ধুতাঙ্গ সাধকের জন্য কি বৌদ্ধ বিহারের তোরণটি ভেঙ্গে ফেলবো?

প্রশ্নটি অদ্ভূত মনে হতে পারে। তবে সময়ের প্রয়োজনে এমনতরো প্রশ্ন না করে উপায় কী? ইদানীংকালে বৌদ্ধ সমাজে আলোচিত এক বিষয় ধুতাঙ্গ সাধনা। প্রথমেই বলে রাখা প্রয়োজন বৌদ্ধ গৃহীরা সংসার জীবন ত্যাগ করে প্রব্রজ্যা তথা উপসম্পদা গ্রহণ করে মূলত বিমুক্তি লাভের তরে। অর্থাৎ যে-কোনো শ্রামণ কিংবা ভিক্ষুর মূল লক্ষ হচ্ছে নির্বাণ লাভ করা। আবার কেউ কেউ দ্রুত বিমুক্তি লাভের তরে নিজেকে একনিষ্ঠ রাখতে ধুতাঙ্গ অনুশীলন করে।

‘ধুত’ শব্দের অর্থ পাপ হলেও এখানে মূলত ধৌত করাকে বুঝায়। এখানে বিবিধ পর্যায়ে বা অঙ্গে চিত্তের পাপ-মল বিদূরণের উদ্যোগ তথা অনুশীলনকে ধুতাঙ্গ বলা হয়।
ধুতাঙ্গ পালনের উদ্দেশ্য : অভিধর্মপিটকের পুদ্গল পঞ্ঞত্তি গ্রন্থে ধুতাঙ্গ পালনের ৫ প্রকার উদ্দেশ্য সমন্বিত ব্যক্তির কথা আছে। প্রথম জন লাভ সম্মান ও সেবা-সৎকারের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ধুতাঙ্গ শীল পালনে উদ্যেগী হন। শেষোক্তজন অল্পেচ্ছা, সন্তুষ্টিতা এবং সহজ স্বাচ্ছন্দ্য জীবন যাপনের অনুকূল বিধায় এই শীল প্রতিপদা পালনে আগ্রহী হন। উল্লেখ করতে হয় যে এই শেষোক্ত জনের ধুতাঙ্গ পালনকেই সর্বোৎকৃষ্ট বলা হচ্ছে।

ধুতাঙ্গ পালনের সুফল : ধুতাঙ্গের গুণ অতুল্য অনন্ত, অসীম, অপ্রতিরূপ বলে উল্লেখ করা হয়েছে খুদ্দক নিকায়ের মিলিন্দ প্রশ্ন নামক গ্রন্থে। এখানে শ্রামণ্যবীজ বৃদ্ধি প্রাপ্তির জন্য, ক্লেশমল দগ্ধ করার জন্য এক কথায় নির্বাণ সুখ লাভের জন্য এই ধুতাঙ্গের কথা বলা হয়েছে।

ধুতাঙ্গের প্রকারভেদ : তেরো প্রকার ধুতাঙ্গের কথা উল্লেখ পাওয়া যায় ত্রিপিটকে। এখানে একেকটি ধুতাঙ্গ পালনের নির্দিষ্ট কারণ ও উদ্দেশ্য রয়েছে। উদাহরণস্বরুপ, একজন সপদানচারিক ধুতাঙ্গ সাধকের অনুক্রমে প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে পিণ্ডচারণ করতে হয়। ফলে তার মনে ধনী, গরীবের বাড়ি বলে বিভেদ আসার সুযোগ থাকে না যেহেতু প্রতিটি বাড়িতেই তার যেতে হবে। একজন একাসনিক ধুতাঙ্গ পালনকারীর এক আসনে বসে দৈনিক একবারে ভোজন শেষ করতে হয়। ফলে তার বিভিন্ন আসনে বসে বার বার ভোজনের সুযোগ থাকে না। আরণ্যিক ধুতাঙ্গ পালনকারী গ্রামের নানা কোলাহল থেকে দূরে থাকতে পারেন। কেবল নিজে নিজে বিমুক্তির সাধনায় ব্যস্ত থাকতে পারেন। আবার শ্মশানিক ধুতাঙ্গ পালনকারীরা মরণানুস্মৃতির প্রভাবে দেহের অনিত্যতা সম্পর্কে সংবেগ প্রবল করেন। এভাবে ধুতাঙ্গ পালনে ইচ্ছুকরা নিজেদের প্রয়োজনে নিজেদের সুবিধামতো তেরো প্রকারের কেউ একটি কেউ বা একাধিক ধুতাঙ্গ প্রতিপালন করেন।

এবার আসা যাক, আমার লেখার শিরোনামের প্রসঙ্গে। ১৩ প্রকারের মধ্যে অবভোকাশিক নামে একপ্রকার ধুতাঙ্গের কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ধরণের ধুতাঙ্গ প্রতিপালনকারীরা মূলত বৃক্ষমূল অর্থের বৃক্ষের ছায়া এবং আচ্ছাদিত স্থান এক কথায় কোনো বাড়ি বা বিহারে ছাদযুক্ত স্থানে অবস্থান করতে পারবেন না। তবে এই ছাদযুক্ত স্থানে যাওয়ার সাথে বেশ কিছু বিষয় জড়িত।

