পাঁচজন আদিবাসী কৃতী শিক্ষার্থীর সাফল্য ও স্বপ্নের কথা:

এগিয়ে চলেছেন আদিবাসী তরুণ প্রজন্ম

৩৩তম বিসিএস পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়ে যাঁরা বিভিন্ন ক্যাডারে চাকরির জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে থেকে পাঁচজন আদিবাসী কৃতী শিক্ষার্থীর সাফল্য ও স্বপ্নের কথা শোনা যাক।

১। লসমী চাকমা (৩৩তম বিসিএস ইকনোমিক ক্যাডার)

‘স্নাতক করার পর পরই নিজের পেশাজীবন নিয়ে ভাবতে শুরু করি। মনে হলো, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার এবং আমার লক্ষ্য হবে সর্বোচ্চ পর্যায়। তাই, বিসিএস ক্যাডার তথা প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে শুরু করি পেশা জীবনের পড়াশোনা।’ কথাগুলো বলছিলেন ৩৩তম বিসিএসে ইকোনমিক ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত লসমী চাকমা। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা খাগড়াছড়ি শহরের মাজান (মহাজন) পাড়ায়। সেখানে পড়ালেখা করেছেন খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চবিদ্যালয় ও খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজে। এরপর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ থেকে।

ছোটবেলা থেকেই পড়ুয়া লসমী, পাঠ্যবইয়ের বাইরেও প্রচুর বই ও দৈনিক সংবাদপত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে এটি ভীষণ কাজে দিয়েছে বলেই তাঁর বিশ্বাস। তাঁর পছন্দের তালিকায় আছে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ও রাজনৈতিক-সামাজিক উপন্যাস। বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনসংগ্রাম, আত্মপ্রত্যয় ও কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত সফলতা তাঁকে অনুপ্রেরণা দেয়।

তিনি জানান, লক্ষ্য এখানেই স্থির নয়। দৃঢ়তা, কর্মদক্ষতা, সৃজনশীলতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে শীর্ষ পর্যায়ে যেতে চান তিনি। আর একজন ইকোনমিক ক্যাডার হিসেবে, জন্মভূমি বাংলাদেশকে দেখতে চান উন্নত দেশের তালিকায়।

২। কীর্তিমান চাকমা (৩৩তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডার)

শিক্ষাজীবনের প্রতি পদেই নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে থাকেন কীর্তিমান। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় গোটা রাঙামাটি জেলায় প্রথম স্থান অধিকার, অষ্টম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ, এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগ থেকে বিফার্ম ডিগ্রি, অতঃপর বিসিএস ক্যাডার। ৩৩তম বিসিএসে তিনি পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশ পেয়েছেন।

কিন্তু কীর্তিমানের জীবনটা ছিল নানা প্রতিকূলতায় ভরা। কীর্তিমান বলেন, ‘যে বয়সে শিশুরা বেড়ে ওঠে হেসেখেলে, সেই সময়টি আমার কেটেছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের শরণার্থী শিবিরে, অনেকটা অনাদর-অবহেলায়।’

কীর্তিমানের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, পাহাড়ের বিবাদমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাঁর পরিবার ত্রিপুরায় চলে যেতে বাধ্য হয়। পরে ১৯৯৩ সালে কীর্তিমানকে দেশে রেখে যাওয়া হয়, ভর্তি করা হয় রাঙামাটির মোনঘর শিশুসদনে। আর তাঁর মা-বাবা দেশে ফেরেন ১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর।

কীর্তিমান বলেন, ‘আমার জন্য সবাই আশীর্বাদ করবেন, যাতে আমি সততার সঙ্গে এই পেশায় নিজের মেধা, সৃজনশীলতা ও সাহসিকতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের মঙ্গলে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারি। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে গরিব ও সুবিধাবঞ্চিত মেধাবী শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণে আমি কাজ করতে চাই।’

।  জেপি দেওয়ান ত্রিপুরা (৩৩তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার)

