এক ঐক্যমত্য উজ্জ্বল বৌদ্ধিক সমাজ গড়ে উঠুক

জ্যোতিসারা ভিক্ষুঃ শুভ প্রবারণা পূর্ণিমায় মৈত্রীময় শুভেচ্ছা জানিয়ে সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, এক ঐক্যমত্য উজ্জ্বল বৌদ্ধিক সমাজ গড়ে তোলার জন্যে।
আমার আজকের লেখনীর বিষয়ঃ
১। কর্মবাদ বৌদ্ধিক সমাজ ও আহ্বান।
২। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত বর্ষাবাস সংক্রান্ত।
৩। ফানুস উত্তোনের মাধ্যমে প্রবারণা পূর্ণিমায় বৌদ্ধদের কিসের সংস্কৃতি?
৪। জল প্রদ্বীপ পূজা কিসের উদ্দেশ্যে ও তার তাৎপর্য কি?
১। কর্মবাদ বৌদ্ধিক সমাজ ও আহ্বান।
এই ৩১টি লোকভূমিতে সকল জীবের প্রতি আমার ভিক্ষুত্ব জীবন ও জন্ম জন্মান্তর অর্জনকৃত সকল পূণ্যরাশি দান করছি। জীবের কৃতকর্মই বিশ্বনিয়ন্তা। কর্মের শক্তি বিশ্বব্যাপী। কর্মের শক্তি বিচিত্র ও বহুমুখী। জীবের জীবনই কর্ম। মানুষ নিজ নিজ কর্মের প্রতিমূর্তির স্বরূপ। এই কর্ম ও কর্মফল রূপে জীবন প্রবাহ চলছে অনাদিকাল হতে অনন্তের দিকে।
প্রাণীগণ এ গতিশীল কর্মফল প্রভাবে উন্নত ও অবনত হয় এবং সুখ-দুঃখ ভোগ করে। জীব জগতের দৈহিক, মানসিক, আয়ু ভোগ, রোগ-ব্যাধী, জন্ম-মৃত্যু বৈষম্যের প্রধান কারণ এই কর্ম। কর্ম অসাধারণ ও বিচিত্র শক্তি। কর্মই প্রাণীগণের একান্ত আপন বা স্বকীয়। এরা কর্মের উত্তরাধিকারী। কর্ম সর্বজীবের পুনঃজন্মের হেতু, কর্মই বন্ধু, কর্মই প্রকৃত আশ্রয়, শুভ বা অশুভ কর্মের মধ্যে, যে যেরূপ কর্ম সম্পাদন করে, সে সেরূপ কর্মের উত্তরাধিকারী হয়। কর্ম প্রাণীগণকে হীন-শ্রেষ্ঠ, উঁচু-নীচু, পাপ-পূণ্য নানা ভাবে বিভক্ত করে আসছে অনন্তকাল ধরে। কৃতকর্মই মানুষকে স্বর্গ, নরক ও নির্বাণে পৌঁছে দেয়। এক কথায় বলতে গেলে জগত কর্ম প্রভাবে প্রতিনিয়ত নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। কর্মহেতু প্রাণীগণ জন্ম মৃত্যুর আকারে এই অনিত্য সংসারে ভ্রমণ করছে কর্মের এই প্রক্রিয়ায়।
হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার আর নানা বৈরীতায় পূর্ণ সমগ্র মানব জাতি। মানব জাতির এই ঘোর তামাশাচ্ছন্ন ক্ষণে মহামতি গৌতম বুদ্ধের সাম্য, মৈত্রী আর করুণাঘণ দর্শন সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য এক অনন্য শরণ হয়ে কাজে লাগতে পারে। বিশ্ব পঙ্কিলতার অশুভ হাতছানি থেকে মুক্তির প্রয়াসে আসুন ধর্মদর্শন নামে খ্যাত তথাকথিত ধর্মচর্চা নয়, মানবিকতার মূলমন্ত্রে উদ্দীপ্ত হতে বুদ্ধের মহা-মূল্যবান মানব দর্শন চর্চায় ব্রতী হয় সকলে। যেখানে নীতি ও আদর্শিক সীমারেখায় সকল সংকীর্নতা বিদীর্ণ করে এক অপার মানবতার মূলমন্ত্র উচ্চারিত হয়েছে বারংবার।
