কি কারণে আষাঢ়ী পূর্ণিমার তাৎপর্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ

ইলা মুৎসুদ্দী ঃ

আগামীকাল ৮ জুলাই ২০১৭ ইংরেজী মহান শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা — শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমার তিথিতে নির্বাণ টিভির পক্ষ থেকে সবাইকে মৈত্রীময় শুভেচ্ছা রইল।

তথাগতের মাতৃগর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ ঃ সিদ্ধার্থ গৌতম মাতৃগর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণের পূর্বে তূষিত স্বর্গে দেবপুত্ররূপে অবস্থান করছিলেন। পৃথিবীর মানুষ তখন মনুষ্যত্ব হারিয়ে বিভিন্ন যাগ যজ্ঞ নিয়ে ধর্ম কর্ম ভুলে পশুর মত জীবন যাপন করছিল। তখন দেবগণের প্রার্থনায় বহুজনের হিতের ও মঙ্গলের তথা জীবজগতের মুক্তির জন্য পবিত্র আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে তিনি কপিলাবস্তুর রাজা শুদ্ধোধনের গৃহে তাঁর অগ্রমহিষী মায়াদেবীর গর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। সেদিন রাত্রে মায়াদেবী যখন গভীর ঘুমে অচেতন তখন তিনি স্বপ্নে দেখেন যে স্বর্গ হতে ৪ জন দেবতা এসে তাঁর পালংক কাঁধে নিয়ে হিমালয়ে বহন করে নিয়ে যায়। হিমালয় শৃঙ্গে পালংক রেখে দেবীরা তাঁকে স্নান করায়, সেই মুহুর্তে শুন্ডে শ্বেতপদ্ম ধারণ করে একটি শ্বেতহস্তী ৩ বার মহামায়া দেবীকে প্রদক্ষিণ করে তাঁর দক্ষিণ পার্শ্ব ভেদ করে জঠরে প্রবেশ করে। ভীত বিহবল রাণী সেই স্বপ্ন বৃত্তান্ত রাজার কাছে ব্যক্ত করলে পরদিন রাজা দৈবজ্ঞ ব্রাক্ষ্মণদের আহবান করেন এই স্বপ্নের কারণ ও হেতু জানতে। ব্রাক্ষ্মণেরা সব শুনে ঘোষণা দেন একজন মহামানব মহারাণীর গর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ করেছেন।

গৃহভিনিষ্ক্রমণ বা গৃহত্যাগ ঃ মহামায়া দেবী দেবদহ নগরে পিত্রালয়ে যাবার পথে লুম্বিনী উদ্যানে সিদ্ধার্থের জন্ম হয়। জন্মের পর কুমারকে রাজপ্রাসাদে আনা হয়। সিদ্ধার্থের জন্মের এক সপ্তাহ পর মাতা মায়াদেবী মৃত্যুবরণ করেন। মায়াদেবীর মৃত্যুর পর বিমাতা মহাপ্রজাপতি গৌতমী সিদ্ধার্থকে নিজ সন্তানের মত করে মানুষ করেন। অত্যন্ত সুখে রাজকীয় ভোগ বিলাসে লালিত পালিত হতে থাকেন। এইভাবে ১৬ বৎসর অতিক্রান্ত হলে মামাতো বোন যশোধরার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। যথাসময়ে এক পুত্র সন্তানের জনক হন। পুত্রের নাম রাখা হয় রাহুল। কুমার সিদ্ধার্থ একদিন নগর ভ্রমণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন রাজার নিকট। রাজার অনুমতিপ্রাপ্ত হয়ে তিনি সারথী