এ কষ্ট কীভাবে সইবেন স্বপন-সুমী দম্পতি?

রাত তিনটা। বাইরে প্রবল বৃষ্টি। বাড়ির নালায় পানি সরানোর জন্য স্বপন বড়ুয়া ও তাঁর স্ত্রী সুমী বড়ুয়া বের হয়েছিলেন। ঘরে তিন সন্তান তখন গভীর ঘুমে। মুহূর্তের মধ্যে পাহাড়ের মাটি বাড়ির ওপর এসে পড়ে। এরপর স্বপন কিছুই জানেন না। জ্ঞান ফিরে দেখেন তিনি হাসপাতালে। জানতে পারেন, সন্তানদের কেউ বেঁচে নেই।

গত সোমবার রাতে বান্দরবান শহরতলির লেমুঝিরি পাড়ায় পাহাড় ধসে স্বপন-সুমী দম্পতির তিন সন্তান মিতু বড়ুয়া (৮), শুভ বড়ুয়া (৫) ও লতা বড়ুয়া (২) ঘুমন্ত অবস্থায় মারা যায়। ঘরবাড়ি, সন্তানসহ সর্বস্ব হারা দুজনই এখন বান্দরবান সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

তিন শিশুসন্তানকে হারিয়ে মা সুমী বড়ুয়া বাকরুদ্ধ। হাসপাতালের শয্যায় ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি। অস্ফুট স্বরে কিছু বলতে চাইলেও তা বোঝা যায় না। সুমীর ছোট ভাই বাপ্পি বড়ুয়া বলেন, বোনের সারা শরীরে ব্যথা, নড়াচড়াও করতে পারছেন না। কথা বলতেও সমস্যা হচ্ছে।

বান্দরবান সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক সমীরণ নন্দী বলেন, ‘সুমীর শারীরিক আঘাতের চেয়ে মানসিক আঘাত বেশি। শারীরিক আঘাত হয়তো তাড়াতাড়ি সেরে উঠবে, কিন্তু চোখের সামনে তিন সন্তানের মৃত্যু দেখা একজন মা হিসেবে তাঁর মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে।’

হাসপাতালের শয্যাতেই স্বপন বড়ুয়া সেদিনের বিভীষিকার কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন। স্বপন চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ‘বাড়ি, সন্তান—সবকিছু হারিয়েছি। হাসপাতাল থেকে কোথায় যাব জানি না।’

লেমুঝিরি আগাপাড়া এলাকার আজিজুর রহমানের অবস্থাও একই। তিনি বলেন, গলা পর্যন্ত মাটি চাপা পড়ে জীবন্ত কবর থেকে উঠে এসে কোনো রকমে প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন। স্ত্রী কামরুন্নেসা বেগম ও মেয়ে সুখিয়া বেগমের লাশ তিন দিন পর উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি এখন সর্বহারা।

বান্দরবানের কালাঘাটা, শহরতলির লেমুঝিরিপাড়া, লেমুঝিরি আগাপাড়া এলাকাসহ কয়েকটি জায়গায় ব্যাপক হারে পাহাড় ধসে পড়ার দৃশ্য দেখা যায়। ছোট ছোট পাহাড়ি ছড়ার দুই পাশ ও সড়কের পাশের পাহাড়গুলো যেন গলে গলে নেমে গেছে।

বান্দরবানের মৃত্তিকা সংরক্ষণ ও পানি বিভাজিকা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম বলেন, পাহাড় ধস একদিনের কোনো কারণে হয় না। পরিবেশের ওপর দীর্ঘদিনের বহুমাত্রিক আঘাতের প্রতিঘাত হিসেবে হয়ে থাকে। এবার এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অসময়ের অতি বৃষ্টি। গত সোমবার ২৪ ঘণ্টায় ৩০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল, যা গত ১০ বছরের চেয়ে বেশি। পাহাড়ের মাটিতে এত বৃষ্টির পানি ধারণের ক্ষমতা ছিল না। ফলে যেখানে ধসে পড়ার আশঙ্কা ছিল না সেখানেও ধসেছে। এ জন্য মানুষও মারা গেছে বেশি।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এবার পাহাড় ধসে বান্দরবানে ছয়জন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছে। নিহত প্রত্যেকের জন্য ২০ হাজার ও আহত ব্যক্তিদের পাঁচ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) আলী আকবর বলেন, জেলায় ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত পাহাড়ধসে ৫৭ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। অপরিকল্পিত আবাসনের কারণে জেলার ২০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে পাহাড় ধসের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

সুত্রঃ প্রথম আলো।

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!