বৌদ্ধদের ধর্মীয়ভাবে উৎযাপিত বর্ষাবাস/বর্ষাব্রতের শেষে শুভ আশ্বিণী (প্রবারণা) পূর্ণিমায় সকল অবিদ্যা ও অজ্ঞতাকে দূর করে শুচি শুভ্রতায় গড়ে উঠুক সকল মানব জাতির ভুবন। বিশ্বজনীন হতাশা, দারিদ্রতার নির্মম কষাঘাত থেকে মুক্ত হউক বিশ্ব মানব জগৎ। মহামতি বুদ্ধের প্রেমময় বাণী বিশ্বজনীন শান্তির আলোক বর্তিকা হয়ে হিংসা, দ্বেষ, লোভ, মোহ মাঝে রেখাপাত করুক সকল মানব ভূবন। নির্মল, নিষ্কলুষ শুচিতায় অবগাহন করুক অশান্ত বিশ্ব। আমার/আপনার সকল ভূল ভ্রান্তি সুচিতা মৈত্রী তরঙ্গে ভাঁসিয়ে দিয়ে আসুন আমরা সকলে হাতে হাত রেখে ঐক্যমত ভাবে উজ্জ্বল এক বৌদ্ধ সমাজ গড়ে তুলি।
২। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত বর্ষাবাস সংক্রান্ত।
আষাঢ়ী c~র্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূণিমা পর্যন্ত তিন মাসকে বৌদ্ধরা বর্ষাবাস হিসেবে পালন করে, বলা যায় বর্ষাঋতু উদ্যাপন করেন। শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা দিনে শুরু হওয়া বর্ষাব্রত শেষ হয় শুভ আশ্বিনী পূর্ণিমা বা প্রবারণা পূর্ণিমার মাধ্যমে। রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতমের জন্মের এক সপ্তাহ পরে তাঁর মাতৃদেবী অর্থাৎ বুদ্ধমাতা স্বর্গবাসী হয়েছিলেন। তখন সিদ্ধার্থকে পুত্র স্নেহের লালন পালন করেন বিমাতা মহাপ্রজাপতি গৌতমী। কথিত আছে মহাপ্রজাপতি গৌতমী কর্তৃক লালিত পালিত হয়েছিলেন বলে তথাগত বুদ্ধ গৌতম বুদ্ধ নামে সমধিক খ্যাত। পরে তিনি ঘটনা প্রবাহে কালক্রমে পারমী অনুসারে বুদ্ধত্ব লাভ করেন ৩৫ বছর বয়সে।
বুদ্ধমাতা মহামায়া মৃত্যুর পরে তাবতিংস স্বর্গে জন্ম নিয়েছিলেন। প্রত্যেক সম্যক সম্বুদ্ধ গণের মাতা সন্তান জন্মের এক সপ্তাহের মধ্যে স্বর্গবাসী হয়ে থাকেন। কারণ বুদ্ধ মাতার গর্ভে দ্বিতীয় কোন সন্তান আসতে পারে না। মূলত বোধিসত্ত্বের মাতৃগর্ভে প্রতিস্ন্ন্ধি গ্রহণ, সিদ্ধাথের গৃহত্যাগ এবং সর্বপ্রথম ধর্মচক্র প্রবর্তনের ঘটনাবলী আষাঢ়ী পূর্ণিমাকে তাৎপর্য মণ্ডিত করে তুলেছে। রাজকুমার সিদ্ধার্থ এই দিনে সংসার ত্যাগ করেন। সাধনালব্দ জ্ঞান প্রথম আষাঢ়ী পূর্ণিমা দিনে প্রচার করেন। গৃহত্যাগঃ কপিলাবস্তুর শাক্যবংশীয় রাজা শুদ্ধোধনের ঔরষে এবং রাজরাণী মহামায়ার গর্ভে জন্ম হয়েছিলেন রাজকুমার সিদ্ধার্থের। তিনি ছিলেন তাদের অনেক সাধন, ভজন, ও আরাধনার সন্তান।
