প্রবারনায় ফানুস ওড়ানো থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্তটি ভুল এবং অন্যায়

এবারের প্রবারনা পূর্ণিমায় ফানুস উড়াবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন ‘সম্মিলিত বৌদ্ধ সমাজ’ পরিচয়ের কয়েকজন ব্যক্তি। খবরের কাগজে ঘোষণাটা এসেছে এইভাবে যে বার্মায় রোহিঙ্গাদের প্রতি অত্যাচারের প্রতিবাদে বাংলাদেশের বৌদ্ধরা এইবার প্রবারনার সময় ফানুস উড়ানো থেকে বিরত থাকবে আর ফানুসের টাকাটা নাকি দিয়ে দেওয়া হবে কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরে। আমি এটার বিরোধিতা করি।

এইরকম একটা সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার অনেক অসুবিধা আছে। আমাদের দেশের বেশীরভাগ মানুষই এই সিদ্ধান্তে খুশী হয়েছেন। রোহিঙ্গাদের প্রতি যে অত্যাচার হচ্ছে সে তো অন্যায়। সুতরাং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই অত্যাচারের বিরোধিতা করে আপনি যাই করেন না কেন, সকলেই খুশী হওয়ার কথা। আর শরণার্থী শিবিরে কিছু ডান করবেন, সে যত সামান্য টাকাই হোক, তাতে তো সকলেই সাধুবাদ দিবেন। এছাড়া এইরকম একটা ঘোষণার আরেকটা বাস্তব তাৎপর্য আছে। এখন যে বাংলাদেশে বসবাসকারী বৌদ্ধদের উপর মুসলমানরা ছোট মাত্রায় অত্যাচারটা চালাচ্ছে, প্রবারনায় ফানুস বর্জনের ঘোষণা ইত্যাদি দিয়ে যদি এইসব মুসলমানদের একটু সহানুভূতি পাওয়া যায়, খারাপ কি।

এইসব কারণে এইরকম একটা সিদ্ধান্তের বিরোধিতা ছোট করে কেউ করছেন না। এমনকি বৌদ্ধদের মধ্যেও কেউ এইরকম সিদ্ধান্তের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করতে সাহস পাচ্ছে না। তবুও আমি আপনাদেরকে বলছি- এটা ঠিক না। প্রবারনায় ফানুস ওড়ানো থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্তটি ভুল এবং অন্যায়।

আপনারা সকলেই হয়তো জানেন, প্রবারনা পূর্ণিমা হচ্ছে বাংলাদেশের বৌদ্ধদের (সম্ভবত পৃথিবীর বেশীরভাগ বৌদ্ধেরও) দ্বিতীয় বড় উৎসব। প্রথমতই তো হচ্ছে বৌদ্ধ পূর্ণিমা, দ্বিতীয়তই হচ্ছে এই প্রবারনা। আমার নিজের ব্যাক্তিগতভাবে কোনদিন কোন বৌদ্ধ পূর্ণিমারঅনুষ্ঠান, পূজা বা প্রার্থনা বা এইরকম কোন কিছুতেই অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়নি। যারা বৌদ্ধ ধর্মের না, আপনারা অনেকেই হয়তো বৌদ্ধ পূর্ণিমা কবে কখন কিভাবে পার হয়ে যায় টেরও পাননা। কিন্তু প্রবারনায় পূর্ণিমা আমাদের সকলকেই কোন না কোনোভাবে ছুঁয়ে যায়। জেনে বা না জেনে আপনি নিজেও হয়তো কোন না কোন একদিন প্রবারনা পূর্ণিমার উৎসবে অংশ নিয়েছেন। কিভাবে? ঐ যে ফানুস উড়িয়ে দেয়, সেই ফানুস দেখেছেন। হয়তো কোনদিন মুখে বলেছেন, বাহ।

আমি তো সেই শৈশবে চকরিয়া বাস করার সময় থেকেই ফানুস উড়ানো দেখে আসছি। ওখানে ওরা বলতো ‘ওয়াইগ্যা’। সন্ধ্যার পরপর আকাশে উড়ে যাচ্ছে একেটার পর একটা ওয়াইগ্যা আর আমরা বাসার সামনের রাস্তা থেকে বা ছাদ থেকে দেখছি- এটা তো আমার চাইল্ডহুড মেমোরির অংশ।