ছন্দককে নিয়ে নগর ভ্রমণে বের হয়ে প্রথম দিন লাঠিতে ভর করে চলমান এক বৃদ্ধ লোক, দ্বিতীয় দিন রোগ যন্ত্রণায় কাতর আর ও অধিকতর রুগ্ন বৃদ্ধ ব্যক্তি, তৃতীয় দিনে আত্মীয় পরিজন ক্রন্দনরত এক মৃত ব্যক্তিকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এবং চতুর্থ দিনে ধীরস্থির শান্ত, সৌম্য কাষায় বস্ত্রধারী এক সন্যাসীকে দেখতে পেয়ে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। এই চারি নিমিত্ত শুধু সিদ্ধার্থ ও সারথী ছন্দক দেখেছিল আর কেউ দেখেনি। কারণ রাজার কঠোর নির্দেশ ছিল এই ধরণের কোন দৃশ্য যেন কুমারের দৃষ্টি গোচর না হয়। দেবতারা বিভিন্ন রূপ ধারণ করে কুমারকে দেখা দিয়েছিল, তার ধর্ম সংবেগ সৃষ্ঠির জন্য। কুমারের অন্তরে বৈরাগ্য জ্ঞান সৃষ্টি হল। মনের মধ্যে দারুণ ধর্ম সংবেগ উৎপন্ন হল। এই দৃশ্য অবলোকনের পর তিনি ২৯ বৎসর বয়সে আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে কন্থক নামক তাঁর জন্মসঙ্গীর ঘোড়ায় চড়ে ছন্দক নামক আর একজন জন্মসঙ্গী সারথীকে নিয়ে অতি গোপনে রাতের অন্ধকারে কপিলাবস্তুর রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করেন। অনেক পথ অগ্রসর হয়ে তিনি এক নদীর তীরে এসে উপস্থিত হন।
নদী তীরে এসে সারথী ছন্দককে জিজ্ঞাসা করলেন, এই নদীর নাম কি? ছন্দক উত্তর দিল অনোমা। কুমার সিদ্ধার্থ অনোমাকে নিমিত্তরূপে গ্রহণ করে ভাবলেন (আ+নোমা) নোমা মানে ”মন্দ: আ মানে নয় অর্থাৎ মন্দ নয়। সুতরাং এই স্থানেই তিনি তার সমস্ত রাজাভরণ খুলে ফেললেন, ক্ষুরধার তলোয়ার বের করে বাম হাতে তাঁর চুল ধরে ডান হাতে তা ছেদন করে অধিষ্ঠান করলেন —- আমি যদি বুদ্ধ হতে পারি তাহলে আমার এই কর্তিত চুল আকাশে উঠে যাবে, মাটিতে পতিত হবে না। এই অধিষ্ঠান করে কর্তিত চুল আকাশে নিক্ষেপ করলেন। বোধিসত্ত্বের মনের কথা দেবরাজ ইন্দ্র জানতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত চিত্তে স্বর্ণের ঝুড়ি করে উক্ত চুল তাবতিংস স্বর্গে নিয়ে গিয়ে চুলামণি জাদী নির্মাণ করেন। দেবতারা সেই জাদীকে পূজা করছেন। মর্ত্যরে মানুষ সেই জাদীকে আশ্বিনী ও কার্তিক পূর্ণিমায় ফানুষ উড়িয়ে পূজা করে থাকেন। ফানুস উড়ানোর অর্থ হল ঐ চুলামণি জাদীকে প্রদীপ দ্বারা পূজা করা। সিদ্ধার্থ তার রাজাভরণ খুলে ফেললে তার অতীত জন্মের বন্ধু ব্রক্ষ্মলোকের ঘটিকার ব্রক্ষ্মা মানুষের বেশ ধারণ পূর্বক সিদ্ধার্থকে অষ্ট পরিষ্কার দান করেন। তিনি মহামূল্য রাজাভরণ সিদ্ধার্থের নিকট বিনীতভাবে চেয়ে নিয়ে ব্রক্ষ্মলোকে দুস্স নামক জাদী নির্মাণ করেন। ব্রক্ষ্মগণ আজো সেই জাদীকে পূজা করছেন।