রাজপরিবারে ভোগ বিলাসের কোন কমতি না থাকলেও ছিল পিতৃ বুকের হাহাকার এবং মাতৃ হৃদয়ের “মা’ ডাকের শূন্যতা। পরবর্তীতে সেই শূন্যতা পূরণ হল পারমী পূর্ণ সিদ্ধার্থ নামের শিশুটির জন্মের মাধ্যমে। রাজকীয় আতিশয্যে বড় হতে লাগলেন সিদ্ধার্থ। ভোগ বিলাসের মাঝে বেড়ে উঠলেন, অথচ ভোগ বিলাসের লালসা তাঁকে স্পর্শ করতে পারল না। উনিশ বছর বয়সে মোহের বাঁধনে বাঁধা হলেন, অর্থাৎ সংসারে আবদ্ধ করা হল। কিন্তু সংসারিক বাঁধন তাঁর ত্যাগ শক্তি দিয়ে তিনি বেরিয়ে এলেন সংসার নামক মোহের খোলস থেকে। ঊনত্রিশ বছর বয়সে তিনি সারথি ছন্দক সহ অশ্ব কন্থকের পিঠে চড়ে সংসার ত্যাগ করলেন। সেই দিন ছিল শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমার জ্যোৎস্না স্নাত রাত।
ধর্মচত্র প্রবর্তননঃ গৃহ ত্যাগের পর রাজ নন্দন সিদ্ধার্থ সাধনায় নিমগ্ন হলেন। শুরু হল দুঃখ মুক্তির অদম্য প্রচেষ্ঠা। ছয় বছর কঠোর সাধনা বলে অবশেষে তিনি অবর্তীণ হলেন কঠিন যাত্রায়। খুঁজে পেলেন মুক্তির পথের ঠিকানা। মানুষ কেন জন্ম-মৃত্যুর কবলে পড়ে, কে কোথায় যায়, কোথা হতে আসে, ইত্যাদি রহস্য ময়তার সমাধান পেলেন। বুদ্ধত্ব লাভের পর প্রথমে তিনি চিন্তা করেছিলেন যে তিনি ধর্ম প্রচার করবেন না। কারণ সাধারণ তৃষ্ণাতুর মানুষেরা এই তৃষ্ণাক্ষয়ী নৈর্বাণিক ধর্ম বুঝবে না। কিন্তু দেব-ব্রক্ষার অনুরোধে স্বর্গ-মর্ত্য সবার কল্যাণে ধর্ম প্রচার করার চিন্তা মনে স্থান দিলেন। অবশেষে বুদ্ধ সারনাথে সর্বপ্রথম ধর্মচক্র প্রবর্তন করলেন। এটার প্রাচীন নাম ঋষিপতন মৃগদায়।
ঋষিগণ গন্ধমাধব পর্বত থেকে আকাশ পথে এসে সেখানে অবতরণ করতেন। ঋষিদের পতন স্থান বলে সারনাথের অপর নাম ছিল ঋষিপতন। হত্যা করার জন্য আনীত মৃগদের সেখানে ছেড়ে দিয়েছিলেন বলে ইহার আরেক নাম মৃগদায় অর্থাৎ মৃগবন। প্রত্নতত্ত্ব সম্পর্কীয় বিষয়ের জন্য সারনাথ সু-প্রসিদ্ধ। অশোক স্তুপের পূর্ব পাশে যে মন্দিরের চিহ্ন বিরাজমান এটিই ধর্মচক্র প্রবর্তন স্থান। প্রত্যেক সম্যক সম্বুদ্ধগণের এই স্থানই প্রথম ধর্ম প্রচার স্থান। এই স্থান অপরিবর্তনীয়। প্রথম ধর্মদেশনায় আঠার কোটি দেব-ব্রহ্মা জ্ঞান লাভ করেছিলেন। মানুষের মধ্যে একজন মাত্র জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন যার নাম কৌন্ডিন্য। সেদিন ছিল শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা।
শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা দিনে বুদ্ধের জীবনে আরেকটি অলোকিক ঘটনা ঘটেছিল। সেই নান্দনিক ঘটনাটি হল বুদ্ধের ঋদ্ধি প্রদর্শন ও স্বর্গারোহন। যমক ঋদ্ধি প্রদর্শন ও তাবতিংস স্বর্গে গমনঃ বুদ্ধের সময়ে আরো ছয় জন শাস্তার কথা দেখা যায়। তাঁরা হলেন, পূরণ কশ্যপ, মক্খলি গোশাল, অজিত কেশকম্বল, পকুধ কচ্চায়ন, নির্গ্রন্থনাথ পুত্র, ও সঞ্জয় বেলট্ঠ। তাঁরা নিজ নিজ মতবাদ প্রচার করতেন। তাঁদেরও অনেক অনুসারী ছিলেন। কিন্তু কেউ সত্য জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন না। তারা তৃষ্ণামুক্ত বিমুক্ত পুরুষও ছিলেন না। তাঁদের খানিকটা ঋদ্ধি জ্ঞান ছিল। তাই তাঁরা এবং তাদের শিষ্য-প্রশিষ্যরা বেশি আস্ফালন করতেন। বুদ্ধের অনুসারীদের কটাক্ষ করতেন। বুদ্ধগণ এর ধর্মতা হল বিনাকারণে ঋদ্ধি প্রদর্শন না করা। বুদ্ধ অকারণে ঋদ্ধি প্রদর্শন করে কাউকে প্রলোভিত না করার জন্য শিষ্যদের উপদেশ দিতেন। তাই বুদ্ধের ঋদ্ধিবলের অসাধারণ ক্ষমতা সম্পর্কে প্রথম প্রথম অনেকের ধারণা ছিল না। কোশলরাজ প্রসেনজিত বুদ্ধ ও তীর্থিকদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান আয়োজন করলেন। আগে থেকে ঘোষনা করা হল যে শ্রাবস্তীতে বুদ্ধ ও তীর্থিকদের মধ্যে ঋদ্ধি প্রদর্শন প্রতিযোগিতা হবে। বিশাল মন্ডপ সু-সজ্জিত করা হল।
পূর্ব থেকে ঘোষণা দেওয়ায় অসংখ্য মানুষের সমাগম হল। তীর্থিকরা যথাসময়ে উপস্থিত হয়ে নিজ নিজ ঋদ্ধি ক্ষমতা প্রদর্শন করলেন। বুদ্ধ একটু বিলম্বে গেলেন। ততক্ষনে তাঁরা অনেকে অনেক ধরণের মন্তব্য করে বসলেন। সবার দৃষ্টি বুদ্ধ আসার পথের দিকে স্থির হয়ে রইলেন। বুদ্ধের জন্য সু-সজ্জিত আসনে বুদ্ধ কিভাবে আরোহন করলেন তা কেউ দেখেন নি। বুদ্ধের প্রথম ঋদ্ধি দেখে সবাই মুগ্ধ হলেন। তার পর শুরু করলেন যমক ঋদ্ধি প্রদর্শন একদিকে আলোর রশ্মি আরেকদিকে অন্ধকার, একদিকে আগুন আরেকদিকে পানি এভাবে জোড়া জোড়া বহুধরনের ঋদ্ধি প্রদর্শন করলেন। উপস্থিত সবাই বুদ্ধের অভাবনীয় ঋদ্ধি প্রতিহার্য্য দেখে মুগ্ধ হলেন। বেশির ভাগ মানুষ বুদ্ধ ভক্ত হয়ে পড়লেন। মূলত বুদ্ধ এসব কারণে বিনা প্রয়োজনে ঋদ্ধি প্রদর্শন করতেন না। সম্যক সম্বুদ্ধের ঋদ্ধি আর পৃথগজনের ঋদ্ধি এর মধ্যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ আছে।
এদিকে উপস্থিত দর্শকবৃন্দ তীর্থিকদের ধিক্কার দেওয়া শুরু করলেন। নানা ভাবে বঞ্চনা করলেন। তীর্থিক পূরণ কশ্যপ ক্ষোভ আর অপমানে জলে ডুব দিয়ে আত্নহত্যা করলেন এবং অবীচি নরকে গমন করলেন। শ্রাবস্তীর গন্ডাম্র বৃক্ষমূলে যমক ঋদ্ধি প্রতিহার্য প্রদর্শন করে বুদ্ধ আকাশ মার্গে অদৃশ্য হয়ে তাবতিংস স্বর্গে গমন করলেন। সেখানে দেবরাজের পান্ডু-কম্বল সিংহাসনে বর্ষাবাস অধিষ্ঠান করেন। সেটি ছিল বুদ্ধের সপ্তম বর্ষাবাস। স্বর্গে তিনমাস ব্যাপী মাতৃদেবীকে