এই উৎসবটা আপনি বাদ দিবেন কেন? রোহিঙ্গাদের প্রতি সংহতি জানানোর জন্যে? মাফ করবেন সম্মিলিত বৌদ্ধ সমাজের নেতা সাহেবেরা। রোহিঙ্গাদের প্রতি সংহতি জানানোর জন্যে আপনি পূজা বা পার্বণ বাদ দিবেন কেন সেটার তো কোন যুক্তি পাচ্ছি না। চাইলে আপনি বরং দুইটা বাড়তি ফানুস উড়িয়ে দিতে পারেন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের কল্যাণ কামনা করে। বাদ দেবেন কেন? গুরুতর প্রশ্ন হচ্ছে ধর্মীয় অবস্থান থেকে আপনি কি রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোন এক পক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারেন? সেটা কি সমীচীন হবে? হবে না।

না, সাধারণ মানুষের প্রতি অন্যায় হচ্ছে, মানুষকে মেরে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে সেটা তো অন্যায়। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রশ্নে মায়ানমার সরকারের নীতি ইত্যাদি সে তো বার্মার রাজনৈতিক ব্যাপার। সেটার পক্ষে অবস্থান নেওয়া বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া তার কোনটাই ধর্মীয় ব্যাপার না। আপনার ‘সম্মিলিত বৌদ্ধ সমাজ’ নাম দিয়ে এঁর পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার কি আছে। ব্যক্তিগতভাবে আপনারা যারা মায়ানমার সরকারের অপকর্মের বিরোধিতা করতে চান, করেন। অন্য সংগঠন অন্য নাম অন্য ফোরাম থেকে করেন। বৌদ্ধ পরিচয়ে কেন?

কেউ বলতে পারেন যে, না, একটা গুরুতর মানবিক বিপর্যয় হচ্ছে, সেখানে বৌদ্ধরা সম্মিলিতভাবে একটা অবস্থান নিলে আমার এতো জ্বলে কেন? জ্বলে না, কিন্তু আজকের এই সিদ্ধান্তের ভবিষ্যৎ ইমপ্লিকেশন ভেবে আমি এর বিরোধিতা করছি। আজকে রোহিঙ্গাদের জন্যে আপনার এইরকম একটা সিদ্ধান্ত নিলেন, আগামীকাল যখন একইধরনের আরেকটা পরিস্থিতি হবেএই দেশে বা আশেপাশের অন্য কোন দেশে, তখনও কি আপনি এইরকমভাবে ফানুস বর্জনের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন? উদাহরণ দিই।

২০০১ সনে আমাদের এখানে হিন্দুদের উপর যে গণ অত্যাচারটা হয়েছে, সেরকম একটা পরিস্থিতি আবার হলে কি আপনারা বাংলাদেশের ‘সম্মিলিত বৌদ্ধ সমাজ’ ফানুস বর্জন করবেন? গুজরাতে ট্রেনে আগুন লাগার পর যে গন মুসলিম নিধন হয়েছে সেরকম কোন পরিস্থিতি যদি আবার হয় ভবিষ্যতে, তাইলে কি আপনারা ‘সম্বলিত বৌদ্ধ সমাজ’ প্রতিবাদে নামবেন? পাকিস্তানের বালুচিস্তানে যে প্রতিনিয়ত মিলিটারির গুলিতে মানুষ করছে, তার প্রতিবাদ করবেন আপনারা? সেটা হয়না। কারণ এইভাবে করতে থাকলে বৌদ্ধ ধর্ম আর বৌদ্ধ ‘ধর্ম’ থাকবে না- অন্যকিছু হয়ে যাবে। অতীতে রোহিঙ্গাদের চেয়ে অনেক খারাপ মানবিক বিপর্যয় হয়েছে, মানুষের প্রতি মানুষের অত্যাচার হয়েছে। সেখানে আমরা প্রতিবাদ করেছি, মিছিল করেছি, পক্ষ নিয়েছি, যার যার মতো দুর্গতের সহায়তা করেছি। কিন্তু ধর্মীয় প্রথা প্রতিষ্ঠানগুলিকে সেগুলি থেকে আলাদা রাখতে হয়।

আপনারা আমাকে বলেন, রোহিঙ্গা বিপর্যয়ের পর কি বাংলাদেশ না দুনিয়ার অন্য কোথাও মুসলমানরা গরু ছাগল কুরবানি দেওয়া বন্ধ করেছে? না। হজ্বের কোন আচার অনুষ্ঠানে ব্যাত্যয় ঘটিয়েছে? না। কেন? আপনি বলতে পারেন যে মুসলিমরা করেনি বলে কি আমি করবো না? করতে পারেন। কিন্তু কেন করবেন? একন এটাকে সমীচীন করছেন?