ঋষিপতন মৃগদাবে ধর্মচক্র প্রবর্তন ঃ কপিলাবস্তুর রাজ্যের স্বর্ণ সিংহাসন উপেক্ষা করে পিতা-মাতা, স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজনবর্গ সর্বস্ব ত্যাগ করে সত্যের সন্ধানে সন্যাসব্রত গ্রহণ করতঃ ছয় বৎসর কঠোর সাধনার পর মহান বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে তিনি সর্বজ্ঞতা জ্ঞান বুদ্ধত্ব লাভ করেন। ৩৫ বৎসর বয়সে আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে বারাণসীর ঋষিপতন মৃগদাবে ধর্মচক্র সূত্র প্রবর্তন করেন। বুদ্ধত্ব লাভ করার পর তাঁর মনে এই চিন্তা উদিত হল যে, আমি সর্বপ্রথম কার নিকট এই ধর্ম উপদেশ করব? কে বা তা বুঝতে পারবে? হঠাৎ তাঁর মনে হল ঋষি আড়ার কালাম এবং রামপুত্র রুদ্রক এর কথা। এঁরা দক্ষ, মেধাবী ও সুপন্ডিত দীর্ঘকাল ধরে সাধনারত। পরক্ষণেই তাঁর জ্ঞানদর্শন উৎপন্ন হল। তাঁরা মহাজ্ঞানী ছিলেন বটে তবে এই ধর্ম সত্ত্বর বুঝতেও সক্ষম হতেন কিন্তু সপ্তাহখানেক আগে আড়ার কালাম এবং গতরাত্রে রামপুত্র রুদ্রক কালগত হয়েছেন। অতঃপর তাঁর মনে পঞ্চবর্গীয় শিষ্য কৌন্ডিন্য, ভদ্রিয়ম বপ্প, মহানাম ও অশ্বজিৎ এর কথা মনে পড়ল। তিনি চিন্তা করলেন, এরা আমার বহু উপকারী। আমি যখন সাধনায় মগ্ন ছিলাম তখন তাঁরা আমার পরিচর্যা করেছিল। তিনি দিব্যনেত্রে বিশুদ্ধ লোকাতীত দৃষ্টিতে দেখতে পেলেন এই পঞ্চবর্গীয় শিষ্যরা বারাণসীর ঋষিপতন মৃগদাবে অবস্থান করছে। অতঃপর তিনি বারাণসী যাত্রা করলে পথিমধ্যে উপক নামক এক আজীবক সন্যাসীর সাক্ষাৎ হয়। বুদ্ধের সুবিমল ও সুপরিস্কৃত ও পরিশুদ্ধ দেহকান্তি দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, বন্ধু তুমি কার উদ্দেশ্যে প্রব্রজিত হয়েছো? কে বা তোমার গুরু? কোন ধর্মেই বা তোমার রুচি? বুদ্ধ বললেন,
সকলের বিভু আমি সর্ববিধ হয়েছি এখন
কোন ধর্মে নহি লিপ্ত ছিন্ন মম সকল বন্ধন।
আচার্য্য নাহিক মোর গুরু নাহি উপাধ্যায়,
সাদৃশ্য যে কেউ নেই প্রতিদ্বন্ধি মম এ ধরায়।
উপক আজীবক অবাক দৃষ্টিতে বুদ্ধের দিকে চেয়ে রইল কিন্তু পূর্ব পারমীর অভাবে বুদ্ধের শিষ্য হবার ইচ্ছা পোষণ করলেন না। ক্রমে বুদ্ধ পঞ্চবর্গীয় শিষ্যেরা যেখানে অবস্থান করছিলেন সেখানে এসে উপনীত হলেন। দূর থেকে বুদ্ধকে দেখতে পেয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, সাধন ভ্রষ্ট শ্রমণ গৌতমকে অভিবাদন করা হবে না। পাত্র চীবরও গ্রহণ করা হবে না। আমরা তাঁর সম্মানার্থে গাত্রোত্থান ও করব না। কেবলমাত্র আসন প্রস্তুত করে রাখব। ইচ্ছা হলে তিনি উপবেশন করবেন। বুদ্ধ যখন দিব্যজ্যোতি বিচ্ছুরণ করে তাদের