অভিধর্ম দেশনা করে তাঁকে ধর্মজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করে মাতৃ কর্তব্য প্রতিপালন করেন। কথিত আছে মাতৃদেবীকে কেন্দ্র করে তিন মাস অবধি অভিধর্ম দেশনার মাধ্যমে আশি কোটি দেব-ব্রহ্মার ধর্মচক্ষু উৎপন্ন করেছিলেন। বুদ্ধের দেবলোক গমন মাতা এবং দেবব্রহ্মাদের জন্য মুক্তির ঠিকানা এনে দিয়েছিলেন। এই জন্য তিনমাস পরে বুদ্ধ মর্ত্যলোকে অবতরণের সময় দেবতারা বুদ্ধের প্রতি কৃতজ্ঞা প্রকাশ স্বরূপ এক অদ্ভুদ কান্ড করেছিলেন।
বিভিন্ন ধরণের হৃদয়ছোঁয়া ঘটনাবলির কারণে আষাঢ়ী পূর্ণিমা একটি অনন্য পূর্ণিমা তিথির নাম। বৌদ্ধদের জন্য আষাঢ়ী পূর্ণিমা পূণ্যের সুবাসী বারতা নিয়ে হাজির হয়। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত এই তিনমাস ভিক্ষুসংঘের পাশাপাশি বৌদ্ধ উপাসক-উপাসিকারাও বর্ষাবাস পালন করে থাকেন। এই সময়ে তারা প্রতি উপোসথ দিবসে অষ্টশীল গ্রহণ, দানকর্ম, ভাবনাকার্য সহ ইত্যাদি পূণ্যকর্মের মাধ্যমে বর্ষাবাস পালন করে থাকেন। এই সময়ে পূজনীয় ভিক্ষুসংঘরা তথ্য বহুল অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মদেশনা উপাসক উপাসিকাদের দান করেন। পাপকর্ম থেকে বিরত থাকার জন্য সাধারণ গৃহীরা সাধ্যমত চেষ্ঠা করেন। প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকেন। এমনকি এই তিন মাসের মধ্যে সামাজিক অনুষ্ঠান বিয়ের অনুষ্ঠানও হয় না। ভিক্ষুসংঘরাও বর্ষাবাস চলাকালীন সময়ে কেউ বিহারের বাইরে থাকতে পারেন না। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে থাকার নিয়ম থাকলেও এক সপ্তাহের মধ্যে ফিরে আসতে হয়।
৩। ফানুস উত্তোনের মাধ্যমে প্রবারণা পূর্ণিমায় বৌদ্ধদের কিসের সংস্কৃতি?
চার নিমিত্ত দর্শন করে রাজকুমার সিদ্ধার্থ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে সংসার ত্যাগ করেছিলেন। তাঁর নবজাত পুত্র রাহুলা আর প্রিয়তমা স্ত্রী য়শোধরাকে ত্যাগ করাকালে অগণিত অগণিত দেব ব্রক্ষ্মা এই মহাভিনিষ্ক্রিমণ অর্থাৎ সংসার ত্যাগের দৃশ্য অবলোকন করার অপেক্ষায় ছিলেন। আকাশে বাতাসে বিজয়ের সুর ধ্বনিত হয়েছিল। অথচ পৃথিবীর কোন মানুষ তাঁর এই বিদায় ও সংসার ত্যাগের কথা বুঝতেই পারেননি। আষাঢ়ী পূর্ণিমায় সংসার ত্যাগ করার সময় দেবতা ব্রক্ষ্মাদের মহানুভবে তিনি বহুদূর চলে যেতে সক্ষম হন।অবশেষে ভোরবেলায় পৌঁছলেন একটি নদীর তীরে। তিনি তাঁর জন্মসঙ্গী ছন্দককে জিজ্ঞাসা করলেন, এই নদীর নাম কি? ছন্দক বললো, মহারাজ, এই নদীর নাম অনোমা।
