দীর্ঘ ১মাস পরেও লংগদুর তিনটিলা গ্রাম এখনো ধ্বংসস্তূপ: পুরো গ্রাম প্রাণহীন, নিস্তব্ধ

গত ২ জুন স্থানীয় এক যুবলীগ নেতার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে  লংগদুর তিনটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের গ্রামে দেয়া আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘর-বাড়ী ও বসত ভিটা এখনও ধ্বংসস্তূপে পরে আছে।

সরেজমিন প্রতিবেদনে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকা জানিয়েছে, ৫জুলাই তাদের দুই প্রতিবেদক এবং একজন ফটোসাংবাদিক প্রায় দেড় ঘণ্টা তিনটিলা গ্রাম ঘুরে স্থানীয় কোনো বাসিন্দার দেখা পাননি। সেই তিন গ্রামে এখনও চারিদিকে শুধু ধ্বংস স্তুপ। হাতে গোনা কয়েকটি বাড়ি ছাড়া গ্রামের বেশির ভাগ বাড়ির কোনোটি সম্পূর্ণ, কোনোটি আংশিক পোড়া। এ ছাড়া ভাঙচুর করা বেশ কিছু বাড়ির কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। পোড়াবাড়িগুলোর সামনে পড়ে আছে টিন, আসবাবসহ ব্যবহার্য সামগ্রী। পুরো গ্রাম প্রাণহীন, নিস্তব্ধ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় ঘটনার এক মাস পরও ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি গ্রামের বাসিন্দারা এখনো নিজ নিজ বাড়িতে ফেরেননি। তাঁরা লংগদু সদরসহ বিভিন্ন এলাকার অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও নিজেদের তৈরি শিবিরে বাস করছেন।

এছাড়া হামলার শিকার আদিবাসী সম্প্রদায় সরকারি কোনো ত্রাণ বা পুনর্বাসন সহায়তা নিচ্ছেন না। সাধ্যমতো সহায়তা নিয়ে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও মানবাধিকার সংগঠন। সরকারি সহায়তা নেওয়ার ক্ষেত্রে আদিবাসী সম্প্রদায়ের শর্ত, আগে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। হামলাকারীদের গ্রেপ্তার এবং দ্রুত বিচার করার দাবি জানান তাঁরা। এরপর তাঁদের ক্ষতিপূরণ ও রেশন দিতে হবে।

আদিবাসীদের অভিযোগ, গত ২ জুনের ওই হামলায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতের নেতা-কর্মীসহ বাঙালিদের (স্থানীয়ভাবে সেটেলার নামে পরিচিত) নানা সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা জড়িত। হামলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা ছিল বলেও ক্ষতিগ্রস্থদের অভিযোগ। এই অভিযোগের যৌক্তিকতা কী—জানতে চাইলে ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসীরা বলেছেন, হামলার আগে প্রশাসনকে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানানো হয়েছিল। তখন তারা বলেছিল, হামলা হবে না। তারা নিরাপত্তা দেবে।

কিন্তু পরে দেখা যায় তাদের সামনেই হামলাকারীরা ঘরে আগুন দিয়েছে। লুটপাট ও ভাঙচুর করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তখন একজনকেও আটক করেনি। আগুন নেভানোরও চেষ্টা করেনি। বরং পাহাড়িরা প্রতিরোধের চেষ্টা করলে তাঁদের হটিয়ে দিয়ে হামলাকারীদের সুযোগ করে দেওয়া হয়।

৫ জুলাই লংগদু সদরের তিনটিলা বনবিহারে আশ্রয় নেওয়া ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়িরা প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন লংগদু সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও হেডম্যান (মৌজাপ্রধান) কুলিন মিত্র চাকমা, আটারকছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মঙ্গল কান্তি চাকমা, তিনটিলা গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত মণিশংকর চাকমা প্রমুখ। ওই হামলায় তাঁদের সবার বাড়িঘরসহ মোট ২২৩টি বাড়িঘর (তিন গ্রামের) পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কুলিন মিত্র চাকমার ঘরে আশ্রয় নেওয়া বৃদ্ধা গুন মালা চাকমা সেখানেই পুড়ে মারা যান বলে জানান তিনি। পুড়িয়ে দেওয়া তিনটি গ্রাম লংগদু সদর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত।

এর আগে ১৯৮৯ সালের ৪ মে লংগদুতে আদিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর একই ধরনের হামলা হয়েছিল। তখন ৩২ জন আদিবাসী লোক নিহত হন। নয়টি গ্রামের ১ হাজার ১১টি বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ১৯৭৯ সাল থেকে পাহাড়ে বাঙালি সেটেলার বসানোর প্রক্রিয়ায় লংগদু উপজেলায় সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বাঙালিকে পুনর্বাসিত করা হয়। এই উপজেলায় প্রায় এক লাখ বাঙালি সেটেলারের বসবাস বলে আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকেরা জানান।

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!