নিকটবর্তী হলেন তখন তারা কেউ স্ব স্ব প্রতিজ্ঞা বজায় রাখতে পারলেন না। তারা ভগবানের দিকে অগ্রসর হয়ে কেহ পাত্রচীবর গ্রহণ করলেন, কেহ আসন নির্দিষ্ট করলেন, একজন পাদোদক, পাদপীঠ ও পিঁড়ি প্রস্তত করে রাখলেন, ভগবান নির্দিষ্ট আসনে বসে পাদ প্রক্ষালন করলেন। তখন পঞ্চবর্গীয় শিষ্যগণ ভগবানকে স্ব-নামে বন্ধু সন্বোধন করে দোসররূপে আচরণ করতে থাকলে ভগবান বললেন — হে ভিক্ষুগণ! স্ব নামে বন্ধু সম্বোধন করে তথাগতের সহিত আচরণ করিও না। তিনি যে অর্হৎ সম্যক সম্বুদ্ধ, তোমরা অবহিত হও। অমৃত অধিগত হয়েছে আমি অনুশাসন প্রদান করছি। ধর্ম উপদেশ দিচ্ছি, তোমরা যেভাবে উপদিষ্ট হবে সেভাবে প্রতিপন্ন হলে অচিরে যেজন্য ব্রক্ষ্মচর্য পালন করছ তার সার্থকতা প্রতিপন্ন হবে। পঞ্চবর্গীয় শিষ্যেরা বুদ্ধের উপদেশ শ্রবণ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করলে বুদ্ধ ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র দেশনা করলেন যাতে সমগ্র ত্রিপিটক শাস্ত্রের মূল বিষয় নিহিত রয়েছে।
তিনি দেশনা করলেন — হে ভিক্ষুগণ! দুই অন্তে অনুশীলন করবে না।
১। কামের প্রতি অনুরক্তি —- যা হীন গ্রাম্য ইতরজন সেব্য অনার্যজনোচিত ও অনর্থযুক্ত।
২। আত্মনিগ্রহে অনুরক্তি যা দুঃখদায়ক ।
এই দুই অন্তের অনুশীলন না করে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করবে যা চক্ষুকরণী, জ্ঞানকরণী এবং যা উপশম সম্বোধি ও নির্বাণ অভিমুখে সংবর্তিত করে। আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গই এই মধ্যম পন্থা। ১) সম্যক দৃষ্টি, ২) সম্যক সংকল্প, ৩) সম্যক বাক্য, ৪) সম্যক কর্ম, ৫) সম্যক আজীব, ৬) সম্যক ব্যায়াম, ৭) সম্যক স্মৃতি ও ৮) সম্যক সমাধি।
হে ভিক্ষুগণ! জন্ম দুঃখ, জরা দুঃখ, ব্যাধি দুঃখ, মরণ দুঃখ, অপ্রিয় সংযোগ দুঃখ, প্রিয় বিচ্ছেদ দুঃখ, ইষ্পিত বস্তুর অলাভ জনিত দুঃখ সংক্ষেপে পঞ্চ উপাদান ষ্কন্ধ দুঃখ আর্যসত্য। ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্রের ইহাই ছিল মূল বিষয়। বুদ্ধ আরো বললেন, যেখানে চারি আর্যসত্য ও আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ নেই সেখানে কোন ধর্ম নেই, থাকতে পারে না। দেশনা শেষে আঠার কোঠি দেবতা, মনুষ্যের ধর্মচক্ষু উৎপন্ন হয়েছিল। সময়টা ছিল যখন স্বর্ণবরণ গোলাকৃতি সূর্য পশ্চিমাংশে অস্থায়মান এবং রূপালী বরণ গোলাকৃতি চন্দ্রিমা পূর্বাকাশে উদীয়মান এমন সান্ধ্যক্ষণের গোধুলি লগ্নে পবিত্র আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে এই সূত্র দেশনা করেছিলেন। ধর্মচক্র সূত্র বুদ্ধের প্রথম ধর্মদেশনা। সেই ধর্ম দেশনা শোনার জন্য বহু সংখ্যক দেবতা ও ব্রক্ষ্মা উপস্থিত হলেও মনুষ্য শ্রোতা ছিলেন মাত্র পাঁচজন। যাঁদেরকে আমরা পঞ্চবর্গীয় শিষ্য বলে থাকি। এরপর ছোট একটি সূত্র দেশনা করেছিলেন। সেটি ছিল হেমবন্ত সূত্র। সেই রাত্রেই অনাতœ লক্ষণ সূত্র দেশনা করা হয়েছিল।