বোধিসত্ত্ব সিদ্ধার্থ অনোমা নামকে নিমিত্তরূপে গ্রহণ করে ভাবলেন, অ+নোমা। নোমা মানে মন্দ আ মানে নয়। অর্থাৎ মন্দ নয়। সুতরাং ইহা মঙ্গল, তাই মঙ্গলজনক স্থানে সংসার ত্যাগ করা বিধেয়। অতপর শরীরের সব আভরণ খুলে ফেললেন এবং তাঁর ক্ষুরধার তলোয়ার দিয়ে বাম হাতে তাঁর চুল ধরে ডান হাত দিয়ে তা ছেদন করে অধিষ্ঠান করলেন, আমার এই কর্তিত চুল আমি আকাশে নিক্ষেপ করে দেবো, আমি জন্ম-জন্মান্তর দশটি পারমী, দশটি উপ-পারমী, দশটি পরমার্থ পারমী পূরণ করে যদি প্রকৃত বুদ্ধাংকুর হয়ে এই জন্মে বুদ্ধ হতে পারি, তাহলে আমার চুল আকাশে নিক্ষেপ করা হলে আকাশে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকুক, মাটিতে আর পতিত না হোক। এই অধিষ্ঠান করে তিনি কর্তিত চুল আকাশে নিক্ষেপ করে দিলেন। বোধিসত্ত্বের মনের কথা জানতেন দেবরাজ ইন্দ্র। তিনি একটা স্বর্ণের ঝুড়ি করে নিয়ে গেলেন আনন্দমনে তাবতিংস স্বর্গে। তিনি সেই চুলকে নিয়ে তাবতিংস স্বর্গে একটি জাদী তৈরি করলেন। বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির আগে যেই জাদী নির্মিত হয়, সেই জাদী হলো সিদ্ধার্থের এই চুল সন্নিবেশিত জাদী নাম তার চুলামনি জাদী।
চুলামনি জাদী এখনো স্বর্গে দেব ব্রক্ষ্মাগণ কর্তৃক পূজিত হচ্ছে। সিদ্ধার্থের সংসার ত্যাগের কথা জানতে পেরে অতীত জন্মের ব্রক্ষ্মলোকের ঘটিকার ব্রক্ষ্মা সিদ্ধার্থকে অষ্টপরিষ্কার দান করার উদ্দেশ্যে অষ্টপরিষ্কার নিয়ে এসেছিলেন অনোমা নদীর তীরে। ঘটিকার ব্রক্ষ্মা সিদ্ধার্থকে অষ্টপরিষ্কার দান করলেন এবং সিদ্ধার্থের মহামূল্যবান রাজাভরণ বিনীতভাবে চেয়ে নিলেন। এই রাজাভরণ তিনি ব্রক্ষ্মলোকে নিয়ে যান এবং রাজাভরণ স্থাপন করে একটি জাদী নির্মাণ করেন। সেই জাদীর নাম দুস্স জাদী। ইহাই গৌতম বুদ্ধের শাসনামলের সর্বপ্রথম পরিভোগ জাদী যা বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির ছয় বৎসর পূর্ব হতে ব্রক্ষ্মলোকে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ব্রক্ষ্মাগণের পূজা প্রাপ্ত হয়ে অদ্যাবধি বিরাজ করছে।
এবার বলি আমরা কেন প্রবারণা পূর্ণিমার দিন ঘটা করে ফানুস উড়াই? স্বর্গের দেবতারা দেবরাজ ইন্দ্র কর্তৃক স্থাপিত চুলামনি জাদীকে এখনো পূজা করেন বিধায় আমরাও প্রবারণা পূর্ণিমার দিন ফানুস উড়িয়ে পূজা করি। ফানুস উড়ানোর অর্থ ঐ চুলামনি জাদীর পূজা করা। প্রদীপ পূজা করা। আমরা বুদ্ধকে প্রদীপ পূজা করতে পারি খুব সহজেই কিন্তু স্বর্গের চুলামনি জাদীর উদ্দেশ্যে ফানুস উড়িয়ে আকাশে তুলে পূঁজা করি।
৪। জল প্রদ্বীপ পূজা কিসের উদ্দেশ্যে ও তার তাৎপর্য কি?
