পিতা উত্তম বড়ুয়া’র প্রতি সন্তান আদিত্য বড়ুয়া’র খোলা চিঠি

কক্সবাজারের ভয়াবহ রামু ট্র্যাজেডির ৫ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর যার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে কোরআন অবমাননার গুজব ছড়িয়ে রাতের আঁধারে রামুর ১২ বৌদ্ধ বিহার, উখিয়া- টেকনাফে ৭টি বিহারসহ অর্ধশতাধিক বসতঘরে হামলা ও আগুন ধরিয়ে লুটপাট চালানো হয়। আরো ৬টি বৌদ্ধ বিহার ও শতাধিক বাড়িতে সেই উত্তম বড়ুয়া ঘটনার পর থেকে গত পাঁচ বছর ধরে নিখোঁজ। উত্তম বড়ুয়া কোথায় আছে সে সম্পর্কে পরিবার এবং পুলিশের কাছে পরিষ্কার কোন তথ্য নেই।

উত্তম বড়ুয়ার একমাত্র পুত্র আদিত্য বড়ুয়া।

স্বামী ফিরে আসবে সেই অপেক্ষায় খেয়ে না খেয়ে বাবার বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছে উত্তম বড়ুয়ার স্ত্রী রিতা বড়ুয়া। পিতা ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রতিদিন পথ চেয়ে থাকে উত্তম বড়ুয়ার একমাত্র পুত্র আদিত্য বড়ুয়া। পিতাকে ফিরে আসার আকুতি জানিয়ে পিতার প্রতি একটি খোলা চিঠি লিখে পাঠিয়েছে নির্বাণ টিভির কাছে। সেই চিঠি হুবহু নিচে দেয়া হলো।

প্রিয় বাবা,

জানিনা কেমন আছো? কোথায় আছো? আদৌ কি বেঁচে আছো! তবুও যেখানেই থাকো তোমার উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি খানা লিখলাম। নীল আকাশের খোলা হাওয়ায় উড়িয়ে দিলাম, বিশাল সাগরের নোনা জলে ভাসিয়ে দিলাম। যদি কোনদিন পেয়ে থাকো পড়ে নিও। আজ ২৯ সেপ্টেম্বর প্রতি বছর এই দিনটা ফিরে আসে কিন্তু তুমি আমার জীবনে ফিরে আসনা? মায়ের কাছে শুনেছি ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর এক বিভাষীকামেয় কালো রাতে তুমি কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছ আজ অবধি ফিরে আসনি। বাবা আজ কতোদিন তোমাকে দেখিনা, তোমায় দেখতে খুব ইচ্ছে হয় কিন্তু চাইলেও কথোয় পাই। কতোদিন কতোদিন রাত তোমার আসার পানে চেয়ে প্রতিক্ষায় থাকি। হঠাৎ করে কোন একদিন এসে আমায় বুবে জড়িয়ে ধরে আদর করবে। তোমার জন্যে আমার খুব বেশি কষ্ট হয়। তোমার শূন্যতা আমাকে কাঁদায়। বাবা জান রামু খিজারী বার্মিজ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে প্রতি বছর আমি ক্লাসে ফার্ষ্ট হই কিন্তু তোমাকে রেজাল্ট দেখাতে পারিনা। শুনেছি তুমিও নাকি ঐ স্কুল থেকে পড়ালেখা করেছ। সবার বাবারা যখন রেজাল্ট শুনে খুশি হয়ে কোলে তুলে খুশিতে আত্মহারা হয়ে কি কি কিনে দেয় তখন আমি শুধু দেখে দেখেই অশ্র“ বিসর্জন দিই। আমাকে কে কোলে তুলে আদার করবে। কেই বা কিনে দেবে? আমার মা যতটুকু দেয় তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। কখনো খেয়ে স্কুলে যেতে হয় আবার কখনো না খেয়েই যেতে হয়। আবার কখনো কখনো না খেয়েই উপোস থাকতে হয়। কেনই বা থাকতে হবে? আজ তুমি থাকলে আমাদের এতো অভাব অনটন থাকত না। আমার কোন প্রিয় খাবার অথবা কিছু লাগলে যখন চাইতাম এনে দিতে। আর এখন চাইলেও কোথায় পাবো? জান বাবা মায়ের খুব অসুখ। কখনো কখনো একা নিরবে খুব কাঁদে। আমার এবং মায়ের কোন অসুখ হলে ভালো করে চিকিৎসা করতে পারিনা। কেউ ভালো মতে দেখতেও আসে না। শুনেছি তুমি থাকতে আমাদের বাড়িতে কতো আত্মীয় স্বজন তোমার বন্ধু বান্ধব আসত। আর এখন আসা তো দূরের কথা একটু ভালো করে খোজ খবর পর্যন্ত নেয় না। আমরা একটা ছোট্ট ভাড়াবাসা নিয়ে কোন মতে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি। আমার স্কুল ড্রেস ব্যাগ পুরানো হয়ে গেলে কখনো বই খাতা প্রয়োজন হলে খুব কষ্ট হয়। কখন যে আবার নতুন করে পারো সেই আশাতেই আমার দিন যায়। মাঝে মধ্যে সন্ধ্যে অথবা রাতে দরজায় দাড়িয়ে থাকি তুমি কিছু নিয়ে আসতে। আর এখন কেউ আসেনা। জানিনা বাবা তুমি কখনো আর ফিরে আসবে কিনা। তবে তোমার ফিরে আসার পথ চেয়ে থাকবো। যদি কখনো এই চিঠিটা পড়ে থাকো তাহলে এটা ০১৮৪৯৬৭১— (সম্পূর্ণ নাম্বারের জন্য নির্বাণ টিভির ফেইসবুক পেইজ এ যোগাযোগ করুন) আমাদের নাম্বার কল দিও অপেক্ষায় থাকবো। আর নিচে ঠিকানা টাও দিয়ে দিলাম। বাবা আরো অনেক অনেক কিছু লেখার থাকলেও লিখতে পারছি না হয়ত পরের বার লিখবো। আমাকে আর্শিবাদ করো ভালো করে পড়ালেখা শিখে যাতে মানুষের মতো মানুষ হতে পারি একদিন।

তোমাকে খুজে আনতে পারি। আমার আর মায়ের আদর ভালোবাসা নিও।

ইতি

তোমার প্রিয় ছেলে

আদিত্য বড়ুয়া

পিতাঃ উত্তম বড়ুয়া, মাতাঃ  রিতা বড়ুয়া

গ্রামঃ হাইটুপি, থানা  রামু

ডাকঘরঃ  রামু, জেলাঃ  কক্সবাজার।

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!