যমক প্রতিহার্য ঋদ্ধি প্রদর্শন ঃ
মহাকারুণিক বুদ্ধ যখন জগতের কল্যাণের জন্য তাঁর শিষ্যবর্গদের নিয়ে দিকে দিকে বিচরণ করে মানুষের মধ্যে ধর্মসুধা বিতরণ করছিলেন, তখন বৌদ্ধ শাসনের বাইরের তির্থীকদের লাভ সৎকার কমে গিয়েছিল। তারা বুদ্ধ ও সংঘের প্রতি হিংসাপরায়ন ও তাঁদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা জন্য ৮০ হাত লম্বা একটি বাঁশের মাথায় চন্দন কাষ্ঠ নির্মিত একটি অত্যন্ত মূল্যবান ভিক্ষাপাত্র স্থাপন করে নীচে লিখে দেয়া হল —- যে ব্যক্তি বাঁশের অবস্থান ঠিক রেখে ঐ ভিক্ষাপাত্র গ্রহণ করতে পারবে, পাত্রটি গ্রহণকারীর হয়ে যাবে। ইহা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ঋদ্ধিশক্তি পরীক্ষা করা। সে সময়ে ধর্মসেনাপতি অর্হৎ সারিপুত্র স্থবির তাঁর ৭ বছরের অর্হৎ শিষ্য পিন্ডোল ভারদ্বাজকে নিয়ে সে পথ দিয়ে ভিক্ষান্নে যাচ্ছিলেন। ব্যাপারটি দেখে তিনি একটু হেসে শিষ্যকে ঐ পাত্রটি গ্রহণ করতে পারবে কিনা জিজ্ঞেস করলে শিষ্য বললেন, আপনি অনুমতি প্রদান করলে পারব। গুরুর অনুমতি নিয়ে ৭ বছরের অর্হৎ শিষ্য পিন্ডোল ভারদ্বাজ লম্বা হতে হতে ৮০ হাত লম্বা হয়ে বাঁশের অগ্রে স্থাপিত পাত্রটি অলৌকিক শক্তি দ্বারা গ্রহণ করে ফেললেন। উপস্থিত জনতা বুদ্ধের শিষ্যদের ঋদ্ধিশক্তি দেখে বিষ্ময়ে হতবাক। অপরদিকে তির্থীকরা বুদ্ধের শিষ্যদের নামে কুৎসা রটাতে লাগল যে, তাঁরা লোভী ও মোহপরায়ন। একটি মূল্যবান ভিক্ষাপাত্রের লোভ সামলাতে না পেরে তারা অলৌকিক শক্তি ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। ইহা ছিল তির্থীকদের একটি অপকৌশল। ঐ পাত্র গ্রহণ করতে না পারলেও তারা শ্রমণদের কোন ঋদ্ধিশক্তি নাই বলে নিন্দা করত। কথাটি ভগবানের কানে গেল তিনি সকল ভিক্ষুদের ডেকে ঋদ্ধিশক্তি প্রদর্শন না করার জন্য নির্দেশ দিলেন। তিনি নিজে আগামী আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে শ্রাবস্তীর গন্ডাম্র বৃক্ষমূলে ঋদ্ধি প্রদর্শন করবেন বলে ৩ মাস আগে ঘোষণা দিলেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি, অপরূপ সুন্দর সেই পাখি ডাকা, ছায়াঘেরা পাখির কলতানে মুখরিত আম বাগানটি ছিল গন্ড নামে এক উপাসিকার। নির্দিষ্ট দিনে বুদ্ধ যখন তাঁর ৫ হাজার শিষ্য-প্রশিষ্য নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন, দেখলেন যে তির্থীকরা তান্ত্রিক শক্তির প্রভাবে বাগানের সমস্ত গাছপালা উৎপাটন করে বাগানটিকে একটি হতশ্রী মরুভূমিতে পরিণত করে ফেলেছে। গন্ড উপাসিকা তার বাগানে বুদ্ধের আগমন সংবাদ শুনতে পেয়ে বাগানে এসে এ অবস্থা দেখে ক্রন্দন করতে থাকে। বুদ্ধ তখন তাকে বললেন, তুমি একটি আমের বীচি নিয়ে এস। বুদ্ধের নির্দেশে আমের বীচি আনা হলে বাগানের মাঝখানে তা পুঁতে রেখে তার উপর বুদ্ধের হাত ধোয়া জল দিলে সঙ্গে সঙ্গে সেই বীচি থেকে একটি আমগাছ গজিয়ে উঠে এবং গাছটি ৮০ হাত দীর্ঘ হয়ে চতুর্দিকে শত শত ডালপালা ও সবুজ পাতা বিস্তার লাভ করে। তখন বাগানটি আগের চাইতেও শ্রী ধারণ করে। তখন বুদ্ধ সে উদ্যান থেকে শূণ্যে উঠে বিভিন্ন রকমের ঋদ্ধি প্রদর্শন করতে থাকেন। যেমন — দাঁড়ানো অবস্থায়, বসা অবস্থায়, শোয়া অবস্থায়, চংক্রমণরত হাত তুলে আশীর্বাদ করা ভঙ্গিতে নানা রকমের ঋদ্ধি প্রদর্শন করেন যা কোনদিন কেউ দেখেনি। মানুষ অবাক বিষ্ময়ে এ দৃশ্য অবলোকন করে সাধুবাদ দিতে থাকে। তখন লক্ষ লক্ষ মানুষের ধর্মচক্ষু উৎপন্ন হয়েছিল।

মাতাকে ধর্মদান করার জন্য তাবতিংস স্বর্গে গমন ঃ
গন্ডাম্র বৃক্ষমূলে যমক প্রতিহার্য ঋদ্ধি প্রদর্শন শেষে মহাকারুণিক বুদ্ধ তাঁর মাতাকে ধর্মোপদেশ দেয়ার জন্য ঋদ্ধিবলে তাবতিংস স্বর্গে গমন করেন। সেখানে তিনি ৩ মাস অবস্থান করেন। তথাগতের ৭ম বর্ষাবাস এই তাবতিংস স্বর্গেই যাপন করেছিলেন। সেখানে তিনি অভিধর্ম দেশনাকালে তাঁর মাতাসহ ৮০ কোটি দেবতার ধর্মচক্ষু উৎপন্ন হয়েছিল। কথিত আছে যে, তিনি তাবতিংস স্বর্গে অবস্থানকালীন প্রতিদিন ছোয়াইং গ্রহণের জন্য পৃথিবীতে আসতেন। আহার শেষে গৃধ্নকুট পর্বতে দিবা বিহার করতেন এবং সারিপুত্র স্থবিরকে তাঁর দেশিত অভিধর্মের বিষয়সমূহ পুনঃ ব্যাখ্যা করতেন। সারিপুত্র স্থবির তাঁর ৫০০ শিষ্যদের নিয়ে অভিধর্মের জটিল বিষয়গুলি পুনরালোচনা করতেন। এই ৫০০ শিষ্যই বুদ্ধের প্রথম অভিধর্মধারী ভিক্ষু।

ভিক্ষুসংঘের বর্ষাবাস শুরু ঃ বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে ভিক্ষুসংঘের পিন্ডাচরণে খুবই অসুবিধা হত। বুদ্ধ বছরের ৩ মাস যখন বর্ষাকাল থাকে অর্থাৎ আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত কোথাও বিচরণ না করে একস্থানে শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার অনুশীলন করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। দিনের বেলায় কোন প্রয়োজনে বাইরে গেলেও রাত্রে সেই আবাসেই অবস্থান করতে হবে। তখন উপাসক-উপাসিকারাও দান, শীল ও ভাবনার অনুশীলন করে উপোসথ দিবসে ইহ ও পারলৌকিক সুখ শান্তি কামনা করে থাকেন।

