ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারের অনুষ্ঠানে পরিবর্তনের ছোঁয়া : বৌদ্ধদের মনের কথাই যেন প্রতিফলিত হচ্ছে

উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসুঃ অন্যান্য অনেকগুলো কারণের পাশাপাশি মূলত প্রধান দুটি কারণে সাধারণ বৌদ্ধরা ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারের দিকে তাকিয়ে থাকেন। প্রথমত, রাজধানীর বুকে অনেক বড় এলাকা জুড়ে দৃষ্টিনন্দন বিহার এটি। দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিক দিক। ঐহিহাসিক ভাবে এই মহাবিহারকে ঘিরে বাংলাদেশের বৌদ্ধদের অনেক সফল্য গাথা রচিত হয়েছে। অর্জিত হয়েছে বহু গর্ব করার কির্তী গাথা। বাংলাদেশী বৌদ্ধদের বিশ্ব দরবারে পরিচয় দানকারী মহাসংঘনায়ক শ্রীসদ্ধর্মভাণক বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো’র সূচিত কর্মের ঐতিহাসিক স্মৃতি চিহ্ন।বর্তমানে এই বিহারে অবস্থান করেন মাননীয় সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথের। এই বিহারের যে কোন ভাল উদ্যোগ, ভাল অনুষ্ঠান যেমন দ্রুত বাংলাদেশ তথা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে তেমনিভাবে মূল ধারার বাইরের কিছু হলে তাও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ইতিপূর্বে মাননীয় সংঘনায়ক মহোদয়ের ইফতার বিতরণ অন্যান্য দেশের নামি দামী পত্রিকারও মনোযোগ আকর্ষিত হয়েছে। আবার দূর্গাপূজা করার অনুমতি প্রদানের মতো কিছু উদ্যোগ সাধারণ বৌদ্ধরা ভালভাবে গ্রহণ করেনি।

যাই হোক এত বড় একটি প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে ভাল-মন্দ সবকিছুর মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হয়। মাননীয় সংঘনায়ক মহোদয় দক্ষতার সহিত সেই কাজটিই করে যাচ্ছেন। আর তার স্বীকৃতি স্বরুপ নানা পদক তথা অভিধায় ভুষিত হয়েছেন, পেয়েছেন একুশে পদক। সম্প্রতি মায়ানমার সরকার কর্তৃক অগ্গমহাসদ্ধম্মজ্যোতিকাধ্বজ উপাধিতে ভুষিত হয়েছেন যেখানে মায়ানমারের নেত্রী অং সান সুচির কাছ থেকে দান গ্রহণ করতে দেখা যায় পুজ্য ভান্তেকে।

মূল কথায় আসি, বৌদ্ধদের মধ্যে গৃহী এবং ভিক্ষু এই দুটি পার্থক্য দেখা যায় যেখানে সব ধরণের গৃহী অবনত মস্তকে একজন ভিক্ষুকে বন্দনা জানায়। এমনকি ভিক্ষু বা শ্রামণের প্রব্রজিত জীবন একদিনের হলেও গৃহীরা তাকে সম্মান করে। এটা কেবল বাংলাদেশ নয় শ্রীলংকা কিংবা মায়ানমারের প্রেসিডেন্টকেও দেখা যায় অবনত মস্তকে ভিক্ষুদের বন্দনা জানাতে। আমাদের দেশেও এই প্রথা বিদ্যমান। আর তা্ই সাধারণ বৌদ্ধরা ভিক্ষুর অবমাননা হয় সেরকম কোন কিছু মেনে নিতে চায় না।

ইতিপূর্বে ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারে দেখা গেছে বড় বড় নেতারা ভিক্ষুসংঘের পাশে বসে আছে শুধু তাই নয় প্রথম সারিতে বসে আছেন বড় বড় নেতা কিংবা নেত্রীরা তাদের পিছনের সারিতে বসে আছে ভিক্ষুসংঘরা। বৌদ্ধ ব্যতীত অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মন্ত্রী কিংবা সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা এমনটা করলে তা হয়তো সবাই মেনে নেয় কারণ তারা ভিক্ষুর মর্যাদা সম্পর্কে তেমনটা জানেন না। কিন্তু বৌদ্ধ নেতৃবৃন্দরা এমনটা করলে সাধারণ বৌদ্ধরা ক্ষুব্দ হয়। তারই বহি:প্রকাশ ইতিপূর্বে ঘটেছে ফেসবুকে এই ধরণের ছবি গুলোতে। যখনই সাধারণ বৌদ্ধরা দেখেছে কর্তাবাবুরা ভান্তেদের পিছনের সারিতে রেখে নিজেরা সামনের সারিতে বসেছে তখনই তারা ফেসবুকে নানা ধরণের মন্তব্য করেছে এসব ছবির নিচে।

কিন্তু না, এইবার যেন পুরো চিত্রই পাল্টে গেছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত অতীশ দীপংকর-বিশুদ্ধানন্দ শান্তি স্বর্ণপদক বিতরণ অনুষ্ঠানে দেখা গেছে বেশীরভাগ বড় বড় ভিক্ষুদের জন্য মঞ্চেই আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আবার যে সকল ছোট (ওয়া বা বর্ষাবাসে ছোট) ভিক্ষুগণ মঞ্চে বসার সুযোগ পান নাই তাদেরকে দেখা গেছে দর্শক সারিতে একদম সামনে। কোন গৃহী পুরুষ কিংবা মহিলাকে দেখা যায় নাই দর্শক সারিতে ভিক্ষুদের সামনে বসতে। মনে হচ্ছে যেন, সাধারণ বৌদ্ধদের মনের কথাই প্রতিফলিত হয়েছে এবারের অনুষ্ঠানসমূহে। ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারের অনুষ্ঠানে এই পরিবর্তনের ছোঁয়া পরবর্তী অনুষ্ঠানসমূহেও অব্যাহত থাকুক এই প্রত্যাশা রইল।

লেখক : সরকারী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ, ঢাকা।

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!