জাহাজ ভাঁসানো উৎসবের উৎপত্তি ও তার নিধানঃ ভগবান বুদ্ধের জীবদ্দশায় বৈশালী ছিল অতিশয় এক সমৃদ্ধশালী নগরী। সেই সমৃদ্ধশালী বৈশালী নগরীতে একসময় অনাবৃষ্টি দেখা দিল। এই অনাবৃষ্টির কারণে কৃষকদের শস্যখেত নষ্ট হয়ে যায়, চারদিকে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে সহায় সম্বলহীন হয়ে অনেক মানুষ অনাহারে মারা যায়। এই মৃতদেহ বৈশালী নগরীর বাইরে ফেলে দেওয়া হত। এই মৃতদেহের ভীষণ দুর্গন্ধ পেয়ে প্রেতপিশাচ আর অমনুষ্যরা নগরীতে আশ্রয় নেয়। এই অবস্থায় বৈশালীর রাজা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং এই সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজতে লাগলেন। অনেকে অনেক রকম উপদেশ দিলেন, আবার কেউ কেউ বলতে লাগলেন জগতে বুদ্ধের উৎপত্তি হয়েছে।
ভগবান বুদ্ধ যদি বৈশালী নগরীতে আসেন তাহলে আমাদের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। বৈশালীর রাজা ভগবান বুদ্ধ তখন কোথায় অবস্থা করছেন জানতে চাইলেন এবং কিভাবে ভগবান বুদ্ধকে বৈশালীতে আনা যায় জানতে চাইলেন। রাজার সেনাপতি বলেন, বুদ্ধগণ মানবের প্রতি অনুগ্রহকারী, কেন আসবেন না? ভগবান বুদ্ধ এখন রাজগৃহে আছেন, মহারাজ বিম্বিসার তার সেবা করেন, যদি মহারাজ বিম্বিসার যদি আসতে বাঁধা না দেন তাহলে অবশ্যই আসবেন এই কথা শুনে বৈশালীর রাজা দুইজন লিচ্ছিবি কুমারকে সৈন্যবাহিনীসহ রাজগৃহে পাঠালেন এবং আদেশ দিলেন মহারাজ বিম্বিসারকে আমাদের সমস্যার কথা বুঝিয়ে বলে ভগবানকে বৈশালীতে নিয়ে আসতে। লিচ্ছিবি কুমাররা রাজগৃহে গিয়ে তাদের সমস্যার কথা মহারাজ বিম্বিসারকে খোলে বললেন, তাদের সমস্যার কথা শুনে মহারাজ বিম্বিসার বললেন, ভগবানের নিকট যাও যদি ভগবান সম্মতি প্রদান করেন।
লিচ্ছিবি কুমাররা ভগবানের চরণতলে উপনীত হয়ে তাদের সমস্যার কথা ভগবানকে জানালেন এবং প্রার্থনা করলেন ভগবান বুদ্ধ এমতাবস্থায় যদি আপনি একবার করুণা করে বৈশালীতে শুভ পদার্পণ করেন আমাদের অশেষ কল্যাণ সাধিত হবে। করুণাঘন বুদ্ধ তাদের সম্মতি প্রদান করলেন এবং তাদের নিমন্ত্রণ গ্রহন করলেন, সেদিন ছিল বর্ষাবাসের শেষদিন অর্থাৎ প্রবারণা পূর্ণিমারদিন। রাজা বিম্বিসার, ভগবান নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন জেনে যথোচিত উৎসব এবং ধুমাধামের সাথে আগো বাড়িয়ে দিলেন আর বৈশালীতে যাওয়ার জন্য দুইটা সু-স্বজ্জিত তরী প্রস্তুত করালেন। কথিত আছে যে, রাজা বিম্বিসার একগলা পর্যন্ত পানিতে নেমে ভগবানকে বিদায় জানিয়ে ছিলেন এবং যতদূর পর্যন্ত দেখা যায় অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। এদিকে ভগবানের আগমনী বার্তা শুনে বৈশালীবাসিরা রাস্তাঘাট সু-স্বজ্জিত করে স-সম্মানে ভগবান বুদ্ধকে আগো বাড়িয়ে নিলেন এবং ভগবান বৈশালীর সীমায় পৌঁছলে লিচ্ছিবিরা রাজা বিম্বিসারের চেয়ে দ্বিগুণ পূজা করলেন সেই সময় আকাশ হঠাৎ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে উঠে এবং মেঘ গর্জন করিতে করিতে বারিবর্ষণ আরম্ভ হল এই বারিবর্ষণে বৈশালীরাজ্যের সকল আবর্জনা বানের জলে ভেসে গেল। ভগবান বুদ্ধের সেই জীবদ্দশার এই স্মরণীয় দিনটিকে স্মরণে রাখতে এবং মহারাজ বিম্বিসার ও বৈশালীবাসির ভগবান বুদ্ধের প্রতি সেই সম্মান আর ভালবাসাকে আমাদের সকলের হৃদয়ে জাগ্রত রাখতে বৌদ্ধরা প্রতি বৎসর পালন করে এই জাঁকজমকপুর্ন জাহাজ ভাঁসানো বা জল প্রদ্বীপ পূজার উৎসব।
জগতের সকল প্রাণী সুখি হউক।
সাধু সাধু সাধু
সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে থেকে এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

Ads

Recommended For You

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!