ঐতিহাসিকভাবে বৌদ্ধরা কি কখনো এইরকম পরিস্থিতিতে প্রবারনা পূর্ণিমা বাদ দিয়েছে? আমি জানিনা। বল্লাল সেনের সময় বৌদ্ধদের উপর খুব অত্যাচার হতো। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মাথার চামড়া কেটে টেনে খুলি থেকে তুলে ফেলত ব্রাহ্মণরা। তখন কি বৌদ্ধরা প্রবারনা উৎসব পালন বাদ দিয়েছে? আমি জানিনা, প্রশ্ন করছি। আপনি যদি জানেন তাইলে আমাকে বলেন। বরং উল্টাটা হওয়ার কথা। কোন দেশের রাজনৈতিক শক্তি বা সামরিক শক্তি যদি আপনার ধর্মীয় উৎসব পালনে বাঁধা দেয়, আপনি বরং সেটা আরও উৎসাহের সাথে পালন করবেন। প্রকাশ্যে না পারলে গোপনে করবেন। প্রয়োজনে লড়বেন। কিন্তু ফানুস বর্জন! না বদ্দা, কাজটা ঠিক হয়নি।

অনুমান করি কক্সবাজার চট্টগ্রাম ও পার্বত্য জেলাগুলিতে বর্তমানে যে বৌদ্ধবিরোধী উত্তেজনা চলছে সেটা বিবেচনায় নিয়ে ‘বৌদ্ধ সমাজ’ নাম নিয়ে কিছু চালাক বৌদ্ধ নেতা এই কাজটা করেছেন। এই ‘সম্মিলিত বৌদ্ধ সমাজ’ কারা সেটা আমি জানিনা, এরা সঅলেই ‘সম্মিলিত’ কিনা তাও জানিনা। কিন্তু যারাই এই কাজটা করেছেন, ভুল করেছেন। হয়তো ভেবেছেন প্রবারনা পূর্ণিমায় ফানুস উড়াতে গেলে ফানুশের আলোয় স্থানীয় মুসলিমরা উত্তেজিত হয়ে যেতে পারে। ওদেরকে উত্তেজিত করা ঠিক হবে না, হাজার হোক এটা মুসলমানদের দেশ। কিন্তু এটা তো ঠিক না। না, আশঙ্কার হয়তো ভিত্তি আছে, কিন্তু অন্যায়ের ভয়ে আপনি ফানুস বর্জন করবেন সেটাও অন্যায়।

সেরকম হামলা বা সন্ত্রাসের আশঙ্কা দেখলে আপনি শঙ্কা নিরোধের চেষ্টা করবেন।চোরের ভয়ে মাটিতে ভাত খাওয়া তো চুরি ঠেকানোর ভালো কায়দা না আরকি।

আমি জানি আমার বিরোধিতায় কিছু যায় আসে না- আমি এমন কোন হরিদাস পাল না যে আমার কথাতে ‘সম্মিলিত বৌদ্ধ সমাজের’ কিছু এসে যাবে। কিছুই না হোক, আমার পেটে যে কথাগুলি ফুটছে সে কথাগুলি আমি বলেই দিই। বাকি বিবেচনা আপনাদের।

আরেকটা কথা বলি, বেয়াদবি নিবেন না। খাগড়াছড়ির আলুটিলাতে দুর্ঘটনায় কয়েকজন মানুষ মারা গেল সেবার। খাগড়াছড়ি জুড়ে তখন শোকের মাতম আর আহাজারি আর রোনাজারি। পরেরদিন ছিল সেখানে ত্রিপিটক শোভাযাত্রা। এই অধম তখন বিনীতভাবে একটা ফেসবুক পোস্ট দিয়ে বলেছিল, এই আহাজারির মধ্যে এইরকম শোভাযাত্রা মানায় না, দুইদিন পরে করেন। কয়েকজন ভিক্ষুও এইরকম কথা বলেছিলেন। সেসময় আমাকে ‘পাপিষ্ঠ মূর্খ’ বলে গালি দিয়েছিলেন অনেকে। শুধু আমাকে না, এইরকম অনুরোধ যারাই করেছিল, ভিক্ষুরা সহ, সবাইকে সে কি নিন্দা! যেসব জ্ঞানী বিজ্ঞ ভান্তে সেদিন মতামত দিয়েছিলেন যে মানুষের মৃত্যুতেও ত্রিপিটক শোভাযাত্রা নামক একটি বিচিত্র অনুষ্ঠান স্থগিত করা যায়না, আপনারা কি মেহেরবানী করে একটু এগিয়ে আসবেন? বলবেন কি? প্রবারনার ফানুস ওড়ানো বন্ধ করা ঠিক হচ্ছে কিনা?

Writer: Imtiaz Mahmood, Advocate, Supreme Court of Bangladesh.

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!