যেমন : ব্রতকর্ম সম্পাদনের জন্য ভিক্ষু ছাদযুক্ত স্থানে গমন করতে পারবেন, আবৃত্তি করা বা করানোর জন্য, ভোজনশালায় স্থবির ভিক্ষুদের ভোজনের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে, ধর্ম শ্রবণের জন্য কিংবা উপোসথকর্ম সম্পাদনের জন্য এমনকি বিহারের বাইরে বিহারেরই বিভিন্ন সরঞ্জাম বা দ্রব্যাদি বিহারের অভ্যন্তরে রাখার জন্যও এই ধুতাঙ্গ পালনকারী ছাদের নিচে যেতে পারে সেক্ষেত্রে এই ধুতাঙ্গ ভঙ্গ হবে না। বিশুদ্ধি মার্গ গ্রন্থে একথা স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, বসবাসের জন্য বৃক্ষমূলে এবং আচ্ছাদিত স্থানে প্রবেশের মুহুর্তেই এই ধুতাঙ্গ ভঙ্গ হয়।

প্রিয় পাঠক, উপরোক্ত কথা থেকে বুঝা যায়, কেবলমাত্র বসবাসের জন্য ছাদের নিচে গেলে ধুতাঙ্গ ভঙ্গ হয়। বসবাসের উদ্দেশ্যে ছাড়া ব্রতকর্ম সম্পাদনে যদি কোনো ভিক্ষু ছাদের নিচে যায় তবে তার ধুতাঙ্গ ভঙ্গ হয় না। মূলত হরিণের মতো সজাগমনা হয়ে, আলস্য দূর করে ভাবনায় নিজেকে নিয়োজিত রাখার জন্য এই ধুতাঙ্গ পালন করা হয়।
ধরুন, কোনো অবভোকাশিক ধুতাঙ্গ পালনকারী কোনো এক বিহারের পাশ দিয়ে যাচ্ছেন। সে বিহারের সম্মুখে একটি তোরণ আছে। তোরণের উপরের অংশে যেহেতু ছাদ আছে তবে কি বিহারে ঢুকতে গেলে সেই তোরণটি ভেঙ্গে ফেলতে হবে ভান্তের জন্য? নাকি তোরণের আশে পাশের ছাদ দেওয়াল ভেঙ্গে কিংবা মই দিয়ে ছাদ দেওয়াল পার হয়ে ভিক্ষু বিহারে ঢুকবেন?

প্রিয় পাঠক, আগেই বলা হয়েছে ব্রত কর্মের জন্য ছাদের নিচে ঢুকলে ধুতাঙ্গ ভঙ্গ হবে না। বিহারের পাশ দিয়ে যেহেতু ভান্তে যাচ্ছেন সেহেতু সেই বিহারের বুদ্ধমূর্তিকে বন্দনা করা কিংবা সেই বিহারের বড় ভান্তেটিকে বন্দনা করা এসব তো ব্রতকর্মের মধ্যেই পড়ে। যেহেতু তিনি ব্রতকর্ম করবেন তাই ওই তোরণের নিচ দিয়ে প্রবেশে কোনো বাঁধা নেই। তদুপরি পূর্বেই বলেছি কেবলমাত্র বসবাসের উদ্দেশ্যে ছাদের নিচে গেলে ধুতাঙ্গ ভঙ্গ হবে, এখানে বসবাসের উদ্দেশ্যে তোরণ অতিক্রম করছেন না ভান্তে, তাই তোরণের নিচ দিয়ে যেতে কোনো সমস্যাই নাই।

একইভাবে রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় অসংখ্য গাছপালা পড়ে মাথার উপর এখন ভান্তে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় কি সব বৃক্ষ কেটে ফেলতে হবে? ছায়া না পাওয়ার জন্য? নাকি বৃক্ষ বাদ দিয়ে রাস্তা বাদ দিয়ে জমির মধ্যখান দিয়ে হাটতে হবে? আসলে এসবের কোনটা্ই নয়। যেহেতু তিনি বসবাসের উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন না তাই এখানেও ধুতাঙ্গ ভঙ্গের কোনো কারণ নাই। অনুরুপভাবে ধর্মশ্রবণ কিংবা ধর্মদেশনা প্রদানের ক্ষেত্রেও ছাদযুক্ত স্থানে গেলে ধুতাঙ্গ ভঙ্গ হবে না যা আগেই বলা হয়েছে। মনে রাখতে হবে বুদ্ধের ধর্ম কট্টর কিছু নয়, এখানে কৃচ্ছ্রতা সাধনের সুযোগ নেই। বুদ্ধের ধর্ম বৈজ্ঞানিক ধর্ম। কোনটা কী কারণে প্রতিপালন হচ্ছে তা স্পষ্ট করেই বলা আছে।

বুদ্ধ ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্রের মধ্যে শুরুতেই দুই অন্তকে পরিত্যাগ করার কথা বলেছেন যার একটি হচ্ছে কৃচ্ছ্রতা সাধন। ইদানীং অবভোকাসিক ধুতাঙ্গ নিয়ে হাস্যকর নানা কথাবার্তা চলছে বৌদ্ধ সমাজে তারই প্রেক্ষিতে এই লেখা। পরিসর বৃদ্ধির ভয়ে লেখাটি সংক্ষেপ করা হয়েছে। সকলেই প্রজ্ঞা লাভ করুক। নিজের অজ্ঞানতার জন্য আমরা যেন বুদ্ধের ধর্মটাকে সাধারণ মানুষের কাছে হাস্যকর ভাবে উপস্থাপন না করি।

  • তথ্য উৎস : ১) পরমার্থ শীল ধুতাঙ্গ অনুশীলন ও গৃহী কর্তব্য- প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো
    ২) পুদ্গল পঞ্ঞত্তি- জ্যোতিপাল মহাথের
    ৩) মিলিন্দ প্রশ্ন- প্রজ্ঞালোক মহাথের
    ৪) বিশুদ্ধি মার্গ- জ্ঞানশান্ত ভিক্ষু অনূদিত
    ৫) বিশুদ্ধি মার্গ ও বৌদ্ধ সাধনা- প্রজ্ঞাবংশ মহাথের সম্পাদিত
সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!