভিন্ন সংগঠন রোহিঙ্গ্যাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছে। এমন কি আরও কয়েকটা সংগঠন ত্রাণ সংগহ করছে অসহায় রোহিঙ্গ্যাদের জন্য, যেখানে আমি নিজেও জড়িত আছি ত্রাণ সংগ্রহের কাজে।
 
বাংলাদেশে বিভিন্ন জায়গাতে বৌদ্ধদের বসবাস রয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন সম্প্রদায়েও আমরা বৌদ্ধরা বিভক্ত। যেমন মারমা, চাকমা, বড়ুয়া, রাখাইন, তংচংঙ্গ্যা ইত্যাদি ইত্যাদি। আপনারা যারা এই উৎসব বর্জন করেছেন বলে মিডিয়ার সামনে সংবাদ সম্মেলন করে বিবৃতি দিয়েছেন, সকল সম্প্রদায়ের নেতাদের মতামত নিয়েছেন? বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সংগঠনগুলোর সাথে মত বিনিময় করেছেন? যেমন, মারমা বৌদ্ধ, চাকমা বৌদ্ধ, রাখাইন বৌদ্ধ নেতা ও ভিক্ষুদের সংগঠনগুলোর মতামত নিয়েছেন? মাঠ পর্যায়ের যুব ভিক্ষু সমাজ, যুব গৃহী সমাজ সহ সকল সম্প্রদায়ের ভিক্ষু সংগঠন ও বৌদ্ধ সমাজের মতামত ব্যতিত এমন একতরফা সিদ্ধান্ত নেয়ার কারোর কোন অধিকার নাই। এমনি চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তকে কেউ মেনে নেবে না। আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে তীব্র প্রতিবাদের সাথে প্রত্যাখ্যান করছি।
 
কেন আমরা ফাঁনুস পূজা করি?
চারটি নিমিত্ত দর্শন করে রাজকুমার সিদ্ধার্থ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে সংসার ত্যাগ করে ছিলেন। তাঁর নবজাত পুত্র রাহুলা আর প্রিয়তমা স্ত্রী য়শোধরাকে ত্যাগ করাকালে অগণিত অগণিত দেব ব্রক্ষ্মা এই মহাভিনিষ্ক্রিমণ অর্থাৎ সংসার ত্যাগের দৃশ্য অবলোকন করার অপেক্ষায় ছিলেন। আকাশে বাতাসে বিজয়ের সুর ধ্বনিত হয়েছিল। অথচ পৃথিবীর কোন মানুষ তাঁর এই বিদায় ও সংসার ত্যাগের কথা বুঝতেই পারেননি। আষাঢ়ী পূর্ণিমায় সংসার ত্যাগ করার সময় দেবতা ব্রক্ষ্মাদের মহানুভবে তিনি বহুদূর চলে যেতে সক্ষম হন।অবশেষে ভোরবেলায় পৌঁছলেন একটি নদীর তীরে। তিনি তাঁর জন্মসঙ্গী ছন্দককে জিজ্ঞাসা করলেন, এই নদীর নাম কি? ছন্দক বললো, মহারাজ, এই নদীর নাম অনোমা। বোধিসত্ত্ব সিদ্ধার্থ অনোমা নামকে নিমিত্তরূপে গ্রহণ করে ভাবলেন, অ+নোমা। নোমা মানে মন্দ অ মানে নয়। অর্থাৎ মন্দ নয়। সুতরাং ইহা মঙ্গল, তাই মঙ্গলজনক স্থানে সংসার ত্যাগ করা বিধেয়।
 
অতপর শরীরের সব আভরণ খুলে ফেললেন এবং তাঁর ক্ষুরধার তলোয়ার দিয়ে বাম হাতে তাঁর চুল ধরে ডান হাত দিয়ে তা ছেদন করে অধিষ্ঠান করলেন, আমার এই কর্তিত চুল আমি আকাশে নিক্ষেপ করে দেবো, আমি জন্ম-জন্মান্তর দশটি পারমী, দশটি উপ-পারমী, দশটি পরমার্থ পারমী পূরণ করে যদি প্রকৃত বুদ্ধাংকুর হয়ে এই জন্মে বুদ্ধ হতে পারি, তাহলে আমার চুল আকাশে নিক্ষেপ করা হলে আকাশে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকুক, মাটিতে আর পতিত না হোক। এই অধিষ্ঠান করে তিনি কর্তিত চুল আকাশে নিক্ষেপ করে দিলেন। বোধিসত্ত্বের মনের কথা জানতেন দেবরাজ ইন্দ্র। তিনি একটা স্বর্ণের ঝুড়ি করে নিয়ে গেলেন আনন্দমনে তাবতিংস স্বর্গে। তিনি সেই চুলকে নিয়ে তাবতিংস স্বর্গে একটি জাদী তৈরি করলেন। বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির আগে যেই জাদী নির্মিত হয়, সেই জাদী হলো সিদ্ধার্থের এই চুল সন্নিবেশিত জাদী নাম তার চুলামনি জাদী। চুলামনি জাদী এখনো স্বর্গে দেব ব্রক্ষ্মাগণ কর্তৃক পূঁজিত হচ্ছে।
 
সিদ্ধার্থের সংসার ত্যাগের কথা জানতে পেরে অতীত জন্মের ব্রক্ষ্মলোকের ঘটিকার ব্রক্ষ্মা সিদ্ধার্থকে অষ্টপরিষ্কার দান করার উদ্দেশ্যে অষ্টপরিষ্কার নিয়ে এসেছিলেন অনোমা নদীর তীরে। ঘটিকার ব্রক্ষ্মা সিদ্ধার্থকে অষ্টপরিষ্কার দান করলেন এবং সিদ্ধার্থের মহামূল্যবান রাজাভরণ বিনীতভাবে চেয়ে নিলেন। এই রাজাভরণ তিনি ব্রক্ষ্মলোকে নিয়ে যান এবং রাজাভরণ স্থাপন করে একটি জাদী নির্মাণ করেন। সেই জাদীর নাম দুস্স জাদী। ইহাই গৌতম বুদ্ধের শাসনামলের সর্বপ্রথম পরিভোগ জাদী যা বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির ছয় বৎসর পূর্ব হতে ব্রক্ষ্মলোকে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ব্রক্ষ্মাগণের পূজা প্রাপ্ত হয়ে অদ্যাবধি বিরাজ করছে।
 
এবার বলি আমরা কেন প্রবারণা পূর্ণিমার দিন ঘটা করে ফানুস উড়াই? স্বর্গের দেবতারা দেবরাজ ইন্দ্র কর্তৃক স্থাপিত চুলামনি জাদীকে এখনো পূজা করেন বিধায় আমরাও প্রবারণা পূর্ণিমার দিন ফানুস উড়িয়ে পূজা করি। ফানুস উড়ানোর অর্থ ঐ চুলামনি জাদীর পূজা করা। প্রদীপ পূজা করা। আমরা বুদ্ধকে প্রদীপ পূজা করতে পারি খুব সহজেই কিন্তু স্বর্গের চুলামনি জাদীর উদ্দেশ্যে ফানুস উড়িয়ে আকাশে তুলে পূজা করি। এই হচ্ছে ফানুস উড়ানোর কাহিনী।
 
জ্যোতিসারা ভিক্ষু
সভাপতি
হিল বুডিষ্ট য়ঙ মঙ্ক এসোসিয়েশন।
সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!