নিজের স্কুলের ইতিহাসে প্রাথমিকে প্রথম বৃত্তিপ্রাপ্তি, অতঃপর ২০০৩ সালে খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৫ সালে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সমপন্ন করা। এরপর বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১১ সালে প্রথম শ্রেণীতে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করা। এই হলো জেপি দেওয়ান ত্রিপুরার শিক্ষাজীবনের সারসংক্ষেপ। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। বাবা কৃষক, মা গৃহিণী।

সম্মান অর্জনের পর জেপি ঝুঁকলেন মায়ের একটি স্বপ্ন পূরণের দিকে। মা চেয়েছিলেন তাঁর অন্তত একটি ছেলে বিসিএস প্রশাসনে অন্তর্ভুক্ত হোক। সেই অনুযায়ী চেষ্টা এবং সাফল্য লাভ। মায়ের স্বপ্ন তো পূরণ হলো। এবার নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে চান জেপি। কী সেই স্বপ্ন? জেপি বলেন, ‘ভবিষ্যতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়ে নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে চাই। আমার সর্বপ্রথম উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থাকবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা। ভবিষ্যতে আমি সচিব হতে চাই।’

থোয়াইঅংপ্রু মারমা (৩৩তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডার)

খাগড়াছড়ির ছেলে থোয়াইঅংপ্রু মারমা ৩৩তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশ পেয়েছেন।কিন্তু তাঁর সাফল্যের পথটা মসৃণ ছিল না। তিনি যে ইউনিয়নে থাকতেন, সেই ইউনিয়নে কোনো ভালো স্কুল না থাকায় নানার বাড়িতে থেকে পড়ালেখার সূচনা হয়। ফেনী নদীর কূল থেকে প্রতিদিন পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতে হতো। রামগড় সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর ভর্তি হন রামগড় সরকারি ডিগ্রি কলেজে। সেখানে ছিল শিক্ষকস্বল্পতা, ছিল যাতায়াতের সমস্যা। দিন বদলাতে শুরু করে তখন, যখন তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত রসায়ন ও প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ হয়। সম্মান শেষ করার পর তিনি নেমে পড়েন বিসিএস পরীক্ষার জন্য। অনেক চেষ্টার পর আসে সাফল্য। সেই সাফল্যের মূল্যায়ন করতে গিয়ে থোয়াইঅংপ্রু বলেন, ‘সারাটা জীবন মা-বাবা আমাকে সৎভাবে চলার যে শিক্ষা দিয়েছেন, সে শিক্ষাকে মাথায় রেখে আমি মানুষের সেবা করতে চাই।’

৫। পূর্বিতা চাকমা (৩৩তম বিসিএস পরীক্ষায় প্রশাসন ক্যাডার)

রাঙামাটি জেলার মেয়ে পূর্বিতা, বিসিএস সম্পর্কে ধারণা হওয়ার পর থেকেই যাঁর স্বপ্ন ছিল একজন প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার। সেই স্বপ্নকে লালন করে অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ৩২তম বিসিএসে নিয়োগ পেয়েছিলেন শিক্ষক হিসেবে। আর ৩৩তম বিসিএসে সুপারিশকৃত হলেন প্রশাসনে নিয়োগের জন্য।

পূর্বিতার শিক্ষাজীবনের শুরু রাঙামাটিতেই। স্থানীয় স্কুল থেকে এসএসসি, ঢাকার শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজে এইচএসসি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ক্যাম্পাসে পদচারণ এবং ধীরে ধীরে মানসিক ও আত্মিক উন্নতি। শামসুন্নাহার হলে থাকাকালীন রুমমেট বন্ধুদের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন, পাশে থেকেছেন মা-বাবা, শিক্ষক ও কাছের বন্ধুজন। সবার প্রচেষ্টার মিলিত রূপ আজকের এই সাফল্য—এই বলে পূর্বিতা যোগ করেন, ‘আমার আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনে তাঁদের সবার অবদানই অসামান্য। প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগলাভ করেই একজন সৎ, যোগ্য ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা হিসেবে দেশের সেবা করার স্বপ্নটি আমার পূরণ হবে।’

নিজের শিকড়কেও ভুলে যাননি পূর্বিতা। জানান, ‘আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে আমার আদিবাসী সমাজ ও পাহাড়ের মানুষের মুখ উজ্জ্বল করার।’

সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!