আষাঢ়ী পূর্ণিমা আমাদের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। কারণ এই পূর্ণিমা তিথিতে শুরু হয় বর্ষাবাস। বর্ষাবাসের সময় আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে প্রবারণা পূর্ণিমা পর্যন্ত এই তিন মাস আমরা বৌদ্ধরা অতীব পবিত্রময় জীবন যাপন করে থাকি। বর্ষাবাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা সকলেই যার যার সাধ্যমতো অষ্টশীল পালন, ধ্যান কোর্সে অংশগ্রহণসহ বিবিধ দানময়, শীলময় এবং ভাবনাময় পুণ্যকর্ম করে থাকি। আমরা চেষ্টা করি এই তিনটা মাস কিছুটা হলেও পুণ্য সঞ্চয় করতে। এই পবিত্র পূর্ণিমা তিথিতে রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করেছিলেন বুদ্ধত্ব লাভের উদ্দেশ্যে। তাঁর সেই চেষ্টা সফল হয়েছিল — জগতের সকল প্রাণীকে দুঃখ থেকে মুক্তি দিতে তিনি দশ পারমী, দশ উপ-পারমী, দশ পরমার্থ পারমী পরিপূর্ণ করে ৬ বছর কঠোর তপস্যা পূর্বক বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন। তিনমাস বর্ষাব্রত ভিক্ষু একং গৃহীদের জন্য অমূল্য সময়। কারণ বছরের অন্যান্য সময়ে আমরা যথাযথভাবে ধর্ম পালনে অনীহা প্রকাশ করি। শুধুমাত্র বর্ষাবাস এলেই একটু সতর্ক হই, ধর্ম পালনে মনোযোগী হই। অনেকে আছেন, বর্ষাবাসের সময় প্রাণীহত্যা করেন না। সেটাও একটা ভালো দিক। আবার অনেকেই আছেন যারা বছরের অন্য সময়ে কোনদিন অষ্টশীল নেয়ার সুযোগ হয়না, তারা এই তিনমাসে ১২টি অষ্টশীল রাখেন, নিয়মিত ধর্মদেশনা শোনার জন্য বিহারে যান। আমাদের জন্য আরেকটি বড় সুযোগ আসে সেটা হলো ধ্যান কোর্সে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে উন্নত করা। যারা কোনদিন ধ্যানকোর্সে অংশগ্রহণ করেননি তারাও চেষ্টা করুন জীবনে অন্তত একবার ধ্যান কোর্সে অংশগ্রহণ করার। আমরা যদি প্রতিনিয়ত এভাবেই কুশলকর্মে নিজেদের নিয়োজিত রাখি তাহলে আমাদের আর কোন দুঃখ থাকবে না। তারপরও আমরা খুবই দুর্ভাগা। এত সুন্দর একটি ধর্ম পেয়েও আমরা পালন করার চেষ্টা করি না। সবসময় পর সমালোচনায় মশগুল হয়ে থাকি। নিজেকেই বড় মনে করি। বিভিন্ন ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হই। এখন সময় এসেছে সেইসব পরিহার পূর্বক নিজেদের মন-মানসিকতায় উন্নত করে সুন্দরভাবে জীবন যাপন করা। সকলকে মৈত্রী এবং পুণ্যরাশি দান করছি। সকলেই পারিবারিক, সামাজিক সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে পুণ্য কাজ করার সুযোগ লাভ করুন।
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!